Monday, January 12, 2026

‘এপ্রিলে সাবধান’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

অমলবাবু বাড়ি আছেন ? মোবাইলে এই প্রশ্ন অমলবাবুর দীর্ঘদিনের পরিচিত শ্যামলবাবুর । শ্যামলবাবু জানালেন ভীষণ জরুরি প্রয়োজনে তিনি সস্ত্রীক আসছেন অমলবাবুর বাড়িতে । বৌদি যেন চা বানিয়ে রাখেন । চা তৈরি । এরপর অপেক্ষা । তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সস্ত্রীক শ্যামলবাবুর দেখা আর পেলেন না অমলবাবু । কিছুটা অবাক হয়েই গুনগুন করতে লাগলেন , তোমার দেখা নাই রে তোমার দেখা নাই । কিন্তু , ব্যাপারটা কী হলো ? এমন তো হওয়ার কথা নয় । অগত্যা শ্যামলবাবুকে রিং করলেন অমলবাবু , কিন্তু বিধি বাম । ফোন বন্ধ ।

বিমল , সত্য , সাধন , উত্তম , গৌতম ও অন্যান্য বন্ধুদের দল সকাল সাতটায় হাঁক পেড়ে ঘুম ভাঙালো মিন্টুর । ঘুম চোখে ধড়মড় করে উঠে এসে মিন্টু জানলো যে , আজ রবিবার পাড়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্টে একটা বিশেষ দলের হয়ে খেলতে হবে তাকে । সকাল দশটার আগেই পৌঁছাতে হবে মাঠে । সেইমতো সকাল দশটার আগেই মাঠে গিয়ে মিন্টু দেখলো ব্যাট , বল , উইকেট তো দূরের কথা , মাঠে কেউ নেই । জনমানবশূন্য ধুধু প্রান্তর । ভীষণ অবাক হয়ে মিন্টু ভাবতে লাগলো , কী ব্যাপার ? এমন তো হওয়ার কথা নয় ।

জয়তী ফোন করে জয়ন্তকে জানিয়েছে আগামীকাল মেট্রোয় ম্যাটিনি শো দেখতে চায় সে । জয়ন্ত যেন দুটো ব্যালকনির টিকিট কেটে রাখে । নির্দিষ্ট সময়ে টিকিট কেটে প্রায় ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির পথ ধরলো জয়ন্ত । জয়তী এলো না । সিনেমা হলে এলো না জয়তী , মনে তার নিত্য যাওয়া-আসা । কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয় । হাঁটতে হাঁটতে হতাশ জয়ন্ত মগজের জট খোলার জন্য একটা সিগারেট ধরালো ।

শিলং থেকে শিকাগো , কলকাতা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া সর্বত্রই উক্ত তিনটি ঘটনার মতো হাজার হাজার ঘটনা ঘটতে থাকে বছরে মাত্র একটি দিন । বড়ো মজার সেই দিনটি । পয়লা এপ্রিল । এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটি । যে দিনটিকে ভালোবেসে ’ এপ্রিল ফুল দিবস ‘ বলা হয় । বোকা বানানোর দিন ।

কিন্তু এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটিকে বোকা বানানোর দিন হিসেবে উদযাপন করার পিছনে লম্বা ইতিহাস আছে । এক এক দেশে এক একরকম সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ রয়েছে ইতিহাসের এই গল্পগুলোর ।

১৫৬৪ সালে ফ্রান্স দেশের ক্যালেন্ডার বদল করে । এর আগে বছর শুরু হতো মার্চের শেষ থেকে । কিন্তু ওই বছর সেটি বদল ক’রে নতুন বছর শুরু করা হয় ১ জানুয়ারি থেকে । এই পরিবর্তন অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি । তাঁরা ২৫ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত নতুন বছরের সূচনা পালন করতে থাকেন । যাঁরা পরিবর্তন মেনে নেন তাঁদের বোকাও বানাতে থাকেন । তাঁদের পিঠে কাগজের তৈরি মাছ লাগিয়ে দেওয়া হয় । নতুন ক্যালেন্ডারের পক্ষে যাঁরা , তাঁদের ডাকা হতো এপ্রিল ফিস নামে । সেই থেকেই এপ্রিল ফুলের গল্প শুরু হয় । এটিই এপ্রিল ফুল নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্প ।

রোমান তত্ত্বও খুব আকর্ষণীয় । রোমান দেবতা প্লুটো যখন তাঁর স্ত্রী পারসিফনকে অপহরণ করে আনেন , তখন পারসিফনের মা সেরিস মেয়েকে খোঁজার অনেক চেষ্টা করেন । কিন্তু , পান না । তখন মেয়েটি মাটির নীচে , অথচ তার মা বোকার মত মাটির উপরে খুঁজতে থাকেন । সেই বোকামির কথা ভেবেই নাকি রোমানরা এই দিনে বোকামি দিবস পালন করতো ।

