কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বঞ্চনা, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিরুদ্ধে তৃণমূলের ধরনামঞ্চ মঙ্গলবার পরিণত হয়েছিল প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ধরনামঞ্চ থেকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁদের দাবি, অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে শুরু করে নাগরিক অধিকার খর্ব করা—বিজেপি সরকার বাংলাকে পরিকল্পিতভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রিয়দর্শিনী ঘোষ : বাংলাকে তিনধাপে মারার ষড়যন্ত্র করছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। প্রথমত, বাংলাকে ভাতে মারো। দ্বিতীয়ত, বাংলাকে হাতে মারো। তৃতীয়ত, বাংলাকে জাতে মারো। ২০১৪ সাল থেকেই ধাপে ধাপে ভাতে মারা শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাকে অবরুদ্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত। ইতিহাস দেখে নিন, কোনও যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোতে এভাবে কোনও রাজ্যের বকেয়া আটকে রাখার নিদর্শন কোথাও পাবেন না। ২ লক্ষ কোটি টাকা। বআংলার ২৯৪টা বিধানসভাকে সমানভাগে দিলে প্রত্যেক বিধানসভা ৬৮০ কোটি টাকা। এই টাকা কোনও সরকারের বাপের সম্পত্তি নয়। এই টাকা জনগনের করের টাকা। ওরা ভেবেছিল এই টাকা আটকে দিলে বাংলার মানু হয়তো মাথা নত করবে। কিন্তু ওরা জানে না, বাংলার মানুষ অন্য ধাতুতে গড়া। প্রয়োজনে পেটে গামছা বেঁধে ঘুমাবে, কিন্তু কটা টাকার জন্য তারা কেন্দ্রের কাছে মাথা নত করবে না। ভাতে মারার চক্রান্ত ভেস্তে যাওয়ায় বাংলাকে হাতে মারার চেষ্টা হয়েছে। শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার জন্য বিজেপি রাজ্যে আক্রান্ত হয়েছে একের পর এক বাঙালির শ্রমিক। বাংলার উপর এত রাগ কেন? তারপর এখন ওরা বাঙালিকে জাতে মারতে চাইছে। বাংলা বললেই বাংলাদেশে পুশব্যাক! অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবিকে মনে আছে তো? বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীরে ‘লোডশেডিংবাবু’ বলে আক্রমণ। ২০২১ সালে তো লোডশেডিং করে জিতেছিলে। এবার তো আমরা হ্যালোজেন নিয়ে তৈরি থাকবো। এবার তোমারও বিসর্জন হবে, বিজেপিরও বিসর্জন হবে।

সুমন ভট্টাচার্য : যখন এই ধরনা চলছে, তখনও জ্ঞানেশ কুমার কলকাতায় রয়েছেন। তাই একটা কথা স্পষ্ট করে দিতে চাই, জ্ঞানেশ কুমার কিন্তু ভারতবর্ষের ভাগ্য বিধাতা নন। সেই জন্য আজকে তিনি ‘জনগনমন’ গানটা নিয়েও ভুল কথা বলেছেন। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হয়ে যিনি এইটুকু জানেন না, তার নাম সত্যি সত্যি ভ্যানিশ কুমার হওয়া উচিত। এসআইআরের জন্য বাংলায় ১৮০ জনেরও বেশি লোক মারা গিয়েছেন। তার মধ্যে প্রচুর বিএলও-ও রয়েছেন। জ্ঞানেশ কুমারের এইটুকু সৌজন্য নেই যে মৃতদের কয়েকজনের পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন, কথা বলেন যে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সমস্ত পরিবারকেই এখানে নিয়ে এসেছেন, সম্মান জানিয়েছেন। তাই তাঁর মতো মুখ্যমন্ত্রী গোটা ভারত আগে দেখেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই লড়াই বাংলার লড়াই, বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই। বিজেপি কোনওভাবেই বাংলার স্পিরিটকে নষ্ট করতে পারবে না।

