দেশের বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন দাবি করেছিলেন তিনি একটি সরল করের প্রক্রিয়া উপহার দিলেন। কিন্তু সেই সরল প্রক্রিয়া কীভাবে দেশের সাধারণ, দরিদ্র মানুষের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ালো, লোকসভার বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করে দিলে তৃণমূল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট করে দিলেন কীভাবে জন্ম নেওয়া শিশুর দুধ থেকে মৃত ব্যক্তির পরিবারকে একটি ধূপ জ্বালাতে কীভাবে জিএসটি-র ফাঁসে জড়িয়ে পড়তে হয়। ২০২৬ কেন্দ্রীয় বাজেট এমন একটি বাজেট যেখান থেকে ধনী কর্পোরেটরা সহজে মুক্তি পেয়ে যাবেন। কিন্তু সৎ করদাতারা চক্রব্যূহে আটকে পড়বেন, লোকসভায় স্পষ্ট করে দিলেন অভিষেক।

কেন্দ্রীয় বাজেটে যেভাবে দেশের জনগণের উপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে তাকে ট্রিপল ট্যাক্স বলে দাবি করেন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাধারণ সৎ করদাতার উপর তিন ধরনের পরোক্ষ কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম কর অবশ্যই আয়কর (income tax)। বেতনভোগীরা বেতন পাওয়ার আগেই আয়কর দেন। তা থেকে কোনও মুক্তি, আলোচনা বা মুদ্রাস্ফীতির (inflation) বাজারেও কোনও সমঝোতার অবকাশ থাকে না।

কেন্দ্রের সরকারের গর্বের জিএসটি-র বাস্তবতা নিয়ে এদিন লোকসভায় স্পষ্ট ছবি তুলে ধরেন অভিষেক তিনি দাবি করেন, জিএসটি এমন একটি ট্যাক্স যা শিশুর জন্মের পর তার দুধ বা ডায়াপার থেকে স্নানের সাবান, কাজের সফটওয়্যারের জন্য দিতে হয়। এমনকি সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার তাঁর অন্তেষ্টিতে জ্বালানোর জন্য ধূপেও জিএসটি (GST) দেন। ভারতের যেখানে সাধারণ পরিষেবা পৌঁছায় না, সেখানেও পৌঁছে যায় জিএসটি। সরকার দাবি করে রেকর্ড জিএক্সটি সংগ্রহের অথচ তাদের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

এই দুই করের পাশাপাশি ভারতীয়দের উপর যে বোঝা অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন কমাতে পারেননি, তাকেও পরোক্ষ কর বলেই দাবি করেন অভিষেক। তিনি বলেন, তিন নম্বর কর মূল্যবৃদ্ধি (price rise)। এই কর কোন অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়ে মানুষের জীবনে এবং ধীরে ধীরে ক্ষয় করে সাধারণ মানুষের ওয়ালেট। বেতনভোগীরা সময়মতো বেতন পান। কিন্তু তা সারা মাস আর চলে না। এই করের কারণে মধ্যবিত্ত মানুষ প্রতিমাসে অতিরিক্ত কিছু খরচ না করলেও তাঁর খরচ হয়ে যায় অতিরিক্ত। এর ফলে সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের ভ্রমণ, বিপদের সময়ের স্বাস্থ্য খাতে জমানো বা বার্ধক্যের জন্য জমানো টাকা ধীরে ধীরে নিয়ে চলে যায়।

দেশের বাজেট পেশের পরে ঢাক বাজানো অর্থমন্ত্রীকে চোখে আঙুল দিয়ে অভিষেক দেখিয়ে দেন, কীভাবে দেশের কৃষিনীতি ফেল করেছে। তিনি তুলে ধরেন, প্রতিদিন দেশে প্রায় ৩০ জন কৃষক মারা যান। তাঁরা নিজেদের ব্যর্থতার জন্য মারা যান না। তাঁরা দেশের নীতির ব্যর্থতার শিকার হন। দেশের ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনে ৭০০ কৃষকের প্রাণ গিয়েছে। তারপরেও আন্দোলন মঞ্চ থেকে লোকসভা পর্যন্ত এমএসপি-র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যকর করা হয়নি। সেখানেই মার্কিন কৃষি দফতরের সচিবের রিপোর্ট সংসদে তুলে ধরেন অভিষেক। স্পষ্ট করে দেন কিভাবে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে লাভবান হওয়ার দাবি জানাচ্ছেন মার্কিন সচিব। যার ফলে ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে ভারতের কৃষকরা। কারণ তাঁদের এমএসপি-র রক্ষাকবচ নেই। অথচ তা নিয়ে কোনও বার্তা দিতে পারছে না কেন্দ্রের মোদি সরকার।

যে পড়ুয়া ও কর্মপ্রার্থীদের জন্য প্রকল্পের ঢাক খোদ নরেন্দ্র মোদি বিভিন্ন রাজ্যে, এমনকি সময়ে সময়ে লাইভে চলে এসে জানিয়ে যান, তার স্বরূপ এদিন সংসদে খুলে দেন অভিষেক। তিনি তথ্য পেশ করেন, পিএম ইন্টার্নশিপ কোর্স। ১০হাজার ৫০০ কোটি ধার্য। ৫ শতাংশেরও কম ব্যবহৃত। পিএম ইয়ং অ্যাচিভার্স স্কলারশিপের ৩১ শতাংশ অব্যবহৃত হয়ে ফেরৎ চলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন : রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় আটকে পাওনা: বাজেটে বাংলার বঞ্চনা নিয়ে কেন্দ্রকে তুলোধনা অভিষেকের

যে বিশ্বগুরু ভারতে শিল্পোদ্যোগ নিয়ে বড়াই করেন, তাঁরই অর্থমন্ত্রী যে আদতে দেশের যুব সমাজের স্বার্থে বাজেট পেশ করতে পারেন না, তা লোকসভায় ফাঁস করে দেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাজেটের ব্যাখ্যায় তিনি তুলে ধরেন, বিদেশী বৃহৎ শিল্পের জন্য ট্যাক্স হলিডে (tax holiday)। ভারতীয় এমএসএমই (MSME), যা ভারতে কর্মসংস্থানের মেরুদণ্ড, তাঁদের খালি হাতে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জন্য যে কর ছাড়ের কথা বলা হয় তা কাগজে কলমেই থাকে। বাস্তবে কাজের ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। কর্পোরেট ইন্ডিয়াকে রেড কার্পেট দেওয়া হয়। সম্পত্তির সহজ অধিকার ও ইকিউটিতে ছাড় তাঁদের জন্য। সাধারণ দেশীয় শিল্পকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়, কীভাবে দেশের নীতির সমর্থনে দেশে বেড়ে উঠছে বিদেশী শিল্প।

–

–

