
” গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে
বলেছিল একটি পাখি
হঠাৎ বুকে বিঁধল যে তীর
স্বপ্ন দেখা হলো ফাঁকি… ”
তোমরা ডোডো পাখিদের হত্যা করেছো নির্বিচারে। ওরা তোমাদের কাছে আসতো কী সরল বিশ্বাসে! আর তোমরা? নিশ্চিহ্ন করে দিলে ওদের দুনিয়া থেকে? এতো রক্ত মেখেছো দু’হাতে , মাংস খেয়েছো অঢেল! যা হোক, মকিংবার্ডদের মেরো না, বাঁচিয়ে রেখো। ওরা তো আসে গান শোনাতে , কী সুন্দর সুর ওদের গলায়। কারো ক্ষতি করে না। বাগানের ফল, ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে না। কাছে আসে, ভালোবাসে আর তিরতির তিরতির করে এগোতে থাকে ছন্দে আনন্দে।

” পাখিটার বুকে যেন
তীর মেরো না
ওকে গাইতে দাও
ওর কণ্ঠ থেকে
গান কেড়ো না… ”

উত্তর আমেরিকার গায়ক পাখি মকিংবার্ড । এরা হরবোলা। অন্যান্য পাখি, কীটপতঙ্গ এবং বিভিন্ন প্রাণীর ডাক এরা হুবহু নকল করতে পারে। তাই এদের অনুকরণকারী বলা হয়। এদের গায়ের রঙ সাধারণত ছাই ও সাদা বর্ণের হয় এবং এদের লেজ লম্বা হয়। ধর্মে ও সাহিত্যে এরা নিষ্পাপ ও সুন্দর হিসেবে আদৃত। এই পাখিদের মানুষের নজরে আসার অন্যতম কারণ হলো গান। শহর ও মফস্বল এলাকায় প্রায়ই রাতে এদের গান শোনা যায়। পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য তার গানের ভাণ্ডার হাটখোলা করে দেয়। ভালোবাসা, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক এই পাখি।

মকিংবার্ডরা নিজেদের এলাকা নিয়ে খুব সচেতন। যদি তারা বুঝতে পারে যে, তাদের বাসা হুমকির মুখে পড়েছে , তাহলে সঙ্গেসঙ্গে দলবদ্ধভাবে তারা ঘুরে দাঁড়ায় এবং পাল্টা লড়াই করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। শুধু তাই নয়, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে এরা মারাত্মক হয়ে ওঠে, তখন এরা মানুষ কিংবা বড়ো কোনো প্রাণী, কাউকে রেয়াত করে না।
এখানে উল্লেখ্য, মার্কিন লেখিকা হার্পার লি-র পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী দারুণ জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ টু কিল আ মকিংবার্ড ‘ – এ কোনো মকিংবার্ড মারা যায় নি। ‘ To Kill a Mockingbird ‘ উপন্যাসের মূল বার্তা হলো, মকিংবার্ডরা কোনো ক্ষতি করে না, তাই এদের মারা অপরাধ, পাপ। তবে গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র ‘ টম রবিনসন ‘ নামের এক নির্দোষ কালো মানুষকে মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে বন্দী রাখা হয় এবং পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে গুলি করে মারা হয়। যে নির্দোষ, নিরপরাধ, তাঁকে বিনা বিচারে হত্যা করার মতো অপরাধ আর কি-ই বা হতে পারে!
এই উপন্যাসটি একটি কিশোরীর বেড়ে ওঠার কাহিনি , যার কেন্দ্রে রয়েছে বর্ণবাদ ( বর্ণবৈষম্য ) , সামাজিক অবিচার এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্ব। মহামন্দার সময়কার আলাবামায় একজন বিপত্নীক আইনজীবী অ্যাটিকাস ফিঞ্চ একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ লড়াই করেন। সেই আইনজীবীর দুই সন্তান, স্কাউট ও জেম। তারা দুজনেই অল্পবয়সী। এই উপন্যাসে নাগরিক অধিকার তথা ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে লেখিকার কলম যথেষ্ট সংবেদনশীল। উপন্যাসে টম রবিনসন এবং বু রেডলি-র মতো নিরীহ মানুষদের তুলনা করা হয়েছে নির্দোষ মকিংবার্ডদের সঙ্গে।

মকিংবার্ডরা বন্য পরিবেশে গড়ে আট বছর বাঁচে। তবে মানুষের তত্বাবধানে থাকলে এরা নাকি প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। এরা প্রধানত পোকামাকড় ও বেরি খায়। এছাড়াও কিছু কিছু ফল এদের পছন্দ। বসন্তের শেষভাগে এবং গ্রীষ্মকালে এরা প্রচুর পরিমাণে বিটল, ফড়িং, পিঁপড়ে, শুঁয়োপোকা, বোলতা ইত্যাদি খায়। নর্দার্ন মকিংবার্ডরা নাকি প্রায় ২০০টি পর্যন্ত গান শিখতে পারে । হরবোলার মতো বিভিন্ন আওয়াজ নকল করতে পারে বলেই এরা পাখি হিসেবে এতো আকর্ষণীয়। অন্যান্য পাখিদের আওয়াজ তো বটেই, এমনকি গাড়ির হর্ন, বিভিন্ন অ্যালার্মের শব্দ এবং বাড়ির দরজার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ পর্যন্ত এরা হুবহু নকল করতে পারে। যদি কোনো স্ত্রী পাখি বেশি গান গাওয়া পুরুষ পাখিকে পছন্দ করে, তখন সেই পুরুষ পাখি তার চারপাশের বেশ কিছু শব্দ দ্রুত নিজের গানের ভাণ্ডারে যোগ করে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অর্থাৎ এখানেও সেই চিরকালের ‘ ইমপ্রেস ‘ তত্ত্ব ! এরা না থাকলে মহাবিশ্ব থেকে মুছে যাবে কিছু বিরল সুর, অকপট প্রতিশ্রুতি, অটুট আশ্বাস আর অসামান্য ভালোবাসা। তাই, বেঁচে থাকো গো, বেঁচে থাকো মকিংবার্ড ।

আরও পড়ুন- রাজ্যের সব প্রকল্পই অন্ধকারে! মানুষের পরিষেবা নিয়ে আশঙ্কায় মমতা

_
_
_
_