বৃটিশ লোককথা অনুযায়ী নটিংহ্যামশায়ারের গথাম শহরটি নাকি ছিল বোকাদের শহর । দেশের রাজা রাষ্ট্রের সম্পত্তির হিসেব নিতে সেই শহরে ঢোকার কথা ঘোষণা করতেই গথামবাসীরা রাজাকে আটকাতে নানা ধরনের বোকামি শুরু করেন । ফলে রাজা আর গথাম শহরে আসেন না । সেই থেকেই নাকি বোকা দিবসের সূচনা ।

১৯৫০ সালের ১ এপ্রিল জার্মানির অগসবারগ শহরে একটি আলোচনা সভা বসার কথা ছিল । অনেকেই আলোচনার ফলের কথা ভেবে বিপুল টাকার বাজি ধরেন । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই সভা বাতিল হয় । বহু মানুষের টাকা জলে যায় । এই বোকামি থেকেই সেখানে এপ্রিল ফুলের শুরু ।

১৫৭২ সালের ১ এপ্রিল নেদারল্যান্ডসের ডেন ব্রিয়েল শহরটি স্প্যানিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় । এই দিন বিদ্রোহীরা স্পেনের শাসকদের বোকা বানিয়ে ছাড়ে । তারপর থেকেই নাকি সেখানে এপ্রিল ফুলের সূচনা ।
ইতিহাস গবেষকদের কেউ কেউ বলেন , এপ্রিল ফুল ডে আবার হিলারা নামক উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত । এই ল্যাটিন শব্দের অর্থ আনন্দদায়ক ।

আবার পারস্যের উৎসব সিজদাহি বেদার ও জিউয়িসদের পুর্ণিমের সঙ্গেও এপ্রিল ফুলের সাদৃশ্য খুঁজে পান অনেকেই । এ সমস্ত উৎসব আমাদের ভারতবর্ষসহ সব জায়গাতেই বসন্ত আগমনের সময় পালিত হয় এবং এগুলোর সঙ্গে আনন্দ ও ছেলেমানুষী জড়িয়ে আছে ।

এছাড়াও রয়েছে অন্য গল্প । জিওফ্রে চসার তাঁর চতুর্দশ শতাব্দীর ‘ দ্য ক্যান্টেরবারি টেলস্ ‘ – এ ৩২ মার্চ বা ১ এপ্রিলের উল্লেখ করেছেন । এই সংগ্রহের একটি গল্প ‘ নান্স প্রিস্টস টেল ‘ – এ লেখা আছে যে , রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড ও বোহেমিয়ার রানি অ্যানির এনগেজমেন্টের তারিখ ৩২ মার্চ ঘোষিত হয় । জনগণ সেই ঘোষণাটিকে সত্য মেনে বিশ্বাস করে নেন । তখন থেকে ৩২ মার্চ অর্থাৎ ১ এপ্রিল , এপ্রিল ফুল ডে হিসেবে পালিত হতে শুরু করে ।

হাসিঠাট্টা , রঙ্গরসিকতা ও নানান মজা-মস্করায় পরিপূর্ণ এই দিনটি কিন্তু আজকের এই ভীষণ উদ্বেগে ভরা জীবনে অবশ্য পালনীয় । কেননা এপ্রিল ফুল দিনটিতে সেই বিশুদ্ধ ও নির্মল অক্সিজেন , যা একটা দিনের জন্য হলেও গোটা মানবসভ্যতাকে হাঁফ ছেড়ে সম্পূর্ণ ভারমুক্ত হয়ে বাঁচার আশ্বাস দেয় ।

আরও পড়ুন- তৃণমূলের আইটি সেল-এর জরুরি ঘোষণা

spot_img

Related articles

আইন রক্ষায় নিহত বাবা, তাঁরই ছেলে প্রতারণায় জেলে!

দু’দশক আগে এক বর্ষবরণের রাতে তিলোত্তমার বিবেক জাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এক অপরিচিতা তরুণীর সম্মান বাঁচাতে মদ্যপ সহকর্মীদের সামনে...

IND vs NZ: নতুন বছরে বিরাটের ব্যাটিং বিক্রম, জয়ের মধ্যেও থাকল উদ্বেগের ছায়া

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম একদিনের ম্যাচে ৪ উইকেটে জিতল ভারত। ২০২৫ সালেযেখানে শেষ করেছিলেন ২০২৬ সাল সেখান থেকেই শুরু...

সোমে মিলনমেলায় ডিজিটাল যোদ্ধাদের সঙ্গে বৈঠকে অভিষেক

বাংলা বহিরাগত জমিদারদের হাতে অপমানিত, লাঞ্ছিত। সেই বাংলাবিরোধীদের মিথ্যা ও অপপ্রচারের মোকাবিলায় তৃণমূল ময়দানে নামিয়েছে ডিজিটাল যোদ্ধাদের। ডিজিটাল...

অনুপ্রবেশকারী খুঁজবে AI! নির্বাচনে নতুন গ্যাঁড়াকল শিণ্ডে-ফড়নবিশ জোটের

ভোটের আগে ফের মাথা চাড়া দিচ্ছে মানুষের উপর নজরদারি আর হয়রানির রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নতুন অ্যাপ ব্যবহার...