Friday, February 13, 2026

জিআই ট্যাগের আশায় বলাগড়ের নৌ শিল্পীরা

Date:

Share post:

সুমন করাতি
মধ্যযুগের বাংলা৷ শ্বাপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে ভরসা শুধু দিনের আলো৷ তবে, স্থলপথের পাশাপাশি সেই সময় নদীপথেও ভেসে যেত ছোট ডিঙি থেকে ময়ূরপঙ্খী, বজরা, জাহাজের মতো জলযান৷ চর্যাপদে পাটনী মেয়ের হাতে ‘পারানী’র কড়ি জমা দিয়ে পারাপারের বর্ণনা থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, পদাবলী সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে তরতর করে এগিয়েছে বাংলার নৌকা৷ হুগলির জমজমাট সপ্তগ্রাম বন্দরের কাহিনি আর সেই বন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা বলাগড়ের নৌকা তৈরি শিল্প আজ শুধু এক জীবন্ত কিংবদন্তিই নয়, ভারত সরকারের জিআই ট্যাগ (GI Tag India) পাওয়ার দোরগোড়ায়৷ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে শিল্প নিগমও। জানিয়েছে, নৌ-শিল্পের যন্ত্রাংশ কেনার জন্য ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে সমবায় সমিতিকে।

সেই বলাগড়কে একবিংশ শতকের আলোয় চেনা যাবে না৷ নৌকা তৈরিতে নাম-ডাক তখন বিস্তর৷ এলাকার মাঝি-মাল্লার তো বটেই, বাণিজ্য করতে আসা পর্তুগিজরাও বলাগড় থেকে কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা, বজরা, ময়ূরপঙ্ক্ষী, জাহাজ কিনে নিয়ে যায়৷ জানা যায়, জলদস্যুরাও ভালো কাঠের নৌকার সন্ধানে এখানে আসত ৷ বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া, চাঁদরা, তেতুলিয়ায় কয়েকশো কারখানায় দিনরাত এক করে চলত নৌকা গড়ার কাজ৷ এতদিনে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে বিশেষ তকমা পেতে চলেছে৷ গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্য়ায় তাঁর বই ‘হুগলি জেলার নৌশিল্প’-তে লিখেছেন, “বলাগড়ের মানচিত্র বলছে এই অঞ্চলটি ভাগীরথী তীর ঘেঁষে ৷ একসময়ে বলাগড়ের দক্ষিণে ছিল সরস্বতী নদী৷ পশ্চিমে বেহুলা ৷ বেহুলার মোহনা ছিল উত্তরে৷ পূর্বে ভাগীরথী ৷ মাঝে কানা নদী৷ জলাভূমি ছিল বলাগড়৷” তখন সপ্তগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন মাপের নৌকার চাহিদা তুমুল৷ তাই বলাগড় হয়ে ওঠে নৌ-শিল্পের আঁতুড়ঘর৷

কাল বদলেছে৷ শাসনও৷ গঙ্গা-সরস্বতী-ভাগীরথী বয়ে চলেছে৷ কিন্তু রাজনৈতিক পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে নৌ-শিল্প৷ এখন লড়াই তো শুধু টিকে থাকার৷ ডিঙি নৌকা জিআই তকমা পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে একটা আলাদা পরিচিতি পাবে বলাগড় ও তার নৌ-শিল্প ৷ ব্যবসার পরিধি বাড়লেও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন নৌ-শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ ৷ সেই সংখ্যা সামান্য ৷
নৌ-শিল্পীরা বলছেন, জিআই ট্যাগ কি তাঁদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আনবে ? রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার যদি নৌ-শিল্পের গরিমা ফেরাতে কোনও উদ্যোগ নেয়, তখনই কিছু কাজের কাজ হতে পারে৷ যেমন নৌ-শিল্পে জড়িত মজুরদের ভাতা দেওয়া অথবা ব্যবসায়ীদের নৌকার বরাত দেওয়া৷ নৌ-শিল্পকে চাঙ্গা করতে সমবায় সমিতিও গড়ে উঠেছে৷ আরও পড়ুন: শহরে ২৫টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিএনজি বাস চালু পরিবহন দফতরের

