ইদ শান্তিতে কেটেছে। রামনবমী শান্তিতে কাটুক। বুধবার নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সব ধর্মের কাছে শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। রাজ্যে অশান্তি বাধানোর রাম-বাম চক্রান্তকে নিশানা করেন মমতা। বলেন, ভোট থেকে শুরু করে সব ব্যাপারেই বাম-রাম এক। যত এসব করবে, তত শূন্য থেকে মহাশূন্যে মিলিয়ে যাবে।

এদিন, মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই শান্তিপূর্ণভাবে রামনবমীর মিছিল। দয়া করে মানবিক হোন, দানবিক হবেন না। রাম নবমীর অস্ত্র মিছিল নিয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান জানান, “মিছিলের নাম করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অনেকে হিংসার পথ বেছে নেয়। এখনও সেই পরিকল্পনা জুমলা পার্টির। আমি জুমলা পার্টিকে বলব, সত্যিই যদি ধর্মকে ভালবাসেন, বাসন্তী পুজো করুন, নবরাত্রি করুন, অন্নপূর্ণা পুজো করুন। অন্নপূর্ণা পুজোয় আমিও পুজো দিই। যাঁরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিছিলের নামে দাঙ্গা করেন, ইতিহাসটা জেনে রাখুন। পাঞ্জাবিরাও কৃপাণ নেন। আপনিও ব্যবস্থা অনুযায়ী, পুলিশের নির্দেশ মেনে নিশ্চয়ই পারবেন। কিন্তু অন্য এলাকায় গিয়ে হামলা করা আপনার কাজ নয়।”

রাম-বামকে (Left-BJP) এক তিরে নিশানা করেন মমতা। বলেন, “দয়া করে গৈরিকীকরণ আর রক্তিমীকরণকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেবেন না। আপনারাও বড় বড় সাম্প্রদায়িক হয়ে গিয়েছেন। নির্বাচন থেকে সব ব্যাপারেই বাম-রাম (Left-BJP) এক, জগাই-মাধাই-গদাই। যত এসব করবেন, তত মহাশূন্য থেকে আরও শূন্যে বিলীন হয়ে যাবেন। আমার অনুরোধ সকলকে, হিন্দু হোন বা মুসলিম হোন, অথবা শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, শান্তি বজায় রাখুন। দাঙ্গা করে অশান্তির চেষ্টা করবেন না দয়াকরে। অশান্তি করে কেউ কোনও দিন কিছু করতে পারেনি, আর করবেও না। বাংলা আর যাই হোক না কেন, বাংলা সংস্কৃতির জন্ম দেয়, বাংলা সম্প্রীতির জন্ম দেয়। আমরা রামকৃষ্ণকে মানব, জুমলা পার্টিকে মানব না। মা সরস্বতীর বচন মানব, জুমলা পার্টিকে নয়। আমরা অন্নপূর্ণা পুজো, বাসন্তী পুজো, রামনবমী, চৈত্র সংক্রান্তি, চড়ক… আরও নানা কিছু হয়। অন্যের উৎসবকে ডিস্টার্ব করতে যাবেন না। আমি সবাইকে নিয়ে চলি, আপনারা কেন পারেন না?”

এর পরেই অক্সফোর্ডের গোলমালের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাকে কেন বিদেশে গিয়ে প্রশ্ন করবে যে, আমি হিন্দু কি না? কত আর ভেক চলবে। আমি সাধুবাদ জানাই তাদের, যারা পজেটিভভাবে মানুষের কথা বলে। কেন ফেক ভিডিও তৈরি করছেন। গুজরাত-রাজস্থানের ছবি নিয়ে বাংলার বলে দেখিয়েছিল।” উস্কানি থেকে দূরে থাকার আর্জি জানান মমতা।


