করিমপুর উপনির্বাচনে তৃণমূলের হাতিয়ার NRC, বঞ্চনার তালিকা তুলে ধরছে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি

আগামী ২৫ নভেম্বর নদীয়ার করিমপুরে উপনির্বাচন। নামে ত্রিমুখী, কিন্তু লড়াই মূলত শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে উত্তাপ ততই বাড়ছে করিমপুরে। দু’পক্ষেরই দাবি, জিতবে তারাই। ২০১৬ বিধানসভা এবং ২০১৯ লোকসভার নিরিখে তৃণমূল কংগ্রেস এখানে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে এগিয়ে। যদিও এবারে ফল অন্যরকম হবে বলেই দাবি গেরুয়া শিবিরের।

অংকের বিচারে তৃণমূল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, এবার উপনির্বাচন হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য প্রেক্ষিতে। সময় যত গড়িয়েছে, ততই ইস্যুভিত্তিক প্রচারে ঝাঁজ বাড়িয়েছে গেরুয়া শিবির। এখানে বিজেপি প্রার্থী হয়েছেন রাজ্য বিজেপি সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। তাঁকে জেতাতে করিমপুরের মাটি কামড়ে পড়ে আছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিনহা, ভারতী ঘোষ, কৈলাস বিজয়বর্গীয়রা পালা পালা করে প্রচার আসছেন করিমপুরে। সীমান্তবর্তী এলাকা, তাই আরএসএস-এর পক্ষ থেকেও জোর দেওয়া হচ্ছে এই নির্বাচনে।

বিজেপি প্রার্থী জয়প্রকাশ মজুমদার-এর অভিযোগ, গতবারের তৃণমূল বিধায়ক মহুয়া মৈত্র গত তিন বছর এখানে কোনও কাজই করেননি। করিমপুর দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, অভিভাবকহীন। বিধায়ক কার্যত করিমপুর ছেড়ে পালিয়েছেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ হওয়ার জন্য। এখন ভোটের সময় তিনি আবার এলাকায় এসেছেন। এলাকার মানুষ সব বুঝতে পারছে।

বিজেপি প্রার্থীরা আরও দাবি, করিমপুর উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীর নিজের কোনও মেরুদন্ড নেই। মহুয়া মৈত্রের শেখানো বুলি আওড়াচ্ছেন তিনি। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই তৃণমূল প্রার্থী বিমলেন্দু সিংহ রায়ের। এমন বিধায়ক করিমপুরের মানুষ চান না।

স্থানীয় বালিয়াডাঙ্গা এলাকার ভূমিপুত্র তৃণমূল প্রার্থী। বিজেপির পাশাপাশি ওই এলাকার মানুষের দাবি, নিজের গ্রামের ভোটই পাবেন না বিমলেন্দুবাবু। করিমপুরের আরও একটি ফ্যাক্টর তৃণমূল প্রার্থীর বিপক্ষে যাচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এই এলাকার বেশ কিছু পুজোতে প্রত্যক্ষভাবে শাসক দলের স্থানীয় নেতারা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে, যেটা এলাকার মানুষ একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, বিমলেন্দু সিংহ রায় নিজের গ্রামকে ভালোভাবে চেনেন না। গ্রামের মানুষের সমস্যার কথা তাঁর অজানা। তৃণমূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও অভিযোগ না থাকলেও, উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর আশেপাশে যাঁরা ঘোরাফেরা করছেন, তাঁরা স্বার্থন্বেষী। বিমলেন্দু সিংহ রায়ের মুখটাকে সামনে রেখে আদতে তারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে চাইছে।

করিমপুরের বেশ কিছু জায়গায় সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। যাদের সমর্থন তৃণমূল পায়। তবে এবার পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টেছে বলে দাবি বিজেপির। বিজেপি নেত্রী মাফুজা খাতুন সংখ্যালঘু এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর দাবি, ভোট এলেই সংখ্যালঘুদের কথা মনে পড়ে তৃণমূলের। করিমপুরের সংখ্যালঘুরা বঞ্চিত। এবার সংখ্যালঘুদের একটা বড় অংশ বিজেপিকে সমর্থন করবে। তৃণমূল যতই এনআরসিকে প্রচার আনুক, করিমপুরের তার প্রভাব পড়বে না বলেই জানালেন মাহফুজা খাতুন।

অন্যদিকে, সিপিএম প্রার্থী গোলাম রাব্বি কার্যত লড়াইয়ের ময়দানে নেই। কিন্তু সংখ্যালঘু ভোটে তিনি থাবা বসাতে পারেন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আর যদি সেটা হয়, হলে কপালে ভাঁজ পড়তে বাধ্য ঘাসফুল শিবিরের।

বিজেপি প্রার্থী জয়প্রকাশ মজুমদার জানাচ্ছেন, তিনিও করিমপুরের ভূমিপুত্র। করিমপুরের তাঁর মামার বাড়ি। আর পাশের গ্রামে তাঁর দেশের বাড়ি। তাঁর বাবাও নদীয়া জেলার বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের ৪বারের বিধায়ক ছিলেন। সুতরাং, এই এলাকার তাঁর কাছে অপরিচিত নয়। তিনি যদি করিমপুরের বিধায়ক নির্বাচিত হন, তাহলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের চাহিদা রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেবেন। পাশাপাশি, এখানে বড় কোনও হাসপাতাল নেই, চিকিৎসার জন্য গ্রামের মানুষকে ছুটতে কৃষ্ণনগর কিংবা কলকাতায়। তাই হাসপাতাল বানানোয় জোর দেবেন তিনি। করিমপুর কৃষিভিত্তিক এলাকা, এখানকার কৃষকদের স্বার্থে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী এলাকা বলে NRC-কে হাতিয়ার করে ভোটের ময়দানে নেমেছে তৃণমূল। বিজেপি জিতলে NRC দাবি আরও জোরালো হবে বলেই প্রচার করছে ঘাসফুল শিবির। একইসঙ্গে, মহুয়া মণ্ডল গত তিনবছরে করিমপুরের যে উন্নয়ন করেছেন, তার ফিরিস্তিও তুলে ধরছেন তৃণমূল প্রার্থী বিমলেন্দু সিংহ রায়। করিমপুরে কোনও স্থায়ী বাস টার্মিনাস ছিল না। যার দরুন ব্যাপক যানজট হতো করিমপুরে। ২০১৬ সালে তৃণমূল জেতার পর মহুয়া মৈত্র বাস টার্মিনাস বানিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করেছেন। স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্যাপক উন্নতি করেছেন বলে দাবি তৃণমূল শিবিরের।

যদিও প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে সেভাবে কাজ হয়নি বলে অভিযোগ বিরোধীদের। সব মিলিয়ে করিমপুরে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। যুযুধান দুইপক্ষ তৃণমূল ও বিজেপি কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ।

আরও পড়ুন-লস্করের টার্গেট, ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে কলকাতায় বিরাট