মানস ভট্টাচার্য: যারা দেশের হয়ে খেলেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ফুটবল ও ক্রিকেটে সুনামের সঙ্গে দেশের সম্মান রক্ষা করেছেন, এসআইআরে নাগরিকত্বের প্রমাণ চেয়ে তাদের নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। মহম্মদ শামিকে নোটিশ পাঠিয়েছে, লক্ষ্মীরতন শুক্লাকে নোটিশ পাঠিয়েছে, মেহতাব হোসেনকে নোটিশ পাঠিয়েছে। আসলে এইসব কিছুই বাংলার এই সংঘবদ্ধ ব্যাপারটাকে নড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা জানে না, বাংলায় একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন। তিনি সারা বাংলার বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের হয়ে একাই লড়াই করছেন। আমরা খেলার মাঠের মানুষ সবাই তাঁর পাশে আছি। ছাব্বিশের নির্বাচনে বাংলা এমনভাবে জিতবে, যে এরপর ওরা বাংলায় আসার আগে দুবার ভাববে।

অসিত খাটুয়া: ৩৪ বছরের শাসনে জঙ্গলমহলের মানুষের গণতন্ত্র কেড়ে নিয়েছিল সিপিএম। ২০০৫ থেকে সেই জঙ্গলমহলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরা সেই সময় থেকেই তাঁর পাশে রয়েছি। আজকে বিজেপি সীমান্ত দইয়ে লোক ঢোকাচ্ছে আর এসআইআরের নামে বাংলার মানুষের বৈধ ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। বিজেপি আর নির্বাচন কমিশনের এই যৌথ চক্রান্তের প্রতিবাদে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য ফের লড়াইয়ে নেমেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর আমরা, জঙ্গলমহলের সমস্ত মানুষের এই লড়াই তাঁর হাতকে শক্তিশালী করতে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। কারণ, জঙ্গলমহল মহলের মানুষ লড়াই করে বেঁচে থাকার মূল্য জানে। বাম আমলের সন্ত্রাস কাটিয়ে আজকে জঙ্গলমহলর মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদে সুখে-শান্তিতে আছে।

সুনন্দা মুখোপাধ্যায় (রাজ্য মহিলা কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন) : একটা নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য, একটা গণতান্ত্রিক সিস্টেম পাল্টে দেওয়ার জন্য এত চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র। ত্রিপুরাতেও যখন এর আগে সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রের সরকার চক্রান্ত করেছিল, মানুষ বুঝতে পারেনি। মানিক সরকার লোক খারাপ ছিলেন না। তাও কেউ বুঝে ওঠার আগেই চক্রান্ত করে বিহার, আসাম থেকে লোক ঢুকিয়ে সরকারটা ফেলে দিল। বিহারেরও একইরকম লক্ষ লক্ষ নাম বাদ দিয়ে সরকার ফেলে দিয়েছে। ওদের সাহসটা খুব বেড়ে গিয়েছে। আসামে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, মিঁঞাদের রাখা যাবে না! মিঁঞাদের তাড়াতে হবে! অশিক্ষা কোন পর্যায়ে গিয়েছে? মিঁঞা কাদের বলে জানেন? মিঁঞা অত্যন্ত সম্মানীয় অভিজাত মুসলিমদের বলা হয়। মিঁঞাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ! কতটা অশিক্ষিত হতে পারে? জানেই না এই শব্দের, এই নামের কী মাহাত্ম্য! যদিও আসলে সেই অভিজাত মুসলিমদের ওরা কিছু করে না। ওরা গরিব খেটে খাওয়া সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে। মুসলিম, মতুয়াদের মতো যেসব সংখ্যালঘু মানুষের একটা লড়াইয়ের ইতিহাস আছে তারাই ওদের টার্গেট! বাবা সাহেব আম্বেদকরকেও এই লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যারা শিক্ষার পক্ষে, জাতপাতের বিপক্ষে, বর্ণবাদের বিপক্ষে, প্রগতিশীলতার পক্ষে— তারা সবাই এদের টার্গেট।

আরও পড়ুন- মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় মমতার লড়াই ‘ঐতিহাসিক’, ধর্নামঞ্চে বললেন সুবোধ সরকার

_

_

_
_

