Wednesday, February 25, 2026

‘এন্টার দ্য ড্রাগন’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

রাস্তায় বখাটে ছেলেদের হাতে প্রায়ই মার খেতো ছেলেটি । বেদম মার । প্রত্যাঘাত দূরের কথা , প্রতিরোধ পর্যন্ত করতে পারতো না শান্ত নিরীহ সেই ছেলে । মূলত আত্মরক্ষার তাগিদে সে ঝুঁকে পড়ে মার্শাল আর্টে । পরবর্তীতে এই ছেলেটির হাত ধরেই চলচ্চিত্রে পা রাখে মার্শাল আর্ট । তারপর তো ইতিহাস । দুনিয়া কাঁপিয়ে কোটি কোটি মানুষের মন জয় করে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু আজও রহস্যের চাদরে ঢাকা। এই মানুষটি নব মার্শাল আর্টের জনক ব্রুস লি । যাঁর অকস্মাৎ মৃত্যু নিয়ে নানা সন্দেহ ও বিতর্ক আজও বহমান ।

একের পর এক সুপারহিট ছবি , রহস্য , রোমাঞ্চ আর অভিনবত্বে ভরপুর । তাঁর সমকালে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই অভিনেতার হঠাৎ মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারে নি । ১৯৭৩ সালে একটি সিনেমার শুটিং চলাকালীন ব্রুস লি হঠাৎ করেই ভীষণ অসুস্থ বোধ করেন , তাঁর মস্তিষ্কে প্রদাহ শুরু হয় এবং মাথা ফুলে উঠতে থাকে । অসহ্য , ভয়াবহ যন্ত্রণা হতে থাকে ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই রোগের নাম সেরিব্রাল এডেমা । ডাক্তারদের সার্বিক চেষ্টায় সেই যাত্রায় কোনোভাবে রেহাই পেলেও তাঁর সেই মুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় নি । কয়েক সপ্তাহ পর থেকে আবার মাথা ফুলতে থাকে । ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই তাঁর এক সহ-অভিনেত্রী বেটি টিং পেইর কাউলুনের বাড়িতে সিনেমার শুটিং সংক্রান্ত একটি প্রয়োজনে যান ব্রুস লি । সেখানে আবার মাথাব্যথা শুরু হওয়ায় তাঁকে ইকুয়াজেসিক নামে একটি পেইনকিলার খেতে দেওয়া হয় । সেটা খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েন তিনি । কিন্তু তারপর আর কিছুতেই ঘুম থেকে ওঠানো যাচ্ছিল না তাঁকে । এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে । ডাক্তাররা বারবার তাঁর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন । তার কয়েক ঘণ্টা পরেই ঘোষণা করা হয় ব্রুস লি মৃত ।

বিতর্কিত মৃত্যু । অস্বাভাবিক মৃত্যু । ব্রুস লি কেন মারা গেলেন অকালে ? অতিরিক্ত ড্রাগ নেওয়ার ফল ? তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ কি তাঁর অস্বাভাবিক ডায়েট ? কাঁচা ডিম ও কাঁচা মাংস খেতেন তিনি । পান করতেন কাঁচা দুধ। নিজেকে ফিট ও তাজা রাখতে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতেন তিনি । তাঁর মৃত্যুর প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট অ্যালার্জির কারণে তিনি মারা গেছেন । মাথা ব্যথা থেকে রেহাই পেতে তিনি নিয়মিত ব্যথা নিরোধক ওষুধ খেতেন । তাই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক । আবার তাঁর মৃত্যু নিয়ে এমন কথাও শোনা যায় যে , এক শ্রেণীর চলচ্চিত্র প্রযোজক ও মাফিয়াদের চক্রান্তের শিকার হন তিনি । তাঁর অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা ও বক্স অফিসের বিপুল চাহিদা দেখে কিছু পরিচালক ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ওঠেন । ব্রুসের ছবির সঙ্গে তখন অন্য ধারার ছবিগুলো কিছুতেই পাল্লা দিতে পারছিলো না । তাই ব্রুস লি-কে সুকৌশলে হত্যা করা হয় , এমন ধারণা উড়িয়ে দেওয়া যায় না ।

হংকংয়ের কিছু মাফিয়া ব্রুসের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল । এমনকি এমনও শোনা যায় যে তাঁকে খুন করার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়েছিল । অসুস্থ অবস্থায় যে অভিনেত্রীর বাড়িতে পেইনকিলার খেয়েছিলেন ব্রুস , তাঁকেও অনেকেই দায়ী করেন ব্রুসের মৃত্যুর জন্য । ডাক্তারদের একাংশ মনে করেন অতিরিক্ত ক্যানাবিস সেবন কিংবদন্তি অভিনেতার মৃত্যুর কারণ হতে পারে । তাঁরা এও দাবি করেন যে , হাসিস ও মারিজুয়ানার মতো ড্রাগের কারণে তাঁর মস্তিষ্ক ফুলে উঠেছিল । একজন মার্কিন বিশেষজ্ঞ বলেন যে , অতিরিক্ত ডোজের ক্যানাবিসে বিষাক্ত কিছু থাকতে পারে । আবার অনেক মনে করেন তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ তাঁদের পারিবারিক অভিশাপ । তাঁদের পরিবার নাকি অভিশপ্ত । ব্রুস লি-র বড়ো ভাইয়ের অকাল মৃত্যু এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে ।

