রাত পোহালেই প্রসিদ্ধ রাস উৎসবের সূচনা, কোচবিহারে সাজ সাজো রব

সোমনাথ বিশ্বাস, কোচবিহার

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এখন বোধহয় তা বেড়ে তিপান্নয় পৌঁছেছে! আর সেই পরব যদি ঐতিহ্য বহন করে, তবে তো সোনায় সোহাগা। যেমনটা হয়েছে কোচবিহারের রাসের ক্ষেত্রে। রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা নিয়ে আপাতত মগ্ন এক সময়কার রাজনগর কোচবিহার। এ বছর মেলার ‘২০৭ তম বর্ষ’। আগামী ১১ই নভেম্বর, সোমবার পূর্ণিমা তিথিতে রাসমেলা শুরু হচ্ছে। সেদিন সন্ধ্যায় মদনমোহন মন্দির চত্বরে রীতি মেনে, রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা করবেন ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি তথা কোচবিহারের জেলাশাসক পবন কার্দিয়ান ।

রাজ-রাজাদের আমল শেষ হওয়ার পর রাসমেলার আয়োজক এখন কোচবিহার পুরসভা। পুরসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এমজেএন স্টেডিয়াম ও লাগোয়া মাঠে এবার মেলা চলবে টানা ১৫ দিন। সেখানে থাকবে সার্কাস, মরণকূপ, টয়ট্রেন, হরেক রকমের নাগোরদোলা-সহ দু’হাজারেরও বেশি রকমারি দোকান।

মেলা উপলক্ষে পুরসভার সাংস্কৃতিক মঞ্চে এবারেও জমকালো জলসার আয়োজন করা হয়েছে। পুরপ্রধান ভূষণ সিং জানান, ‘‘রাসমেলার সঙ্গে সমগ্র জেলাবাসীর আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। ফলে মেলার আয়োজনে কোনও খামতি রাখা হবে না।’’ অন্যদিকে, মদনমোহন মন্দির চত্বরে কীর্তন, ভাগবত-পাঠ, ধর্মীয় যাত্রানুষ্ঠান-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কথিত আছে ১৮১২ সালে কোচবিহারের ভেটাগুড়িতে প্রথম রাসমেলার আয়োজন করা হয়। ওই বছর রাসপূর্ণিমা তিথিতে কোচবিহারের মহারাজ হরেন্দ্রনারায়ণ ভেটাগুড়িতে নবনির্মিত রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন। সেই উপলক্ষে সেখানে মেলার আসর বসে। তার পর ১৮৯০ সালে কোচবিহার শহরের বৈরাগী দিঘির পাড়ে মদনমোহন মন্দির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। ওই বছর থেকেই মন্দির লাগোয়া এলাকায় মেলা বসছে বলে ইতিহাস গবেষকদের ধারণা।

এরপর ১৯১৭ সাল নাগাদ ‘প্যারেড গ্রাউন্ড’-এ মেলা স্থানান্তরিত হয়, এখন যেটা রাসমেলার মাঠ নামেই পরিচিত। মেলার আয়তন বেড়ে যাওয়াতেই মেলার মাঠ সরানো হয়েছিল। ১৯২৮ সালে মেলায় প্রথম বিদ্যুতের আলো ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন – মুখ্যমন্ত্রীকে একবার সামনে থেকে দেখতে উৎসুক কোচবিহার রাস উৎসবের রাসচক্র নির্মাতা আলতাফ

২০৭ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যশালী ও ঐতিহাসিক রাসমেলা এখনও পর্যন্ত এক বছরই বন্ধ ছিল। সালটা ১৯২৩। শহরে কলেরা ছড়িয়ে পড়ায় মেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোচবিহারের রাজাদের কুলদেবতা মদনমোহন দেবের মেলা এই রাস উৎসবকে ঘিরেই, যেখানে ফি-বছর দর্শনার্থীদের ঢল নামে। এই জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে তো বটেই, গোটা উত্তরবঙ্গ, অসম, এমনকী প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান থেকেও অসংখ্য মানুষ মেলায় ভিড় জমান।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

