Saturday, April 4, 2026

‘রহস্যময় রূপান্তর’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

” এক সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখল— সে পোকা হয়ে গেছে ! ”
‘ দ্য মেটামরফসিস ‘ উপন্যাসের প্রথম লাইন এটি ।

জার্মান ভাষায় লেখা ।‌ বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম সেরা বাক্যবন্ধ হিসেবে এই লাইনটিকে গণ্য করা হয় । নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক বিশ্ববরেণ্য গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ পর্যন্ত আলোড়িত হয়েছিলেন এই বাক্যবন্ধের স্পর্শে ।

এই বাক্যের স্রষ্টা ফ্রানৎস কাফকা । ১৯৮৩ সালের ৩রা জুলাই তৎকালীন অস্ট্রিয়া- হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের প্রাহা ( প্রাগ ) শহরে ( বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ) এক মধ্যবিত্ত জার্মান-ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি । যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে ১৯২৪ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে মারা যান তিনি । বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী লেখক হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন কাফকা । তাঁর মাতৃভাষা ছিল চেক , তিনি লেখালিখি করতেন জার্মান ভাষায় ।

Metamorphosis শব্দটি গ্রীক শব্দ Metamorfosi থেকে এসেছে , যার অর্থ রূপান্তর । এটা এক ফর্ম থেকে অন্য ফর্মে পরিবর্তিত হওয়ার অবস্থা । আকৃতির পরিবর্তন , রূপান্তরিত আকৃতি , চরিত্রের পরিবর্তন ।

কে গ্রেগর সামসা ? কী হয়েছিল তাঁর ?

গ্রেগর একজন ভ্রাম্যমান বিক্রেতা । এককথায় ফেরিওয়ালা । একদিন সকালে ঘুম ভাঙলে তিনি এক কিম্ভূতকিমাকার বিশাল পোকার রূপে নিজেকে আবিষ্কার করেন । তারপর থেকেই শুরু হয় এক অসহনীয় পরিস্থিতি । তিনি তাঁর চাকরি হারান । ধীরে ধীরে নিজের পরিবারের সকলের সহানুভূতিও হারান ।
হয়ে ওঠেন অবাঞ্ছিত । তাঁর অসুস্থতা বাড়তে থাকে । একসময় মারা যান । ঘরের পরিচারিকারা ময়লা আবর্জনার সাথে বাইরে ফেলে দিয়ে আসেন তাঁকেও ।

সাহিত্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন অদ্ভুত সব ঘটনা যাঁর ভাষার সৌন্দর্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে , যিনি বিশ্বসাহিত্যকে বারবার দিয়েছেন বাঁক বদলের খোরাক , সেই ফানৎস কাফকার অসামান্য সৃষ্টি ‘ মেটামরফসিস ‘ হলো সামগ্রিক শরীরের প্যাটার্নের পরিবর্তন , যা কিছু প্রাণীর জন্মের পরে বা হ্যাচিং – এর পরে ঘটে থাকে । এর দুটি সুপরিচিত উদাহরণ হলো শুঁয়োপোকার প্রজাপতিতে এবং ট্যাডপোল থেকে ব্যাঙে রূপান্তর ।

মেটামরফসিস বিকাশের একটি পরোক্ষ রূপ , যেখানে একটি রূপান্তরিত প্রাণী প্রাপ্তবয়স্ক আকারে পৌঁছানোর আগে রূপগতভাবে স্বতন্ত্র পর্যায় অতিক্রম করে । এর বিপরীতে , মানুষ এবং অন্যান্য অনেক প্রাণী সরাসরি বিকাশের মধ্যে দিয়ে যায় , যার মধ্যে শিশু এবং বৃদ্ধ একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ , আকার এবং যৌন পরিপক্কতা ছাড়া । জেলিফিশ , স্পঞ্জ , কিছু প্রজাতির কৃমি এবং কিছু পতঙ্গ সহ প্রাণীজগতের
অন্তত ১৭ টি ফাইলে মেটামরফসিস ঘটে । পরিবেশগত সংকেত প্রায়ই একটি প্রাণীর মধ্যে হরমোনের পরিবর্তন ঘটায় যা রূপান্তরের মূল অনুঘটক ।

কাফকার ‘ দ্য মেটামরফসিস ‘ উপন্যাসের মূল চরিত্র গ্রেগর সামসা অতিকায় পতঙ্গে পরিণত হয়েছিল , কিন্তু তাঁর স্মৃতি যুক্ত হয়েছিল অতীতে । গ্রেগর কেন চেয়েছিলেন তাঁর রূপান্তর ? তিনি কি আদৌ চেয়েছিলেন ? যা ঘটেছিল তা কি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ? নাকি সবই ঘটেছে তাঁর মনের মতো ক’রে ? যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের , সেই পাখি অথবা পতঙ্গের জীবন তিনি কি দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর শরীরের রূপান্তর ঘটিয়ে ?
কেন ঘটে স্বত্বার এই সঙ্কট ? একি ক্রমাগত দণ্ডিত আধুনিক মানুষের এক ধরনের প্রতিবাদ নয় ? এক স্বত্বা যেন প্রাণপনে খুঁজে চলেছে প্রতিদিনের যাপিত জীবনের সঙ্গে তার গূঢ় সংযোগটিকে । বারবার সে ব্যর্থ হচ্ছে , ফলাফল শূন্য থাকছে , অর্থাৎ ভয়াবহ এক শূন্যতা ঘিরে ফেলছে তাকে । আর এই শূন্যতার মাঝেই যেন লুকিয়ে রয়েছে জীবনের অনন্ত সৌন্দর্য । ভ্যানগগের চিত্রকলায় যে রহস্য লুকানো , কাফকার রচনাতেও যেন লুকিয়ে রয়েছে সেই একই রহস্য ।

