
লাঠিতে ভর দিয়ে একদল বৃদ্ধ একটা বাড়িতে ঢুকলেন, আর এক সপ্তাহ পর তাঁরা দৌড়ে বেরোলেন সেই বাড়ি থেকে। কোনো ওষুধ ছাড়া , কোনো সার্জারি ছাড়া। কীভাবে ?

ঘটনাটা ১৯৭৯ সালের। হার্ভার্ডের এক তুখোড় সাইকোলজিস্ট, ডক্টর অ্যালেন ল্যাঙ্গার একটা পাগলামি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি চেয়েছিলেন টাইম ট্র্যাভেল করতে, কিন্তু কোনো মেশিন ছাড়া। তিনি বেছে নেন ৮০ বছরের কাছাকাছি বয়সের ৮ জন বৃদ্ধকে। এঁদের সকলের শারীরিক অবস্থা ছিল বেশ খারাপ। কারো চোখে ছানি, কেউ কাঁপতেন, কেউ বা লাঠি ছাড়া অচল, কেউ আবার নিজের নামটা পর্যন্ত মনে রাখতে পারতেন না। তাঁদের সন্তানদেরও জানানো হয় নি যে তাদের বাবাদের পাঠানো হচ্ছে ১৯৫৯ সালে, তাও আবার কোনো ধরনের টাইম মেশিন ছাড়াই।

না, কোনো জাদুর দুনিয়া নয়। ডক্টর ল্যাঙ্গার বস্টনের এক পুরানো মনাস্ট্রিকে সাজিয়েছিলেন পুরোপুরি ১৯৫৯ সালের স্টাইলে। টিভি ছিল সাদাকালো, সেখানে চলতো ১৯৫৯ সালের খবর। চলতো এড সুলিভানের শো। রেডিওতে বাজতো সেই সময়ের গান। ম্যাগাজিন, পত্রিকা ইত্যাদি সবই ২০ বছর আগেকার। ‘ জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার ‘ নয়, বরং এখানে পৌঁছে বৃদ্ধরা ভাবতে বাধ্য হন যে, তাঁদের সকলের বয়স গেছে ২০ বছর কমে ! আহা, কী আনন্দ! ‘ এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না ‘ ।

বৃদ্ধরা সেই ঘরে প্রবেশের সময় ভেবেছিলেন তাঁদের ব্যাগপত্র টেনে আনার জন্য সাহায্য করবে কেউ। কিন্তু ডক্টর ল্যাঙ্গার কঠোরভাবে জানিয়ে দেন যে, এখানে কেউ কাউকে সাহায্য করবে না একটুও। নিজেদের সব কাজ নিজেদেরই করতে হবে। বৃদ্ধরা রেগে গজগজ করতে করতে নিরুপায় হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে নিজেদের ভারী ব্যাগ, সুটকেস ইত্যাদি নিয়ে দোতলায় উঠলেন। আর ঠিক তখনই তাঁদের মগজে প্রথম সিগন্যালটা গেলো, ‘ আমি তাহলে অক্ষম নই, আমিও পারি ‘ ! ডক্টরের কঠোর নির্দেশ ছিল, ‘ আগামী ৭ দিন এ বাড়িতে কেউ অতীত কালে ( past tense) কথা বলতে পারবেন না, সবই বলতে হবে present tense -এ , অর্থাৎ বর্তমান কালে ‘ । যেমন, প্রেসিডেন্ট এখন কীকরছেন? বা, তিনি এখন কোথায় চললেন ? তাঁরা সবাই যেন ওই সময়ের রাজনীতি, খেলাধুলা, ওই সময়ের নাচ, গান, নাটক, সাহিত্য এবং সামাজিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। যেন তাঁরা অনুভব করতে পারেন যে, তাঁরা সবাই ওই সময়ে ( ১৯৫৯ সালে ) বসবাস করছেন, বেঁচে আছেন। তাঁদের বয়স তখন যা ছিল, অর্থাৎ ৫৫ বা ৬০ , তাঁদের সেই এনার্জি নিয়ে কথা বলতে হবে।