রাসমেলা উপলক্ষে কোচবিহার জুড়ে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করেছে জেলা পুলিশ। মেলা চত্বরে পর্যাপ্ত পুলিশ থাকছে। ভিড়ের মধ্যে থাকবেন সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরাও। পাশাপাশি বসানো হয়েছে সিসিটিভিও। মেলা চত্বরেই অস্থায়ী ভাবে পৃথক থানা তৈরি করা হয়। মেলামাঠের একপ্রান্তে তৈরি হয় ওই অস্থায়ী থানা। কাছেই বাঁশ-টিন-কাঠ দিয়ে গড়া হয় অস্থায়ী লকআপ। মেলার ভিড়ে চুরি-ছিনতাই কিংবা মদ্যপ অবস্থায় ঘোরাফেরা থেকে ইভটিজিং— ধরা পড়লেই সোজা ওসি রাসমেলার দফতরে চালান। দীর্ঘ দিনের এই ট্রাডিশন বজায় থাকছে এবারেও।

রাসচক্র ও আলতাফ মিঁঞা

ফি-বছরের মতো এবারেও মদনমোহন মন্দিরে রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা হবে সোমবার রাতে। দিনভর উপোস করে পুরোহিতের পাশে বসে বিশেষ পুজো করবেন কোচবিহারের জেলাশাসক। পুরোহিতের নির্দেশ মেনে মন্ত্রোচ্চারণের পর রাসচক্র ঘুরিয়ে রাস উৎসবের সূচনা করবেন তিনি। তার পর ওই রাসচক্র ঘোরানোর সুযোগ পাবেন দর্শনার্থীরা। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কোচবিহারের মহারাজারা ওই রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা করেছেন। মেলা চলা পর্য্যন্ত রাসচক্র ঘোরাতে উপচে পড়ে ভিড়।বংশানুক্রমিক ভাবে রাসচক্র তৈরির কাজের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কোচবিহার শহর লাগোয়া হরিণ চওড়ার একটি মুসলিম পরিবার। ওই পরিবারের উত্তরসূরি আলতাফ মিঁঞার দায়িত্বে এখন রাসচক্র নির্মাণ হয়। তিনি লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে চক্র গড়ার কাজ শুরু করেন। এ বারেও তার হেরফের হয়নি। বাঁশ কেটে বাতা তৈরি করে শুকিয়ে কাগজের কারুকাজ, পাট দিয়ে গড়া দেবদেবীর ছবি আটকানো সবটাই নিজের হাতে। তাই ২২ ফুট উঁচু কোচবিহারের রাসচক্র যেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক। আলতাফ জানিয়েছেন, ‘‘বহু বছর ধরে আমি রাসচক্র গড়ছি। ছেলেকেও শেখাচ্ছি। আমার আগে দাদু পান মহম্মদ মিঁঞা, বাবা আজিজ মিঁঞা এই কাজ করেছেন। পরম্পরাটা ধরে রাখতে চাই।’’

পুতনা রাক্ষসী ও পুতুলঘর

এখানকার রাসমেলার অন্যতম আকর্ষণ, পুতনা রাক্ষসীর বিশালাকার মূর্তি। তার টান এড়ানো মুশকিল। মদনমোহন মন্দির চত্বরের এক প্রান্তে বড়সড় ট্রলির উপর ওই মূর্তি তৈরি করা হয়। এবারেও মৃৎশিল্পী পূর্ণেশ্বর চিত্রকরের হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে পুরাণের খণ্ডচিত্র।

মেলা উপলক্ষে মদনমোহন মন্দির চত্বরে ধর্মীয় কাহিনী মডেলের মাধ্যমে পুতুল ঘরে সাজিয়ে রাখাটাও এখানকার পুরনো ঐতিহ্য। রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনীর টুকরো ছবি ছাড়াও নানা ধর্মীয় গল্পও মূর্তির মডেলের মাধ্যমে মন্দিরের দেওয়াল লাগোয়া এলাকা জুড়ে তৈরি পুতুল ঘরে সাজিয়ে রাখা হয়। রাতের আলোকসজ্জায় এসবই হয়ে ওঠে নজরকাড়া। কোচবিহারের সদর মহকুমাশাসক তথা বোর্ডের সদস্য সঞ্জয় পাল জানিয়েছেন, ‘‘পুতনা মূর্তি থেকে পুতুলঘর, সবই এবার নতুন করে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

                                                                                                          ছবি – বিকাশ মণ্ডল

আরও পড়ুন – উত্তরবঙ্গ সফর বাতিল, বিধ্বস্ত এলাকায় কাল মমতা