Monday, April 27, 2026

‘হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

” বাঁশুরিয়া বাজাও বাঁশি

দেখিনা তোমায়
গেঁয়ো সুর ভেসে বেড়ায় oi
শহুরে হাওয়ায় ”
( কবীর সুমন )

আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছর আগে জার্মানির ছোট্ট শহর হ্যামিলিন-এ ঘটেছিল এক চমকপ্রদ ঘটনা । হ্যামিলিনের গির্জার দেওয়ালে আঁকা ছবি থেকে প্রথম এ ঘটনার কথা জানতে পারে মানুষ । পরে এ নিয়ে অনেক গল্পগাথা তৈরি হয় । অনেকেই বলেন এ ঘটনা মোটেও সত্য নয় । গোটা ব্যাপারটাই প্রতীকী । কেউ বলেন গোটাটাই রূপকথা । যাই হোক , মূল গল্পে আসা যাক ।

৭০০ বছর আগে জার্মানি এত আধুনিক ছিল না । হ্যামিলিন ছিল জার্মানির হ্যানোভারের ৩৩ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহর । এক সময়ে সেই শহরের মানুষ ইঁদুরের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে । সেখানে ইঁদুরবাহিত রোগ যেমন মহামারীর আকার ধারণ করে , ঠিক তেমনি ইঁদুরের অত্যাচার দিন দিন বাড়তেই থাকে । শেষে কোনো উপায়ান্তর না দেখে হ্যামিলিন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ইঁদুরের উৎপাত থেকে বাঁচতে পৌরসভায় জরুরি মিটিংয়ের আয়োজন করেন । এখানে মেয়রের নেতৃত্বে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন যে , শহরকে ইঁদুরের অত্যাচার থেকে যে রক্ষা করতে পারবে তাকে মোটা অংকের পুরস্কার দেওয়া হবে।

সেই ঘোষণায় সাড়া দিয়ে শহরে হাজির হলো এক রহস্যময় বাঁশিওয়ালা । মহামান্য মেয়রের অনুমতি নিয়ে সে বাজাতে শুরু করলো বাঁশি । বড়ো অদ্ভুত সেই বাঁশির সুর । আর কি আশ্চর্য ! সেই সুর শুনে অসংখ্য গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল হাজার হাজার ইঁদুর । বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলতে শুরু করলো বাঁশুরিয়া । আর তার পিছনে পিছনে চললো শহরের সমস্ত ইঁদুর । বাঁশির সুরের মায়াজালে যেন মোহাবিষ্ট রাশি রাশি ইঁদুরের পাল । একসময় ইঁদুরগুলোকে নিয়ে ওয়েজার নদীতে নেমে গেলো সেই বাঁশিওয়ালা । কিছুক্ষণ পরে যখন সে জল থেকে উঠে এলো ততক্ষণে সমস্ত ইঁদুর মারা গেছে । এরপর মেয়রের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুরস্কার চাইতে গেলে মেয়র ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সকলেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন । পুরস্কারের কথা যেন মনেই পড়লো না তাঁদের । ব্যথিত হতাশ বাঁশিওয়ালা কানাকড়িও না পেয়ে ফিরে গেল একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মনে জেগে উঠলো প্রতিশোধস্পৃহা ।

এর কিছুদিন পর এক ধর্মীয় উৎসবের দিনে শহরের বড়োরা যখন গির্জায় জমায়েত হয় সমবেত প্রার্থনার জন্য , সেই সুযোগে বাঁশিওয়ালা এসে বাজাতে শুরু করে তার মোহন বাঁশি। সেই অদ্ভুত সুরের টানে ছুটে আসে শহরের প্রায় সব শিশু। তারা হাঁটতে থাকে সেই বাঁশিওয়ালার পিছু পিছু । তাদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শহরের বাইরে চলে যায় বাঁশিওয়ালা । একসময় শিশুদের নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় সে । এই মর্মান্তিক ঘটনার পর হাহাকার নেমে আসে শহরে । কেউ বলেন , শহরের বাইরে কোপেলবার্গ পাহাড়ের গুহায় অদৃশ্য হয়ে যায় বাঁশিওয়ালা। কেউ বলেন , ইঁদুরগুলোর মতোই হাল হয় শিশুদের । এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে অনেক ।

