Sunday, February 8, 2026

রাজ্যপাল পদ তুলে দেওয়ার সঠিক সময় এটাই

Date:

Share post:

ফিতে কাটা ছাড়া এমনিতেই তো আর বিশেষ কোনও কাজ রাজ্যপালের নেই৷ তবুও মাঝে মধ্যে এমন জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলে, সাধারন মানুষ আশা করে রাজ্যপাল মহোদয় তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি-সংবিধান সচেতনতা প্রয়োগ করে সঠিক পথেই হাঁটবেন। এমন ভাবাই স্বাভাবিক। কারন রামা-শ্যামা তো আর রাজ্যপাল হতে পারেন না। অনেক ঝাড়াই-বাছাই করে একজন রাজ্যপাল স্থির করা হয়। ‘হেড অফ স্টেট’ হওয়া কী মুখের কথা !

ভগৎ সিং কোশিয়ারি, মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল, RSS-করা বিজেপি নেতা। বিজেপি-র জাতীয় সহ-সভাপতিও ছিলেন। 1997 সালের মে মাসে তিনি উত্তর প্রদেশ বিধান পরিষদের সদস্য হন৷ 2000 সালে ওই রাজ্য ভাগের পর নতুন রাজ্য উত্তরাখন্ডের বিদ্যুৎ, জলসেচ, আইন মন্ত্রী হলেন ৷ এরপর 2001 সালে তিনি সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী৷ তবে পরের বিধানসভা ভোটে বিজেপি হারার পর 2002 সালে হন বিরোধী দলনেতা৷ 2008 সালে তিনি রাজ্যসভায় সাংসদ। 2014 সালে লোকসভার সদস্য। তিনি উত্তরাখন্ডের বিজেপি প্রধানও ছিলেন৷ এবং আপাতত এ বছরের 5 সেপ্টেম্বর থেকে মহারাষ্ট্রের রাজ্যপালের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন৷

মহারাষ্ট্রে নতুন সরকার গড়া নিয়ে এই কোশিয়ারি সাহেবের যে ভূমিকা দেখা গিয়েছে, তাতে রাজ্যপাল কম এবং বিজেপি নেতা বেশি ছিলেন বলেই রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজ্যপাল কী কী করলেন?
● স্বাভাবিক কারনেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিজেপি এবং শিবসেনাকে সরকার গড়ার জন্য রাজ্যপাল আহ্বান জানালেও দুই দলের নিজস্ব মতবিরোধে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উদ্যোগ ব্যর্থ হয়৷

● সরকার গড়ার জন্য এনসিপি-কে ডাকা হয়।

● এনসিপি-কে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমানের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দেন রাজ্যপাল। সাড়ে আটটা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু সেই সময়সীমা পার হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগেই মহারাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়৷ খেয়াল রাখতে হবে, নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার আগেই জারি করা হয় রাষ্ট্রপতির শাসন।
● রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার সুপারিশ করেন রাজ্যপাল ভগৎ সিং কোশিয়ারি৷ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যপালের সুপারিশে সিলমোহর দেন প্রধানমন্ত্রী। মহারাষ্ট্রে জারি হল রাষ্ট্রপতি শাসন। রাষ্ট্রপতি এই সুপারিশে সই করামাত্রই 356 ধারা জারি হয় গোটা মহারাষ্ট্রে। প্রথমে 6 মাসের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলেও বলা হয়, পরবর্তীকালে তা আরও 6 মাস বাড়াতে পারেন রাজ্যপাল৷ রাজ্যপালের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয় তখন থেকেই।

● ওদিকে বিস্তর টালবাহানা আর নাটকের পর শিবসেনা, এনসিপি আর কংগ্রেস শেষপর্যন্ত একমত হয় শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরেকে মুখ্যমন্ত্রী মেনে নিতে।

● রাজ্যপালের কাছে দাবি পেশ করে তিন দল।

● শিবসেনা-জোটের
উদ্ধব ঠাকরে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি নেওয়ার ঘন্টা কয়েক আগে, মাঝরাতে এই রাজ্যপাল মহারাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার করে নেওয়ার সুপারিশ করেন।

● রাজ্যপালের সুপারিশ মেনে ভোর 5.47 মিনিটে ওই রাজ্য থেকে তুলে নেওয়া হয় রাষ্ট্রপতি শাসন।