সম্প্রতি সমবায় সমিতিকে নিয়ে শিল্প নিগম বৈঠক করেছে৷ বলাগড়ের নৌ-শিল্প নিয়ে ক্লাস্টার করা হলে হয়তো একটা দিশা পাবে এই শিল্প৷ নৌ-শিল্পের যন্ত্রাংশ কেনার জন্য ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে সমবায় সমিতিকে৷ জেলার ক্ষুদ্র কুটির শিল্প দফতরের আধিকারিক সুমন নাথ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “কলকাতায় ক্ষুদ্র কুটির শিল্প সদনে বৈঠক হয়েছে৷ নৌকার ক্লাস্টারের কাগজপত্র জমা দেওয়া কথা বলা হয়েছে৷ আর্থিক সাহায্য-সহ নানাভাবে শিল্পীদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ৷”

এখন বলাগড়ের শ্রীপুরে ২১টি নৌকা তৈরির কারখানা রয়েছে৷ এছাড়া সমিতির বাইরে আরও ৪টি কারখানা৷ নৌশিল্প সমবায়ের সহ-সভাপতি সহদেব বর্মন আক্ষেপের সুরে বলেন, “এই শিল্প প্রাচীন৷ জিআই ট্যাগ পেয়ে কী হবে, এখন ঠিক বুঝতে পারছি না৷ সরকারের থেকে কখনও কোনও অনুদান পাইনি৷ ২০০০ সালের পরেও বলাগড়ে ৬৫টি কারখানা ছিল৷ এখন কমতে কমতে সেটা ১৮-২০ তে নেমেছে৷ এর মধ্যে ৭টা কারখানা তাও চলে৷ কিন্তু বাকিদের অবস্থা খুবই খারাপ৷ নৌকা তৈরি করে সংসার চলবে না৷”
বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া, চাঁদরা, তেঁতুলিয়া থেকে থেকে কাঠের নৌকা যেত বিভিন্ন জায়গায় ৷ একসময় শাল কাঠ, সেগুন কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি হত ৷ এখন কম দামের বাবলা, আম কাঠের নৌকা তৈরি হয় ৷ শাল বা সেগুন কাঠের নৌকা তৈরির বরাত কেউ দেয় না বললেই চলে, জানালেন নৌশিল্প সমবায়ের সহ-সভাপতি সহদেব বর্মন৷ সবচেয়ে ছোট নৌকা ১০ ফুট দীর্ঘ ৷ এরপর থেকে ২৮ ফুট দীর্ঘ নৌকা তৈরি হয়, যার দাম ১৫ হাজার টাকা থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সর্বোচ্চ ৫৫ ফুটের নৌকাও হয়, দাম পড়বে প্রায় ৯ লক্ষ টাকা ৷ প্রৌঢ় কাশীনাথের মতো প্রবীণ শিল্পীরা এখনও শিল্পকে আঁকড়ে রয়েছেন ৷ তরুণ প্রজন্ম আর এই শিল্পে আসছে না ৷

২০২৩ সালে জিআই ট্যাগের জন্য আবেদন করা হয়৷ এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে ৷ প্রায় এক বছর ধরে চলে শুনানি। আবেদনপত্র জমা দেন WBNSJU (বেঙ্গল ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ইউনিভার্সিটি) ডঃ পিনাকী ঘোষ৷ বলাগড়ের নৌ-শিল্পকে জিআই স্বীকৃতি দেওয়ার নেপথ্যে তিনিই মূল উদ্যোক্তা৷ এই গবেষণার জন্য তাঁকে সহায়তা করেছেন বিজয় কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়৷ গবেষকরা জানিয়েছেন, নৌ-শিল্প জিআই-এর জন্য একাধিক ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছে ৷ আবেদনপত্র জমা, শুনানি ও জিআই-এর জার্নালে এই গবেষণাপত্র তুলে ধরা হয়েছে ৷ শুধু ঘোষণার অপেক্ষা৷
কাঠের তক্তা জোড়া লাগিয়ে নৌকার আকৃতি দেয় শিল্পীরা৷ সেই কাঠগুলিকে জোড়া হয় জলুই বা লোহার পেরেক ব্যবহার করে৷ নৌশিল্প সমবায়ের সহ-সভাপতি সহদেব বর্মন বলেন, “জিআই তকমা পেলে সরকার যদি আমাদের একটা বাজার তৈরি করে দেয় এবং বাইরের ক্রেতারা আসেন, তাহলে আমরা উপকৃত হব ৷ নৌকার বাজার এখন এমন অবস্থায় যে তাতে নতুন করে শিল্পী তৈরি হচ্ছে না৷ নতুন প্রজন্ম আসছে না এই শিল্পকে বাঁচাতে৷ রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের কোনও সাহায্য করে না৷ উল্টে রাজ্য সরকার আমাদের কাছ থেকে নৌকা নেয়৷ কিন্তু তাতেও বিনিময়ে উপযুক্ত টাকা বা ভাড়া পাওয়া যায় না৷”