এক অলীক দুনিয়া থেকে নিরেট বাস্তবে পাঠকদের নামিয়ে আনা বড় সহজ কাজ নয় । কাফকার লেখা আপাত দুর্বোধ্য , কিন্তু অসম্ভব প্রতীকী এবং তেমনই মননশীল । পাঠকের হৃদয়ের অতলে পৌঁছে যাওয়া যে কোনো লেখকের একমাত্র বাসনা । কাফকা এই ক্ষেত্রে বারবার সফল হয়েছেন । তিনি সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং সেই সমস্যার পথে এগিয়ে চলাও শেখান । এরপর পাঠক তথা মানুষের একটাই কাজ বাকি থাকে । তা হলো চূড়ান্ত সমাধান বা অন্তিম গন্তব্যে পৌঁছোবার পথ খুঁজে নেওয়া।

তাঁর দুঃস্বপ্নতাড়িত লেখার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘ দ্য মেটামরফসিস ‘ । এখানে শুরুতেই বোঝা যায় , নিয়মের শেকলে বাঁধা এই জীবন সহজে নিস্তার দেবে না তোমাকে ।‌ সবসময় তাড়া করে বেড়াবে এবং নিশ্চিত হতে চাইবে যে তুমি এই আরোপিত সিস্টেমের একজন অনুগত ভৃত্যমাত্র ।

পোকায় পরিণত হবার আগে গ্রেগরের যে জীবন ছিল তা অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে। এই দীর্ঘ ক্লান্তির ভয়াবহ বিপন্নতা থেকে পরিত্রাণ পেতেই যেন পোকায় রূপান্তর । এক অস্তিত্বের সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পেতে আরেক অস্তিত্বে গমণ । সেখানেও সঙ্কট কম নয় ।

গ্রেগর সামসা এখন পোকা হয়েছে । এখন সে পোকার মতোই বাঁচবে । তবু কোথাও যেন আমাদের এই ভয়ঙ্কর উদ্ভট বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গান গাইতে থাকে গ্রেগররূপী পোকাটি । গাইতে থাকে নবজীবনের গান । পালাবদলের গান । রূপান্তরের গান ।

জীবনকে কিছুটা সহনীয় করে তোলার জন্য মানুষ কী না করতে পারে ? সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তো একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লো পোকা-গ্রেগর । এমনকি পরিবারের সদস্যরাও তার সঙ্গী হলো না । গ্রেগরের রূপান্তরিত স্বত্বার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই করলো না কেউ । তার প্রতিবাদের ধরনটাও বুঝলো না কেউ।
হতে পারে এটি রূপক , প্রতীকী , জীবনের ক্লান্তির অবসানের চূড়ান্ত রূপ । কিন্তু আমরা সবাই কি এক অর্থে গ্রেগরের মতোই বন্দী নই ? আমরাও কি রূপান্তরের অনেকটা কাছাকাছি অথবা রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্যে নেই ?

এসব ভাবার দায়িত্ব কি শুধুমাত্র গ্রেগর সামসার ?
হায় গ্রেগর ! হায় আমরা !

আরও পড়ুন- পারস্পরিক বৃদ্ধির দিশা দেখাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া সম্মেলন

Related articles

মায়ানমারে ক্ষমতায় জুংটা: রাষ্ট্রপতি পদে শপথ সেনাপ্রধান মিন লাইংয়ের

সংসদীয় নির্বাচনে জিতে ফের মায়ানমারের ক্ষমতায় সামরিক দল জুংটা। শুক্রবার দেশের রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নিলেন সামরিক প্রধান মিন...

রাহুলের মৃত্যু নিয়ে ম্যাজিক মোমেন্টসের উত্তরে সন্তুষ্ট নয় আর্টিস্টস ফোরাম,শনিতে FIR-র সিদ্ধান্ত

অভিনেতা রাহুলের মৃত্যুতে টলিউডের অন্যতম নামী প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টসের (magic moments) বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) করতে চলেছে আর্টিস্টস...

প্রবল ভূমিকম্প আফগানিস্তানে, কম্পন টের পেল কাশ্মীর

রাতের অন্ধকারে প্রবল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান। একে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে (Afghanistan) প্রায় প্রতিদিন মৃত্যু মিছিল লেগে...

পূর্ব ভারতে প্রথম উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরায় পোষ্যদের কানের ভিতর পরীক্ষা AHPL-এ

পূর্ব ভারতে প্রথম পোষ্যদের জন্য সফলভাবে অ্যাডভান্সড ভিডিও অটোস্কোপি/অরাল এন্ডোস্কোপি চালু করেছে অ্যানিমেল হেলথ প্যাথলজি ল্যাব (AHPL)। একের...