” Knowing is not enough , we must apply ” , বলে গেছেন ব্রুস লি । ব্রুস ইউন ফান লি ( নভেম্বর ২৭ , ১৯৪০ — জুলাই ২০ , ১৯৭৩ ) একজন চীনা মার্শাল আর্ট শিল্পী , শিক্ষক , অভিনেতা এবং ‘ জিৎ কুন
দো ‘ নামক নতুন ধরনের মার্শাল আর্টের স্রষ্টা । তাঁর জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে । তাঁর মৃত্যু হয় হংকং- এ । সিনেমায় শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তাঁর পায়ের কাজ ও শরীরের ভারসাম্য রক্ষার অসামান্য কৌশল সারা বিশ্বকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছে বারবার । মার্শাল আর্টের মাধ্যমে শত্রু দমনের সময় বারবার মনে হয় যেন নৃত্যরত ব্রুস লি । ছোটবেলায় কুংফু শিখেছেন তিনি , সঙ্গে নাচ ও অভিনয় । সিয়াটলে থাকার সময় তিনি তিনি তাঁর প্রথম মার্শাল আর্ট স্কুল খোলেন । সেই সময়েই তিনি তাঁর নিজস্ব কৌশলে তৈরি করেন অভিনব এক ঘরানা ।

জিৎ কুন ডো , প্রাচীন কুংফু , বেড়া , বক্সিং ও দর্শনের যথাযথ সংমিশ্রণে তৈরি নতুন এক শৈলী , স্বাতন্ত্রে ও গতিময়তায় যা আজও অনন্য , যা আজ বিরল এক শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে । আজও ‘ এন্টার দ্য ড্রাগন ‘ (১৯৭৩ ) চলচ্চিত্রটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় ও সুপারহিট ছবি হিসেবে বিশ্ববন্দিত । এই ছবি ব্রুসকে আন্তর্জাতিক মুভি স্টারডমে পরিণত করে । কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে , এই ছবিটি হংকং-এ মুক্তির ছ ‘ দিন আগে ব্রুস লি মারা যান।

এমন বর্ণময় প্রতিভা সচরাচর বিরল । একেবারে একার চেষ্টায় পশ্চিম বিশ্বে চীনা সংস্কৃতির ধারণা বদলে দিয়েছিলেন ব্রুস লি । অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্র গতিতে তিনি যেভাবে তাঁর হাত ও পা ব্যবহার করতেন তা দেখে সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম বিমোহিত হতেন ।‌ তাঁর অনন্য স্টাইল আজও অননুকরণীয়।

আরও পড়ুন- কাঁথিতে প্রার্থী দিল কংগ্রেস, ঝুলে রইল জয়নগর

 

spot_img

Related articles

অভিষেকের নির্দেশে পাকিস্তানে আটক মৎস্যজীবীদের বাড়ি তৃণমূলের সাংসদ-বিধায়ক

নামখানার তিন জন মৎস্যজীবী আটক রয়েছেন পাকিস্তানে। তিন বছর হয়ে গেল খোঁজ নেই আজও। এদিকে চিন্তায় রয়েছেন তাঁর...

মোদি সরকারের বইতে বিচার ব্যবস্থার অবমাননা: NCERT-র বিরুদ্ধে মামলার পথে সুপ্রিম কোর্ট!

খোদ কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে এনসিইআরটি। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বর্ষের একাধিক সিলেবাসে এমন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, যা...

উদাহরণ কেরালম, ফের দিল্লিকে ‘ইন্দ্রপ্রস্থ’ করার দাবি জানিয়ে চিঠি বিজেপি সাংসদের

বামশাসিত কেরালার নাম বদলে সিলমোহর মিলতেই ফের রাজধানীর নাম পরিবর্তনের ধুঁয়ো তুলল বিজেপি। মঙ্গলবারই, রাজ্যের দাবি মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে...

কলকাতা পুলিশের বড় সাফল্য! তিলজলা শুটআউটে একদিনের মধ্যে ধৃত বাবা-ছেলে

তিলজলা শুটআউট (Tiljala Shootout) কাণ্ডে বড় সাফল্য পেল কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police)। পুলিশি তৎপরতায় মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতা...