প্রতিদিন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়া। কয়েক বছর পরপরই নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে এমনটাই দেখে এসেছে গোটা দেশের মানুষ। এবার নতুন ইস্যু এসআইআর (Special Intensive Revision)। দেশের সেনা আধিকারিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে ভারতরত্ন অমর্ত্য সেনকেও প্রমাণ দিতে হচ্ছে তাঁরা ভারতীয়। সেটাও লাইনে দাঁড়িয়ে। যেখানে সমাজের এই শ্রেণির মানুষের ছাড় নেই, সেখানে অস্তিত্বের প্রশ্নে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনিক কাজ কামাই করেই যে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, তা বারবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় উল্লেখ করেছেন। এবার একটি বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষায় (survey) উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোটা রাজ্যের সাধারণ মানুষের নূন্যতম ১,৯৮৩ কোটি টাকা থেকে ৩.৯৬৬ কোটি টাকার ক্ষতি (economic loss) হয়েছে। যে পরিমাণ টাকা তাঁরা লাইনে না দাঁড়ালে রোজগার করতে পারতেন। সেই সঙ্গে এসআইআর শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছাতে ও সারাদিন কাটাতে অতিরিক্ত পকেটের খরচ থেকেও রেহাই পেতেন বাংলার মানুষ।

বেসরকারি সমীক্ষা সংস্থা সরব ইনস্টিটিউট তাঁদের সমীক্ষায় জানাচ্ছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় দেড় কোটি মানুষকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। যাঁদের মধ্যে শহরের মানুষ যেমন রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন গ্রামের মানুষও। প্রতি পরিবার থেকে এসআইআর-এ ডাক পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্তত একজন করে শুনানিতে যোগ দিতে যান। সেক্ষেত্রে তিন কোটি মানুষ তাঁদের শুনানির (SIR hearing) দিনের রোজগার জলাঞ্জলি দিয়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ধরনের উপার্জন থাকায় সমীক্ষা করার সময় জিডিপি-কেই (GDP) মাপকাঠি হিসাবে ধরা হয়েছে।

বাংলার বর্তমান বাৎসরিক জিডিপি-র পরিমাণ ২ লক্ষ ৪ হাজার ৭৮১ টাকা। সেই হিসাবে মাথাপিছু বাঙালির আয় দৈনিক ৫৬১ টাকা। সর্বনিম্ন প্রতিটি নোটিশ (SIR notice) পাওয়া পরিবার থেকে যদি ২ জন করে শুনানিতে যোগ দেন, তবে তাঁদের দৈনিক ক্ষতি ১,১২২ টাকা। দেড় কোটি মানুষকে শুনানির (SIR hearing) নোটিশ পাঠিয়েছে কমিশন। প্রতি পরিবার থেকে যদি একজন করে ডাক পান, তবে দৈনিক হিসাবে আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় ১,৬৮৩ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে সর্বনিম্ন দৈনিক যাতায়াত ও খাওয়ার খরচ ১০০ টাকা হিসাবে ধরলে একটি পরিবারের খরচ নূন্যতম ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ যদি প্রতি পরিবার থেকে দুজন করে শুনানিতে অংশ নিয়ে থাকেন তবে এই ৯০ দিনের তাঁদের পরিবারের মোট আর্থিক ক্ষতি ১,৯৮৩ কোটি টাকা।

এবার অনেক ক্ষেত্রেই একই পরিবারের একাধিক মানুষকে শুনানিতে ডাকা (SIR notice) হয়েছে। অথবা একজনকে বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিকে শুনানিতে যোগ দান করানোর জন্য গড়ে পরিবারের ৪ জন করেও শুনানির দিন উপস্থিত হতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে এক একটি পরিবারের আর্থিক ক্ষতি প্রায় দ্বিগুণ। উপার্জন থেকে প্রায় ৩,৬৬৬ কোটি টাকার ক্ষতি। সেই সঙ্গে চারজনের শুনানির দিনের খরচ হিসাবে প্রায় ৬০০ কোটির লোকসান। সেখানেই পরিবারের চারজনের লোকসানের (economic loss) হিসাবে মোট লোকসান ৩,৯৬৬ কোটি টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে বলে সমীক্ষায় বেরিয়েছে।

এর সঙ্গে পরিবারগুলির পড়ুয়াদের পড়াশোনার ক্ষতির হিসাবও রয়েছে এই হিসাবে। কিন্তু তাতে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি না থাকায় এই তালিকায় তা সংযুক্ত নয়। পাশাপাশি, রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ বজায় থাকলে সেই হিসাবে মানুষের আর্থিক লোকসানের হিসাব যদি করা হত তাহলেও সর্বোচ্চ ২,১৬০ কোটি টাকার কাছাকাছি ক্ষতি হত।

আরও পড়ুন : ভোটার তালিকায় নাম তুলতে এবার বৈধ ‘ডোমিসাইল’, নয়া নির্দেশিকা নির্বাচন কমিশনের

সাধারণ মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি নির্বাচনমুখি রাজ্যে সরকারের কাজের ক্ষতিরও খতিয়ান পেশ করেছে সমীক্ষাকারীরা। বিএলও (BLO) ও মাইক্রো অবজার্ভার (micro observer) মিলিয়ে রাজ্যের ৮৮, ১০০ কর্মীকে নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন। তাঁদের ৯০ দিন ধরে কাজ করানো হচ্ছে। নিজেদের কাজের সঙ্গেই প্রথমে তাঁদের এসআইআর-এর কাজ করার চাপ দেওয়া হয়েছিল। সেই অসম্ভব কাজের প্রতিবাদের মুখে পড়ে তাঁদের শুধুমাত্র কমিশনেরই কাজ করতে হচ্ছে বর্তমানে। তাতেও কাজ শেষ করা কার্যত দায়। সেই হিসাবেই রাজ্যের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক প্রশাসনিক কাজে ক্ষতি হয়েছে।

–

–

–