একই সঙ্গে কেন্দ্রের মোদি সরকারকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, “দরিদ্র মানুষের সব কাজ বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার আছে কী জন্য? শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রবণতার নামে…একটা নতুন ধর্মের আমদানি করে, যা আমাদের তপোবনের নয়, আমাদের রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নয়, যা বেদ-বেদান্তের নয়, যা ঋক-সাম-যজু-অথর্বের নয়…শুধু দেশকে ভাগ করার জন্য, মানুষের মধ্যে বিভেদের জন্য? আমি চাই, বাসন্তী পুজো, অন্নপূর্ণা পুজো, রামনবমী সব শান্তিতে, ভাল ভাবে হোক। ইদও শান্তিতে পালিত হয়েছে। সামনের সবকিছুও ভাল ভাবে পালিত হোক। নতুন আসছে, শুভ নববর্ষ। আমাদের মা কালীবাড়ির স্কাইওয়াক, উন্নতি হয়েছে। ১৪ তারিক উদ্বোধন করব। ২৮ তারিখ জগন্নাথ ধামের উদ্বোধন হবে।”


তৃণমূল (TMC) সুপ্রিমো জানান, “দলের সাংসদরা ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। কারণ জুমলা দলের একটাই কাজ, দেশকে ভাগ করা। ওরা বিভাজনের নীতিতে বিশ্বাসী, আমরা না। আমরা সংবিধান মেনে চলি। আগে সংবিধানকে শ্রদ্ধা কোরো, তার পর অধিকার কাড়তে যেও। মনে রাখবেন, ধর্ম যার যার আপনার, উৎসব কিন্তু সবার। পরিষ্কার বলছি, আমি শ্রীকৃষ্ণের বাণীও শুনি, বিবেকানন্দ, নেতাজি, গান্ধীজি, অম্বেডকর, রামকৃষ্ণ, আবুল কালামও পড়ি। একটাই কথা, কর্ম যার, ধর্ম তার। ধর্ম তখনই সদিচ্ছা লাভ করে যখন কর্ম হয় মানবিক। কর্ম দানবিক হলে কোনও ধর্মকে শ্রদ্ধা করা যায় না। আমি সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করি।”

রামনবমীর পৌরণিক ব্যাখ্য দিয়ে মমতা বলেন, “এরা যে রামনবমীতে মিছিল করে, আমাদের অনেকেও রামনবমীতে মিছিল করেন, আপত্তি নেই আমাদের। আমরা শুধু চাই শান্তিপূর্ণ হোক। এখন যেটা চৈত্র মাসে হয়, সেটাই ছিল। কিন্তু রাবণকে ধ্বংস করতে রামচন্দ্র যখন অকাল বোধন করেন যখন, সেটাকেই আসল দুর্গাপুজো হিসেবে পালন করি আমরা। এটাও পালন করি, কিন্তু ওভাবে নয়। সবাই সবার মতো করে নবরাত্রি পালন করবে, পুজো করবে, এটাই ধর্ম। শরতে শিউলি, কাশফুল ভাসে। আমরা করিনি, রামচন্দ্র করেছিলেন। সেটা কি রামনবমী নয়? সেটা কি আপনাদের মনে পড়ে না। রামচন্দ্র ১০৭টা ফুল দিয়ে একটা বাকি ছিল বলে নিজের চোখ দিতে গিয়েছিলেন। ইতিহাসটা জানুন। ইতিহাসের এটাই শিক্ষা। কর্ম মানেই ধর্ম, ধর্ম মানে কর্ম। মানবিক হোন, দানবিক হবেন না দয়া করে।”

একতার বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যে ধর্মের যে, সবাই ভাল থাকুন। আমাদের মধ্যে যেন বিভেদ না হয়। ঐক্য এবং সম্প্রীতিই বাংলার সম্পদ। বাংলা শান্তির মাটি। বাংলা কখনও বিভাজন মানে না। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি সবাইকে ভুলে যাব? বেলুড়মঠেও দরগা আছে। তাঁরা তো ভেঙে সরাননি? তাঁরা যদি এক জায়গায় থাকতে পারেন, আমরা কেন পারি না? রামকৃষ্ণ-সারদামা-বিবেকানন্দের ছবি রাখি বেদীতে। কারণ মানবিক দেব-দেবতা হিসেবে তাঁদের পুজো করি আমরা।”

–
–