● সেদিনই মহারাষ্ট্রের মানুষ ঘুম থেকে ওঠার আগেই এই রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথবাক্য পাঠ করিয়ে দিলেন যথাক্রমে বিজেপির ফড়নবীশ এবং এনসিপির অজিত পাওয়ারকে। ফড়নবীশ- পাওয়ার মুখে মুখে দাবি করলেন, তাঁদের সঙ্গে 170 জন বিধায়কের সমর্থন আছে। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া আটকাতে বিজেপি যে উদ্যোগ নিয়েছিলো, রাজ্যপাল হিসেবে নয়, বিজেপি নেতার মতো আচরন করেছিলো। শিবসেনা নেতারা বলেন, বিজেপি-এনসিপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কি’না, তা না দেখেই রাজ্যপালের মধ্যে বিজেপি-চেতনা জেগে উঠেছে। কোনও রাজ্যপালের পক্ষে এই কথা শোনা যথেষ্ট অপমানজনক। তবুও ‘দলের’ স্বার্থে সাংবিধানিক পদকে ব্যবহার করতে কুন্ঠিত হননি কেশিয়ারি সাহেব।

তারপর কী দাঁড়ালো ?
শীর্ষ আদালত যা বলেছে তাতে রাজ্যপালের যাবতীয় সিদ্ধান্তই তো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো ? শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়লো,

• রাজ্যপাল সংবিধান অনুসারে কাজ করেননি।

• রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত যে প্রথম থেকেই যে সঠিক ছিলনা, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বিজেপি। তাই বিজেপির শীর্ষস্তরের নির্দেশে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে ধাধ্য হলেন বিজেপির ফড়নবীশ।

বুধবার মহারাষ্ট্র বিধানসভায় আস্থা ভোট। সেই ভোটের মুখোমুখি হওয়ার সাহসটুকুও হলো না বিজেপির। রাজ্যপাল কোশিয়ারি যদি সবদিক যাচাই করে পদক্ষেপ করতেন, তাহলে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্যপালদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহসই কেউ পেতো না৷
ফলে সঙ্গত কারনেই প্রশ্ন উঠেছে, এ দেশে রাজ্যপাল পদের আদৌ কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে কি ? তবে এ প্রশ্নের সমাধান চট করে হবেনা৷ তেমন কিছু করতে হলে প্রথমেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিষয়টা সময় এবং আলোচনাসাপেক্ষ।

তার আগে রাজ্যপালে পদের যতটুকু গরিমা আছে, তা বজায় রাখতে হলে, এখনই মহারাষ্ট্রের রাজ্যপালের পদ থেকে ভগৎ সিং কোশিয়ারিকে সরিয়ে দেওয়া দরকার।
কিন্তু সে পথে রাষ্ট্রপতি বা কেন্দ্রীয় সরকার হাঁটতে আদৌ রাজি হবেন বলে মনে হয়না। ফলে রাজ্যপালরাও যথাযথ সন্মানটুকুও বোধহয় পাবেন না।

spot_img

Related articles

‘নার্সিসাস’, উৎপল সিনহার কলম

' আপন গন্ধে মাতোয়ারা হরিণ ' এমন একটি রূপক, যা নিজের ভেতরের সম্পদকে বাইরে খুঁজে বেড়ানোর বিড়ম্বনাকে বোঝায়।...

বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ: নাম বদল হলো মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের

মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের সংশোধনী বিল শনিবার বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু সভায় এই বিলটি পেশ...

T20 WC: সূর্যের ব্যাটিং বিক্রমের পর বল হাতে নবাব সিরাজ, জয় যাত্রা শুরু ভারতের

টি২০ বিশ্বকাপের(T20 World Cup) প্রথম ম্যাচে জয় পেল ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারাল ২৯ রানে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রথমে...

ভোটার তালিকায় নাম তুলতে এবার বৈধ ‘ডোমিসাইল’, নয়া নির্দেশিকা নির্বাচন কমিশনের

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে বড়সড় বদল আনল নির্বাচন কমিশন। এখন থেকে স্থায়ী বাসিন্দা শংসাপত্র বা পার্মানেন্ট...