প্রথম দুটো দিন তাঁরা সকলেই খুব স্ট্রাগল করলেন ব্যাপারটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে অদ্ভুত ম্যাজিক শুরু হলো। যে মানুষটি বাতের ব্যথায় সোজা হয়ে বসতে পারতেন না, দেখা গেল তিনি ডাইনিং টেবিলে সোজা হয়ে বসে জোর তর্ক করছেন পলিটিক্স নিয়ে। যিনি কানে কম শুনতেন তিনি রেডিওর ভলিউম কমিয়ে গান শুনছেন। আসলে ওই আশ্চর্য পরিবেশটা তাঁদের বাধ্য করেছিল ভাবতে এবং বিশ্বাস করতে যে, তাঁরা বুড়ো নন, এখনও তাঁরা সবাই মধ্যবয়সী শক্তপোক্ত পুরুষ। সপ্তাহের শেষে ডক্টর ল্যাঙ্গার নিজেই ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন আশ্রমের সামনের মাঠে বৃদ্ধদের ‘ টাচ ফুটবল ‘ খেলতে দেখে। তাঁরা সবাই রীতিমতো দৌড়োচ্ছেন যেন! এ তো অবিশ্বাস্য!
এক্সপেরিমেন্ট শেষে যখন তাঁদের শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়া হলো, তখন ডাক্তারেরা তো রিপোর্ট দেখে একেবারে থ হয়ে গেলেন। তাঁদের সকলের হাত ও পায়ের জোর বেড়ে গেছে, জয়েন্টের নমনীয়তা বেড়ে গেছে, চোখের ক্ষমতা ও শ্রবণশক্তি অনেকটাই উন্নত হয়েছে। পুনরুজ্জীবন বোধহয় একেই বলে। আই কিউ টেস্টে তাঁদের স্কোর অনেক বেড়ে গিয়েছিল, এমনকি যখন তাঁদের ফটো তোলা হলো, তখন তাঁদের সবাইকে আগের তুলনায় অনেক তরতাজা দেখাচ্ছিলো। তাঁদের শরীরের বলিরেখাগুলো অনেক কমে গিয়েছিল। মানে, শুধু মনেই নয়, শরীরেও এই প্রত্যয়ের প্রভাব পড়েছিল সরাসরি। তাঁদের বয়স রিভার্স করেছিল বায়োলজিক্যালি ।

ডক্টর ল্যাঙ্গার প্রমাণ করে দেন যে, আমাদের মন বৃদ্ধ হলে শরীরও বৃদ্ধ হতে শুরু করে। মন যখন নিজেকে অথর্ব ও অক্ষম ভাবতে শুরু করে তখন শরীরও ধীরে ধীরে ‘ শাট ডাউন ‘ হতে থাকে। আমাদের সমাজ আমাদের শেখায় যে, বুড়ো হওয়া মানেই অসুস্থ হওয়া, আর আমরা নত মস্তকে সেই স্ক্রিপ্টটাই ফলো করি। কিন্তু যখনই পরিবেশ বদলে দেওয়া হয়, ইতিবাচক কথা বলা হয়, মনের পরিচর্যা করা হয়, তখনই শরীর মনের হাত ধরে রেসপন্স করতে থাকে। একে বলে mind – body connection, প্লেসিবো এফেক্ট থেকেও কয়েক ধাপ এগিয়ে। তাই মনের বয়স কখনও বাড়তে দিতে নেই। মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার, অন্তর্লীন এনার্জির কোনো লিমিট নেই। মানুষের নেতিবাচক ভাবনা শরীরের সবচেয়ে বড়ো শত্রু। তাই সবসময় থাকতে হবে দারুণ প্রাণবন্ত।

আরও পড়ুন- বিরোধী শিবিরেই চমক, তৃণমূলের ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে আবেদন খোদ বিজেপি নেত্রীর

_

_

_
_

