Sunday, November 30, 2025
উৎপল সিনহা

মানুষ বড়ো কাঁদছে ,
তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে ,
তুমি পাখির মতো পাশে দাড়াও
মানুষ বড়ো একলা ,
তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।

এমন মানবিক আবেদন তোলপাড় তোলে অন্তরে। মানুষকে বলে মানুষ হয়ে উঠতে। যিশুখ্রীষ্ট , গৌতম বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ মনীষীদের সারা জীবনের সাধনা তো মূলত আর্ত মানবতার পাশে দাঁড়ানোর নিবিড় অনুশীলন। আবার রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমূখ দরদী সমাজবন্ধুরাও তো দুর্গত , বিপন্ন জনগণের পাশে থেকেছেন আমৃত্যু। আর আবহমানের এই আর্তিই ফুটে উঠেছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ দাঁড়াও ‘ কবিতায়।
তোমাকে সেই সকাল থেকে
তোমার মতো মনে পড়ছে
সন্ধে হলে মনে পড়ছে ,
রাতের বেলা মনে পড়ছে
মানুষ বড়ো একলা , তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।

এই কবিই অন্যত্র প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ মানুষ যেভাবে কাঁদে, তেমনি কি কাঁদে পশুপাখি ? ‘ আবার এই কবিই লিখেছেন, ‘ সকলে প্রত্যেকে একা ‘ । লিখেছেন, ‘ পাথরেরই মধ্যে ছিল জটিলতা, পাথর জানত না! ‘ কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ।
‘ দাঁড়াও ‘ কবিতা শেষ হচ্ছে এইভাবে:
এসে দাঁড়াও,ভেসে দাঁড়াও
এবং ভালবেসে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি
মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।

এখানে ‘ মানুষ হয়ে ‘ পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধটি ব্যঞ্জনাময়। প্রথমত, যেহেতু তুমিও মানুষ, তাই মানুষের পাশে দাঁড়ানো তোমার কর্তব্য। দ্বিতীয়ত, তুমি আরও একটু মানুষ হয়ে ওঠো এইবেলা। যেমন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি, ঠিক তেমনি সকলেই মানুষ নয়, কেউ কেউ মানুষ। যারা মানুষ নয়, তারাও কিছুটা মানুষ হয়ে উঠতে পারে যদি বিপন্ন জনগণের পাশে দাঁড়ায়, যদি দুর্গত মানুষের কাঁধে ভরসার হাতটি রাখে।

এ কবিতা পড়ার পর বাকরুদ্ধ হতে হয়। এমনই মর্মস্পর্শী। তথাকথিত, আপাত আটপৌরে, বহু ব্যবহারে জীর্ণ কিছু শব্দের সমাহারে লেখা এ কবিতা আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলে। আমরা স্পন্দিত, দীপিত হই। এ কবিতার প্রতিটি শব্দ যেন জপের মতো, মন্ত্রের অন্তর্লীন সুরের মূর্ছনার মতো বাজতে থাকে বুকের গভীরে। ইঙ্গিত, সঙ্কেত, ধ্বনি বৈশিষ্ট্য, শব্দমাধুর্য, কাব্যরহস্য ইত্যাদি প্রভৃতি সারেগামা পার হয়ে আমরা আবিষ্কার করি এ কবিতায় সুরারোপ যেন হয়েই আছে প্রথম পংক্তি থেকেই।

শুধু যেন গাইবার অপেক্ষা। প্রকৃতপক্ষে, ক্রন্দনরত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো পবিত্র কাজ আর কি-ই বা হতে পারে ! পবিত্র, দারুণ জরুরি এবং ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই কবিতা মোটেও কবিতাবিলাস নয়, কবিতার জন্য কবিতা নয়, এ এক জীবনমরণ সমস্যা । সারা বিশ্বের বেদনার ক্রন্দন শোনা যায় শক্তিকবির এ লেখায়। ভনিতাহীন, অকৃত্রিম, সহজ সারল্যে অলংকৃত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পংক্তি। এ যেন আবহমানের আবেদন। প্রতিটি যুগের দাবি। প্রতিটি শতাব্দীর কাতর আহ্বান। এ ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকা যায় না। অথচ কি আশ্চর্য দেখো, মানুষেরই তৈরি করা ফাঁদে পড়ে মানুষ হাঁসফাঁস করে, কাঁদে যুগ-যুগান্তর ধরে।