আরেকটা মতবাদ অনুসারে , বাঁশিওয়ালা যখন শিশুদের নিয়ে রওনা দেয় তখন কারোরই কিছু করার ছিল না। কারণ , সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাঁশির সুর শুনছিল। তারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সবাই , এমনকি স্বয়ং মেয়র পর্যন্ত । মায়াবী সুরের মোহজাল বিছিয়ে যখন বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো তখন বাধা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সবাই । কে আর বাধা দেবে তখন ? শিশুরা বাঁশিওয়ালাকে অনুসরণ করছিল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে । একসময় শহর ছাড়িয়ে বাঁশিওয়ালা একটা পাহাড়ের দিকে চলে যায় । এবার পাহাড়টা নাকি হঠাৎই দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় ‌।

তখন সেই আশ্চর্য পাহাড়ের সঙ্কীর্ণ গলি দিয়ে শিশুদের নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় বাঁশিওয়ালা । অনেক খুঁজেও আর কখনও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি । বলা হয়ে থাকে , ১২৮৪ সালের ২২ জুলাই নাকি ঘটনাটি ঘটে । দীর্ঘকাল অমীমাংসিত এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে ।

হ্যামিলিন শহরের পৌরসভায় রাখা পুরানো কাগজপত্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও এ ঘটনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি । হ্যামিলিন শহরে এ সংক্রান্ত একটি জাদুঘর রয়েছে । সেখানে এই রহস্যময় কাহিনীর বর্ণনা-সহ কয়েকটি বই আছে ‌। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী , সেই আশ্চর্য বাঁশিওয়ালার বয়স আনুমানিক ৩০ বছর , চেহারা অত্যন্ত সুদর্শন । তার বাঁশিটি ছিল রুপোর তৈরি । যদিও বহু নথি ধ্বংস হয়ে যায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে । তবুও যা তথ্য পাওয়া যায় তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে বিস্তর । কেউ কেউ মনে করেন , খুব অসৎ লোক সেই বাঁশিওয়ালা , যে শিশুপাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যাই হোক , বর্তমানে হ্যামিলিনে যে পৌরসভা রয়েছে তার নামের অর্থ হলো, ‘ ইঁদুর ধরা লোকের বাড়ি ‘ । এটা নির্মিত হয়েছে ১৬০২ সালে । এর দেওয়ালে বিশ্ববিশ্রুত কাহিনীর কয়েকটি ছবিও আঁকা রয়েছে ।

আরও পড়ুন- সোমবার এসএসসি ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মামলার শুনানি, নজর গোটা রাজ্যের

_

 

_

 

_

Related articles

ভোটে রেকর্ড ‘মদ’ বাজেয়াপ্ত বাংলায়, মোট সামগ্রী ৫১০ কোটি টাকার!

ভোটের আবহে পশ্চিমবঙ্গে মাদক ও মদ বাজেয়াপ্ত (Liquor seizure record) করে সর্বকালীন রেকর্ড গড়ল নির্বাচন কমিশন (Election Commission...

নির্বাচন মিটলেও জারি নজরদারি! ১০ মে পর্যন্ত খোলা রাজভবনের বিশেষ হেল্পলাইন

রাজ্যের সাধারণ ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করতে এবং নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ফের তৎপরতা দেখাল রাজভবন। বিধানসভা...

দ্বিতীয় দফায় নজরে ১৪২ আসন: বিধি মেনে প্রস্তুতি কমিশনের

রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় ৮টি নির্বাচনী জেলার মোট ১৪২টি আসনে আগামী ২৯ এপ্রিল, বুধবার ভোটগ্রহণ হবে। এই...

দক্ষিণ কলকাতায় মহামিছিল: হেঁটে-বাইকে শেষ দিনের প্রচারে ঝড় তুললেন তৃণমূল সুপ্রিমো, পা মেলান তেজস্বীও

ভোটের শেষদিনের প্রচারে শেষ মুহূর্তের ঝড় তুললেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে...