হংকং শব্দের অর্থ সুবাসিত বন্দর। বিশ্বের অন্যতম সংগঠিত ও বৃহৎ বন্দরকে টেক্কা দেওয়ার অপেক্ষায় ভারত। কেন্দ্রের সরকারের এমন পরিকল্পনা, যা সুয়েজ খাল থেকে ভারত মহাসাগরকে নৌবাণিজ্যে জুড়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবে হংকং (Hong Kong), সিঙ্গাপুরকে। এতবড় লাভের অঙ্ক কোনওভাবেই হারাতে চায় না বিজেপি সরকার। তা যে কোনও মূল্যের বিনিময়েই দিতে প্রস্তুত তারা। ফলে এবার হাত পড়তে চলেছে গ্রেট নিকোবরের (Great Nicobar) বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আর সাধারণ মানুষের জ্ঞানের সম্পূর্ণ নজরের বাইরে থাকা বন্য জনজাতির (islanders) উপর। প্রায় গায়ের জোরেই গ্রেট নিকোবর ‘দখল’ করে প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে চলেছে মোদি সরকার।

গ্রেট নিকোবরে হংকং-এর (Hong Kong) অনুসরণে একটি বন্দর প্রকল্প (shipping project) নিয়েছে বর্তমান কেন্দ্রের সরকার, যা ২০২২ সাল থেকে নানা বাধা ও আইনি জটিলতায় স্থগিত হয়েই রয়েছে। সম্প্রতি সেই সব বাধা সরে যাওয়ার দাবি করে বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়িত করার প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ ও জলপথ পরিবহন মন্ত্রক। এই প্রকল্পে জাহাজ থেকে মাল খালাসের বিরাট এলাকা তৈরি হবে। জাহাজ ভেড়ানোর বিস্তীর্ণ এলাকা আন্দামান-নিকোবরের এক প্রান্তের গ্রেট নিকোবরে যে খুব সহজলভ্য, তা বলাই বাহুল্য। এই প্রকল্পের মধ্যেই বিদ্যৎ উৎপাদন প্রকল্প, বিমান বন্দর থেকে বৃহৎ টাউনশিপও রয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে এই গ্রেট নিকোবর। সেখানে বন্দর প্রকল্প এই গোটা রুটের সিংহভাগ কাজের ভাগ পেতে চলেছে, বলে মত বিশেষজ্ঞদের। যার ফলে প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই জনশূন্য গ্রেট নিকোবরে (Great Nicobar) প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষের বাস হবে। প্রায় ৩০ বছর লাগবে গোটা প্রকল্প সম্পূর্ণ হতে। এত লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও এত বছর ধরে শুধুমাত্র প্রকৃতি ধ্বংস ও ওঙ্গে, শোম্পেন, জারোয়ার মতো জনজাতির (islanders) অস্তিত্ব সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় এমন কোনও প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এবার সেসবের তোয়াক্কা না করেই বন্দর প্রকল্প গায়ের জোরে চালু করতে চায় মোদি সরকার।

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, গোটা প্রকল্পে গ্রেট নিকোবরের কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার কোনও স্পষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। কখনও ১৪ শতাংশ গ্রহণ করা ও কখনও এত তৃতীয়াংশ অধিগ্রহণের দাবি করা হচ্ছে। আবার শোম্পেন জনজাতির যথাযথ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। আর সেখানেই প্রশ্ন তুলেছেন নৃতত্ত্ববিদরা। তাঁদের দাবি, শোম্পেন (Shompen) জনজাতি সভ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই এত শতাব্দী ধরে আগ্রহ দেখায়নি। সেখানে তাঁদের উন্নতির চেষ্টা করার অর্থ তাদের সংস্কৃতির মধ্যে জোর ঢুকে পড়ে তাদের জীবনযাত্রায় হস্তক্ষেপ। ইতিমধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শুরুও হয়ে গিয়েছে বলে দাবি করছেন তাঁরা।


তবে বিশেষজ্ঞদের কাছে সবথেকে উদ্বেগের কারণ প্রকৃতি ধ্বংস। গ্রেট নিকোবরের ৮০ শতাংশ ঘন নিরক্ষীয় জঙ্গলে ঢাকা। অন্তত ১৮ হাজার প্রাণি (habitat) ও ৮০০ রকমের জলজ প্রাণির (flora) অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে। তার মধ্যেই রয়েছে লেদারব্যাক সি টার্টল, কুমির, প্রবাল ও রবার কাঁকড়া। এর ১৪ শতাংশ সাফ করে বন্দর (shipping project) তৈরি করার অর্থ প্রায় ৯ লক্ষ ৬৪ হাজার গাছ কেটে (deforestation) ফেলা। বাস্তবে সেই সংখ্যাটা আরও বাড়বে বলেই অনুমান প্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের। সেই সঙ্গে জুড়বে এই বিরাট প্রকল্প বাস্তবায়িত ও তা চালানোর কারণে তৈরি হওয়া দূষণ। এই দূষণ নিয়েই কলকাতা হাইকোর্টের আন্দামান নিকোবর বেঞ্চে ন্যাশানাল গ্রিন ট্রাইবুনাল একটি মামলা হয়েছিল, যার জেরে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল আদালত।


ইতিমধ্যেই সভ্য জগতের থাবা নিকোবরের প্রত্যন্ত এলাকায় পড়ার কারণে আক্ষরিক অর্থে কোণঠাসা জনজাতিগুলি। নূন্যতম চাষবাস ও পশুপালনের জমি হারিয়েছে শোম্পেন (Shompen), ওঙ্গেরা (Onge)। নিজেদের প্রয়োজনের ভেষজ গাছের চাষ করতে না পেরে বিভিন্ন রোগের শিকার হয়ে সংখ্যাতেও কমতে শুরু করেছে তারা। সম্প্রতি ৩৯ জনের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের দল পরীক্ষা চালিয়ে ইউনেস্কো সংরক্ষিত এলাকায় বন্দরের বিপক্ষে রায় দিয়েছে। তাঁরাও দাবি করেছেন, এই বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার অর্থ শোম্পেনদের মৃত্যু পরোয়ানা তৈরি করা।

–

–

–
–

–
