Sunday, April 26, 2026

আগুনের অকাল প্রস্থান, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

আগুন ঝাঁপ দিলো জলে …

লিখেছিলেন সম্ভবত শঙ্খ ঘোষ , এক ক্ষনজন্মা শিল্পীর অকাল মৃত্যুর পর। বিদুষী সেই অভিনেত্রী সত্যিই ঝাঁপ দিয়েছিলেন , নাকি মুহূর্তের অসতর্কতায় জলে পড়ে গিয়ে তলিয়ে গিয়েছিলেন অতল গঙ্গায় , সে রহস্যের কিনারা আজও হয় নি । বাংলা মায়ের এই হারিয়ে যাওয়া অগ্নিকন্যাকে নিয়ে প্রবীন নাট্যপ্রেমীদের দীর্ঘশ্বাস কান পাতলেই আজও শোনা যায় । ঠিক কী হয়েছিল সেদিন ? কেন ঘটেছিল ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ? কেন অকালে ঝরে গেলেন কেয়া চক্রবর্তী ?

দিনটা ছিল ১২ মার্চ , ১৯৭৭ , বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসের মহা বিতর্কিত দিন । সাঁকরাইলে গঙ্গার ওপর শুটিং চলছিল একটি বাংলা সিনেমার । ছবির নাম ‘ জীবন যে রকম ‘ । ছবিতে কেয়ার চরিত্রটি ছিল এক অন্ধ মায়ের । দৃশ্যটি ছিল এইরকম : লঞ্চে করে মা ও ছেলে যেতে যেতে হঠাৎই জলে পড়ে যায় ছেলে । ছেলেকে বাঁচাতে মা’ও সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁপ দেন মাঝ গঙ্গায়।

এই দৃশ্যেরই শুটিং করতে গিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যান তুমুল প্রতিভাময়ী বছর পঁয়ত্রিশের কেয়া । তিন পয়সার পালা ও ভালোমানুষ নাটকে অসামান্য অভিনয়ের সুবাদে কেয়া যখন খ্যাতির শীর্ষে , ঠিক তখনই সহসা তাঁর জীবন রঙ্গমঞ্চ থেকে অকাল প্রস্থান নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে গেছে।

সেই সময় মাঝগঙ্গায় শুটিং করার অনুমতি ছিল ? ডামি ছাড়া অভিনেত্রী স্বয়ং কেন ঝাঁপ দিয়েছিলেন ভরা গঙ্গায় ? লাইফবোট কিংবা জাল শুটিং ইউনিটের সঙ্গে ছিল কি ? সাঁতার না জানা কেয়া এতোবড় ঝুঁকি নিলেন কেন ? তাঁকে কি জোর করা হয় , নাকি তিনি নিজেই চাপ দেন পরিচালককে ? এটা আত্মহত্যা নয় তো ? নাকি কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল কেয়াকে ? এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর আজ ৪৫ বছর কেটে গেছে । তবুও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে বাংলা রঙ্গমঞ্চের অন্যতম সেরা এই অভিনেত্রীর মৃত্যু নিয়ে ।

কেয়ার ছিল তুখোড় মেধা , স্থির প্রত্যয় , দৃপ্ত ব্যক্তিত্ব । স্কটিশচার্চ কলেজের এই প্রতিভাময়ী ছাত্রী ইংরেজিতে এম এ পাশ করে ওই কলেজেই অধ্যাপনার সুযোগ পান । অভিনয় করতে খুব ভালবাসতেন কেয়া । আন্তঃ কলেজ নাট্য প্রতিযোগিতায় ১৯৫৮ , ১৯৫৯ এবং ১৯৬০ সালে টানা তিন বছর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান ।

আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় যুব উৎসবে দিল্লি এবং মহীশূরে আমন্ত্রিত হন । এরপর যোগ দেন নান্দীকার থিয়েটার দলে। তাঁর প্রথম অভিনয় ১৯৬১ সালে চার অধ্যায় নাটকে । তিন পয়সার পালা নাটকে অসামান্য অভিনয়ের সুবাদে কেয়ার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে । এরপর উল্কার বেগে তাঁর উত্থান । ভালোমানুষ নাটকে একইসঙ্গে নারী ও পুরুষের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে চমকে দেন তিনি । আক্ষরিক অর্থেই বিদুষী কেয়া তাঁর নাটকের দলের ছেলেমেয়েদের শিখিয়ে গেছেন , ভালো মানুষ না হতে পারলে ভালো থিয়েটার করা অসম্ভব । ভালোমানুষ নাটকে কেয়ার গাওয়া অসাধারণ গান আজও মনে রেখেছেন বাংলার প্রবীণ নাট্যপ্রেমীরা, মেনে নিতে পারেন নি তাঁর হঠাৎ প্রস্থান ।

সাঁকরাইল থেকে পাঁচ মাইল দূরে হীরাপুরে ভেসে এসেছিল কেয়া চক্রবর্তীর কাদামাখা , কচুরিপানা জড়ানো নিথর দেহ । তাঁর মৃত্যুবর্ণনা দিতে গিয়ে কবিতা সিংহ লেখেন ,” কেয়ার দেহ পচতে আরম্ভ করেছে । অনেকক্ষণ জলে ছিল , এখন রোদে । আমি তার ঈষৎ নীলবর্ণ মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম । মুখের বাঁ পাশ সুন্দর । ডান পাশ ফুলে ঝুলে পড়েছে । সেখানে একটি গভীর দাগ । ”

২০ মার্চ যুগান্তর পত্রিকায় লেখা হয় , ” কেয়ার মৃতদেহে তিন চারটি ক্ষত দেখা যায় , তাঁর হাত দুটি ভাঙা । মুখে আঘাতের চিহ্ন ।” তাঁর হাত ভাঙলো কী করে ? গঙ্গার জলের তোড়ে ? স্টিমারের প্রপেলারের ঘায়ে ? না ধ্বস্তাধ্বস্তির চোটে ?  কেয়ার অকাল মৃত্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন উৎপল দত্ত । লেখেন , ” চলচ্চিত্রের কিছু ক্রিমিনালের গাফিলতিতে বাংলা নাটকের কত বড়ো ক্ষতি হয়ে গেল তাঁরা কি কোনোদিন বুঝবেন ? এ যেন নাট্যকর্মীদের বৃহত্তর আত্মহত্যার প্রতীক।”

আরও পড়ুন – বিজেপি রাজ্যেও ওয়াকফ বিরোধী আন্দোলনে কেন্দ্রীয় বাহিনী! ত্রিপুরায় আহত ৭ পুলিশকর্মী

_

 

_

Related articles

এলাকায় বাইক বাহিনী! পুলিশ-প্রশাসনকে পদক্ষেপের নির্দেশ কমিশনের, কটাক্ষ তৃণমূলের

বাইক থেকে 'জয় বাংলা' স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এই ভিডিও পোস্ট করে পুলিশ-প্রশাসনকে কড়া ব্যবস্থা নিতে বলল নির্বাচন কমিশন...

রবিবার সকালে আকাশের মুখ ভার, দুপুরের পরেই ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস!

প্রবল গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি মিলবে কি, সকালে আকাশের চেহারা দেখে ঠিক এমন প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে দক্ষিণবঙ্গবাসীর মনে।...

পদযাত্রা থেকে জনসভা, আজ নিজের কেন্দ্রে ভোট প্রচারে মমতা 

বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফায় হাইভোল্টেজ ভবানীপুর (Bhawanipur) কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বাংলার...

সোনা পাপ্পু মামলায় রবিবার সকালে শহরে ফের ইডি হানা

বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফা শুরুর আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতি সক্রিয়তা। একদিকে যখন মহানগরীতে জোরকদমে চলছে প্রচার, ঠিক...