নৃশংস লোভের ফাঁদ, সীমাহীন বৈষম্যের ফাঁদ, চূড়ান্ত স্বার্থপরতার ফাঁদ। অনির্বচনীয় হুণ্ডি মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে। তাদেরই পাতা ফাঁদে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপন্ন জনগণ দিশাহারা। তখন তোমার কাজ পাখির মতো তাদের পাশে দাঁড়ানো । পাখির মতো সারল্য আর আন্তরিকতা নিয়ে, অতি সামান্য সামর্থ্য নিয়ে এবং পাখির মতোই স্বাধীনভাবে।
এই কবিই তো লিখে গেছেন, মানুষ বড়ো কষ্টে আছে, সীমাবদ্ধ আছে, তাই মানুষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে রহস্য করতে নেই, কারণ রহস্য আর ঠাট্টা-বিদ্রুপ যে করছে, সে-ও তো প্রকৃতপক্ষে সেই কষ্টেরই মানুষ।

ঠিক সেই কারণেই সকাল থেকেই কবির মনে পড়ে মানুষের কথা। কেবল মানুষেরই কথা তাঁর মনে পড়ে সন্ধ্যায় আর রাতে। এসে, ভেসে এবং ভালবেসে দাঁড়াতে হবে মানুষের পাশে শুধু কর্তব্যের টানে নয়, মানবিকতার বৃহত্তর স্বার্থে দাঁড়াতে হবে সমানুভূতি নিয়ে। অন্তরে অনুভব করতে হবে দুর্গতদের বিপন্নতা। পরার্থপরতার পবিত্র অনুশীলন মানবসভ্যতার অগ্রগতির সেরা সোপান।

এছাড়া তো সবটাই গতানুগতিক। দৈনন্দিন অভ্যাস মাত্র। সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি পরার্থপরতা । সহানুভূতির মায়া অতিক্রম করে সমানুভূতির উজ্জ্বল অনুভবে, পরম উপলব্ধির কান্তিময় আলোর মাঝখানে এসে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় কবি। কবির এই আকুল আবেদন কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কেননা এ ডাক মানবতার, এ ডাক ইতিহাসের, এ ডাক শাশ্বত, কালজয়ী।

আরও পড়ুন- উত্তরবঙ্গে প্রথমবার একযোগে চিতাবাঘ গণনা! চার জেলায় বসছে ৮০০ ট্র্যাপ ক্যামেরা

_

Related articles

অনলাইন জালিয়াতি রুখতে এবার whatsapp নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের!

যত সময় যাচ্ছে ততই বাড়ছে অনলাইনে প্রতারণার সংখ্যা। জনপ্রিয় ম্যাসেজিং অ্যাপ হোয়াটস অ্যাপকে (Whats App) কাজে লাগিয়ে একের...

পুরোনো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভুয়ো প্রচার! বিজেপিকে ফের চ্যালেঞ্জ অভিষেকের

বিএলওদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধির পুরনো একটি বিজ্ঞপ্তি নতুন করে প্রকাশ করে রাজনৈতিক চমক দিতে চাইল বিজেপির আইটি সেল। কিন্তু...

বিয়ের পরেই রহস্যমৃত্যু DRDO বিজ্ঞানীর

মাত্র ২ দিন হয়েছে বিয়ে আর তার মধ্যেই রহস্যমৃত্যু ডিআরডিও (DRDO)-এর এক বিজ্ঞানীর। আদিত্য ভার্মা নামের এই ব্যক্তিকে...

২৬-এ পরিবর্তন! ফ্লপ জ্যোতিষী শুভেন্দুর পর্দাফাঁস কুণালের

প্রতি নির্বাচনের আগে দলের কর্মীদের চাঙ্গা করার কথা মনে পড়ে বাংলার বিজেপির নেতাদের। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের এখনও ঢাকে...
Exit mobile version