আঞ্চলিক গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই ঘোষণা এখনো হয়নি৷ তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জিআই ঘোষণা হতে পারে৷ এই প্রাচীন শিল্প সপ্তগ্রাম বন্দরকে ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল৷ পরে পর্তুগিজরা আসে৷ পর্তুগিজ ডাকাতরা নৌকার পৃষ্ঠপোষক ছিল৷ তখন নৌকার রমরমা৷ জিআই পাওয়ার লড়াই শুরু হয়েছিল 2022 সাল থেকে৷ এতে বলাগড় একটা স্বীকৃতি পাবে৷ কিন্তু নৌ-শিল্পের যে অবনমন হয়েছে, এখন মাত্র 19-20টি কারখানা রয়েছে৷ এই কারখানাগুলির দৈনদশা জিআই স্বীকৃতিতে কাটবে না৷ বরং এই স্বীকৃতির ভিত্তিতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার যদি এই শিল্পের পাশে না-দাঁড়ায়, তাহলে বাংলার একটি প্রাচীনতম লোকশিল্প বলাগড় থেকে হারিয়ে যাবে ৷”
সপ্তগ্রাম আছে, নৌকার চাহিদা কমেছে৷ একবিংশ শতকের কৃত্রিম মেধার আলোয় হুগলির সপ্তগ্রাম বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যের জাঁক আর বলাগড়ের নৌকা শুধু ঐতিহ্যের ঢাক৷ রাজ্য তথা দেশের মসনদে বারবার বদল ঘটেছে৷ হুগলির ছোট্ট এই জনপদের সোনালি দিন কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথ৷ স্বীকৃতি কি উদাসীন সময়ের ঘুম ভাঙাবে?

spot_img

Related articles

সমকামই পছন্দ! স্বামী-পুত্র ছেড়ে ‘প্রেমিকের’ হাত ধরলেন বীরভূমের ইন্দ্রানী

তিনি সমকামী। বলিষ্ঠভাবে তা সবার সামনে ঘোষণা করেন। আর সেই কারণে সেই সম্পর্ককেই বেছে নিয়ে শিশুপুত্র-স্বামী ছেড়ে পছন্দের...

তামিলনাড়ুতে শুরু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুকরণে প্রকল্প: প্রথম কিস্তিতে ৫০০০ টাকা অ্যাকাউন্টে

নির্বাচনমুখী তামিলনাড়ুতে চালু হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুকরণে মহিলা স্বনির্ভরতার প্রকল্প। কালাইগনার ওমেনস রাইটস স্কিম প্রকল্পে শুক্রবার থেকে শুরু...

স্বচ্ছতার লক্ষ্যে অনলাইন ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু: ব্রাত্য বসু

শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আবেদনপত্র কোথায়, কী পর্যায়ে আটকে তা জানতে এবার অনলাইন ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করল বিদ্যালয় শিক্ষা বিভাগ।...

বালুরঘাটে জমজমাট রাজ্য ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ, উপস্থিত ক্রেতা সুরক্ষা মন্ত্রীও

ক্রিকেট, ফুটবলের বাইরেও অন্য খেলাধুলাও জনপ্রিয় হচ্ছে বাংলায়। শুধু কলকাতা কেন্দ্রিক খেলাই নয়, উত্তরবঙ্গেও হচ্ছে রাজ্য এবং জাতীয়...