Tuesday, February 24, 2026

‘বাঙালি দুর্গাকে ভোলে নি’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

সেই কাশফুল , সেই শরৎকাল , সেই দুর্গা ।

তফাৎ শুধু কাঠামোয় ।
মহিষাসুরমর্দিনীর বদলে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের প্রাণবন্ত বালিকা । অকাল বোধনের বদলে অকাল বিসর্জন । আর , কী আশ্চর্য , মৃত্যুতেই অমর সেই দুরন্ত কিশোরী ! বেঁচে থাকার চেয়েও ঢের বেশি জীবন্ত মৃত দুর্গা ।

কাশবনে আখ চিবোতে চিবোতে দুর্গার কানে আসে অদ্ভুত এক আওয়াজ । সঙ্গে সঙ্গেই ভাই অপুর হাত ধরে ছুট রেললাইনের দিকে । তারপর দেখা যায় অপু রেলগাড়ি দেখছে । দুর্গা ধারেকাছে নেই । ভীষণ জ্বরে কাবু বিছানায় ধুঁকতে থাকা দিদি ভাইকে বলছে , ‘ আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি ? ‘

ফ্রয়েড বলছেন , যে শোকের উদযাপন হয় নি , যে হারানোর ক্ষতি কখনও নিরুপিত হয় নি , মনের আড়ালে তা বিষাদের সুর হয়ে বাজে । জানা যায় , পথের পাঁচালী উপন্যাসে বিভূতিভূষণ প্রথমে দুর্গাকে রাখেন নি । শুধু অপু ছিল । একদিন হঠাৎ ভাগলপুরের রঘুনন্দন হল-এ একটি মেয়েকে দেখেন যার এলোমেলো চুল হাওয়ায় উড়ছে । তার চোখে যেন কি এক অবর্ণনীয় বার্তা , অপূর্ব আহ্বান , আর মধুর বেদনার এক অদেখা জগৎ । সেই মুহূর্তে লেখকের মনে সৃষ্টি হলো দুর্গার । মনে হলো , এই বালিকা ছাড়া তাঁর লেখা ব্যর্থ , নির্জীব ।

আর একটি মেয়ের কথাও এ প্রসঙ্গে আসে । সাহিত্যের ইতিহাসকার সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের বয়ান থেকে জানা যায় বিভূতিভূষণের সবচেয়ে ছোটো বোন , বাড়ির সকলের আদরের মেয়ে , যাকে ‘ দুর্গা ‘ বলে ডাকতেন লেখক , অল্প বয়সে মারা যায় । এই বোনটিকে ভুলতে পারেন নি বিভূতিভূষণ । এই কি সেই প্রকৃতিকন্যা , অপুকে পৃথিবীর পথে অনেকটা এগিয়ে দিয়ে , গ্রামবাংলার অনিঃশেষ সৌন্দর্যের পাঠ দান করে যে নিজেই একদিন অসময়ে হারিয়ে গেলো ?

পৃথিবীর প্রতিটি তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসের প্রতি যে বালিকার ছিল তুমুল আকর্ষণ । ভাঙা আয়নায় বনফুলের সাজ , সিঁদুরের কৌটো চুরি , লক্ষ্মীর চুপড়ি থেকে আলতা নেওয়া আর বনভোজনের রান্নায় আগামীতে স্বামীগৃহে যাওয়ার আভাসের পরতে পরতে কিশোরী দুর্গার অতৃপ্ত আকাঙ্খার অতিদ্রুত আনাগোনা । বিভূতিভূষণ লিখেছেন , ‘ দুর্গা আজকাল যেন এই গাছপালা , পথঘাট , এই অতি পরিচিত গ্রামের অন্ধিসন্ধিকে অত্যন্ত বেশি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিতেছে । … তাহার সোনা খোকা ভাইটি … মন হুহু করে … তাহাকে ফেলিয়া সে কতদূর যাইবে ? … তাহার মনে হয় একটা কিছু তাহার জীবনে শীঘ্রই ঘটিবে … ‘ ।

জীবনের পালা যে তার দ্রুত সমাপ্ত হয়ে আসছে তার আভাসও হয়তো পেয়ে থাকবে সে । বড়ো দুরন্ত মেয়ে । বনেবাদাড়ে একা একাই ঘুরে বেড়ায় । ঝোপের আড়ালে আবডালে কোথায় কী পাওয়া যায় সবই জানা আছে তার । বনজঙ্গল ঢুঁড়ে সে সংগ্রহ করে আম , জাম , নারকেল , মাকাল ফল , কামরাঙা , আরও কত কি ! বনজঙ্গল তার প্রসাধনেরও জোগান দেয় । ওড়কলমি ফুলের নোলক পরতে সে ভালবাসে । শুকনো নাটা ফল আর খাপরার কুচিতে ভরে ওঠে তার সাধের খেলনার বাক্স । বালিকা দু্র্গার গড়ন রোগাসোগা । গায়ের রঙ একটু চাপা । হাতে কাঁচের চুড়ি , মাথার চুল রুক্ষ , ডাগর ডাগর চোখ , মুখের গড়ন মন্দ নয় ।

যে নীরেন নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে একদিন চলে যায় তাকেই মনে মনে বরণমালা পরায় দুর্গা । তার বিয়েতেও রানু দিদির বিয়ের মতো বাজি-বাজনার রোশনাইয়ের স্বপ্ন দেখে সে । সুদর্শন পোকাকে দুর্গা জানায় তার বাসনার কথা । জানায় তার প্রার্থনা।

একটা মৃত্যু কতটা শোকাবহ হতে পারে ? একটা মৃত্যুর অভিঘাত কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে ? ইন্দির ঠাকরুন , হরিহর , সর্বজয়া , সকলের মৃত্যু হয়েছে । আর দুর্গার মৃত্যু হয়েছে সবার আগে । দস্যি মেয়ে তার সমস্ত সাধ-আহ্লাদ মুলতুবি রেখে হঠাৎই বিদায় নিয়েছে সংসার থেকে । কিন্তু বাঙালি কিছুতেই ভুলতে পারে নি তাদের আদরের ছোট্ট দুর্গাকে । আবহমান হাহাকার অতিক্রম করে আজও সবচেয়ে বেশি বেঁচে আছে অকাল প্রয়াত কন্যাটি । পথের পাঁচালী উপন্যাসে এবং চলচ্চিত্রে দুর্গার মৃত্যুতে যতটা শোকাভিভূত হয়েছেন বাঙালিরা , বাস্তবে তাঁদের কোনো প্রিয়জনের প্রয়াণেও বোধহয় ততটা বিমূঢ় বোধ করেন না । মৃত্যুটির রচয়িতা বিভূতিভূষণ এখানেই অনন্য ।

বালিকা দুগ্গির বয়সও আর বাড়ে নি । সে আজও কারোর ছোট্ট দিদি , কারোর ছোট্ট বোন , কারোর আদরের ছোট্ট মেয়ে । পথের পাঁচালী , অপরাজিত ও অপুর সংসারের দীর্ঘপথ পেরিয়ে ছোট্ট ভাইটির হাত ধরে কাশবন ভেদ করে আজও সে ছুটতে থাকে রেললাইনের দিকে । বালক ও বালিকার নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের বাইরে সেই প্রথম পা রাখা । মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখা বিদ্যুতের অতিকায় খুঁটি , টেলিগ্রাফের তারের অদ্ভুত রিনরিনে শব্দ , আর দারুণ বেগে ছুটে চলা রেলগাড়ি ! শরৎকাল , কাশবন , দেবীর আবাহন , বিসর্জন । বালক অপুর জীবনে অকালে নেমে আসা অনন্ত বিষাদ ।

যাও অপু , অচেনা পৃথিবীকে চিনে এসো । দুগ্গা দুগ্গা । জয় দুর্গা।

আরও পড়ুন- পাকিস্তানকে দুরমুশ করতেই, ভারতীয়  টিমকে সংবর্ধনা দিতে নিমন্ত্রণ পাঠালেন রাজ্যপাল!

 

 

spot_img

Related articles

ভারতের হারের মধ্যেই চিন্তা বাড়াল হরমনপ্রীতের চোট

টি২০ সিরিজ জয়ের পর একদিনের সিরিজের শুরুতে হার ভারতের মহিলা(India Women) দলের। অস্ট্রেলিয়ার(Australia W vs India W) বিরুদ্ধে...

অপ্রত্যাশিত তুষারপাত, বরফে ঢাকল সান্দাকফু

দার্জিলিং (Darjeeling) জেলার সান্দাকফু (Sandakfu) এলাকায় সোমবার গভীর রাত থেকে তুষারপাত (snowfall) শুরু হওয়ায় হঠাৎ করেই বদলে গিয়েছে...

ভারতের সেমির স্বপ্নে কাঁটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জানুন সূর্যদের জটিল সমীকরণ

টি২০ বিশ্বকাপের(T20 World Cup) সুপার আটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হেরে এমনিতেই প্রবল চাপে ভারত(India)। টিম ইন্ডিয়ার...

প্রথম সমকামী প্রধানমন্ত্রী! কে এই রব জেটেন

এই প্রথম বার কোনও সমকামী প্রধানমন্ত্রী পেল নেদারল্যান্ডস (First Gay Prime Minister) রব জেটেন। ইতিহাস মাফিক দেশের কনিষ্ঠতম...