দলের পরিস্থিতি এবং নীতির কারণে মুখ ফেরাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। বৃদ্ধতন্ত্রে ভরে গিয়েছে উপর থেকে নীচ। এদিকে নিয়ম অনুযায়ী, ৭৫ বছর বয়সের বেশি কেউ পলিটব্যুরো সদস্য থাকতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিতে কী হবে সাধারণ সম্পাদক? কারাই বা যাবেন পলিটব্যুরোতে? এইসব জটিল প্রশ্ন নিয়ে শুরু হচ্ছে সিপিআইএমের (CPIM) ২৪তম পার্টি কংগ্রেস (Party Congress)। তামিলনাড়ুর মাদুরাইতে বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই সম্মেলনেই সিদ্ধান্ত হবে মহম্মদ সেলিম (Md Salim), না বৃন্দা কারাট (Brinda Karat)- কাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেছে নেবে দল? তার উপরেই নির্ভর করবে আগামী দিনে পার্টির রণকৌশল ও ভাবমূর্তি।

সীতারাম ইয়েচুরির মৃত্যুর পর থেকে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দল পরিচালনা করছেন প্রকাশ কারাট (Prakash Karat)। তবে নিজে দলের সাধারণ সম্পাদক হতে আর আগ্রহী নন বলেই তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে সূত্রে খবর। এর পরেই উঠে আসেছে বৃন্দা কারাট, মহম্মদ সেলিম, এমএ বেবি, অশোক ধাওয়ালের নাম ৷ আবার সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক যিনি হবেন, তিনি পার্টি কংগ্রেসের প্রকাশ্য সমাবেশে ভাষণ দেবেন এটাই প্রথা। সেই হিসেবে দেখতে গেলে এবারের পার্টি কংগ্রেসের বক্তা তালিকার নাম রয়েছে, প্রকাশ, বৃন্দা, কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও তামিলনাড়ুর জি রামকৃষ্ণন, মহিলা নেত্রী ইউ বাসুকি।

বয়সের নিয়ম যদি কঠোর ভাবে মানা হয় তাহলে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের সম্ভাব্য তালিকা থেকে বাদ পড়বে প্রকাশ, বৃন্দা, বিজয়ন এবং রামকৃষ্ণনের নাম। এইসব দিক বিবেচনা করলে এগিয়ে থাকছেন সেলিম, বেবি এবং ধাওয়াল। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, সাধারণভাবে সিপিএম এমন লোককে সাধারণ সম্পাদক করে যাঁকে বেশ কয়েকটি টার্ম রাখা যাবে। সেক্ষেত্রে মহারাষ্ট্রের কৃষক নেতা অশোক ধাওয়ালের বয়স ইতিমধ্যেই ৭৩ বছর পেরিয়েছে। সেক্ষেত্রে বেবি বা সেলিম কারও নামে সিলমোহর পড়তে পারে।

এখন দেশের মধ্যে একমাত্র কেরালাতেই টিমটিম করে ক্ষমতায় রয়েছে বামেরা। এই পরিস্থিতিতে সেখানকার দলের মেরুকরণ এবং মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের মতামতের গুরুত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর সেটা হলে বিজয়নের সঙ্গে বেবির সম্পর্ক একেবারেই মধুর নয়। সাধারণত সাধারণ সম্পাদক পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধিরা নির্বাচন করেন। তবে শীর্ষ নেতৃত্বের ঠিক করে রাখা ব্যক্তিই সর্বসম্মত ভাবে নির্বাচিত হন। এই পরিস্থিতিতে বেবির নাম প্রস্তাব হলে কেরালা লবি থেকেই তার বিরোধিতা হতে পারে।


এক্ষেত্রে ‘হারাধনের দশটি ছেলের’ মধ্যে রইল বাকি এক- মহম্মদ সেলিম। সীতারামের মৃত্যর পরেই বাংলার রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের নাম সর্বভারতীয় রাজ্য সম্পাদক হিসেবে উঠে আসে। দলের বেশিরভাগ শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বই চেয়েছিলেন বয়সে অপেক্ষাকৃত কম মহম্মদ সেলিম দায়িত্ব নিন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। যদিও সে দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তীকালীন। এই পাটি কংগ্রেস (Party Congress) থেকে সম্পূর্ণ সময়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বেছে নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে অন্যদের থেকে এগিয়ে সেলিম। সুবক্তা বলে পরিচিত সেলিম বিভিন্ন ভাষায় সাবলীল। সেক্ষেত্রে দক্ষিণী নেতাদের হিন্দি ভাষা সবচেয়ে বড় সমস্যা।


তবে অতীতেও অনেকবার নিয়ম ভেঙেছে নিজেদের শৃঙ্খলা বাধ্য বলে দাবি করা সিপিএম বিশেষ করে বয়সের ক্ষেত্রে একাধিকবার নিয়ম ভেঙে পদে রাখা হয়েছে অনেককেই। তার প্রধান কারণ নতুন মুখ উঠে না আসা। ৮০-র দোরগোড়ায় থাকা বিজয়নকে কেরালায় এবং ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পলিটব্যুরোর সদস্য মানিক সরকারকে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলিতে রেখে নিয়ম ভেঙেছে সিপিএম। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নকে আরও একটি টার্ম পলিটব্যুরোতে ধরে রাখার বিষয়েও একমত বিদায়ী পলিটব্যুরো। সেটাই যদি হয়, তাহলে প্রকাশ কারাটকেই সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হতে পারে।

আবার নতুন ভোরের সূচনা করতে বৃন্দা কারাটকে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করতে পারে সিপিএম। সে ক্ষেত্রে বয়স পেরোলেও নারী শক্তির উত্থানের উদাহরণ সামনে রেখে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে পারে তারা। প্রকাশ কারাট ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, দলের নেতাদের অবসরের বয়সসীমায় ছাড় নিয়ে এই পার্টি কংগ্রেসেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরালা, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি- এই পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে দলের সাধারণ সম্পাদক বাছাই করা এবং রাজ্যভিত্তিক লবিকে সন্তুষ্ট রাখাটা সিপিএমের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে কেরালাতেই একমাত্র তাদের সরকার রয়েছে। বাকিগুলির বেশিরভাগেই তারা শূন্য। এই পরিস্থিতিতে কোন সমীকরণে কাকে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পার্টি কংগ্রেস বেছে নেয় সেটাই দেখার।

–
–

–
