বিধানসভা নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে তত বিজেপির পরিযায়ী নেতাদের বাংলায় যাতায়াত বেড়ে চলবে, এটাই যেন দস্তুর। রাজ্যের নেতারা প্রার্থী বাছতে ব্যর্থ। কেন্দ্রের নেতারা এসে রাজ্যে কর্মীদের মনোবল বাড়ানোর জন্য এবার তালিকা করে নিয়ে আসছেন দিল্লি থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) তেমনই একটি পুরোনো অভিযোগের তালিকা ‘চার্জশিট’ (chargesheet) নাম দিয়ে শনিবার পেশ করেন কলকাতার একটি হোটেল থেকে। বিজেপির চার্জশিটের প্রত্যেকটি যুক্তি ধরে পাল্টা চার্জশিট পেশ শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের। স্পষ্ট জবাব চাওয়ার হল অমিত শাহর থেকে।

অনুপ্রবেশ: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলা-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা দিতে না পেরে বাংলায় অনুপ্রবেশ নিয়ে দাবি করেন, অনুপ্রবেশের (infiltration) কারণে বাংলার জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে। তাই এবারের নির্বাচন বাংলার জনবিন্যাস বদল রুখে দেওয়ার নির্বাচন। বাংলার সঙ্গে গোটা ভারতের জনবিন্যাস বদল ঠেকানোর নির্বাচন। যে সীমান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অমিত শাহ, সেই সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলে তৃণমূল। ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) প্রশ্ন তোলেন, সীমান্তকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রেখে দিয়েছেন। বলছেন জনবিন্যাস (demography) বদলে গিয়েছে। কী করলে জনবিন্যাস ঠিক হবে? আরেকটা গুজরাট করলে জনবিন্যাস ঠিক হবে?

সেই সঙ্গে বাস্তবেই যে সীমান্ত সুরক্ষায় ব্যর্থ অমিত শাহ, তা স্পষ্ট করে ব্রাত্যর দাবি, আপনি বাংলায় সুরক্ষা ভরসা দেওয়ার কথা বলছেন। আমরা ভয়ে কাঁপছি কবে আবার লালকেল্লার সামনে গাড়ি ফাটে। কবে আবার সংসদে বিস্ফোরণ হয়। পহেলগামে হামলায় কারা কারা ধরা পড়ল তালিকা কোথায়? তাদের তালিকা ভারতবাসী দেখতে পাচ্ছে না কেন? সেই পহেলগাম হামলায় নিরাপত্তা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলেন সাংসদ মহুয়া মৈত্র (Mahua Moitra)। তাঁর প্রশ্ন, পহেলগামে আপনার আমন্ত্রণে পর্যটকরা গিয়েছিলেন। ২৬ জন গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঠিক তার দুই সপ্তাহ আগে ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ কাশ্মীরের খাইবার হোটেলে নিজের বিবাহ বার্ষিকী পালন করেছেন। তার জন্য ১০০ নিরাপত্তা কর্মী প্রতি অতিথির জন্য রাখা হয়েছিল সাধারণ মানুষের করের টাকায়। দুই সপ্তাহ পরে যখন পর্যটকরা গেলেন তখন তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারলেন না তিনি। অন্যদিকে লালকেল্লার কাছে জঙ্গি হামলা নিয়েও অমিত শাহর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) পুলিশের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন সাংসদ কীর্তি আজাদ। তিনি দাবি করেন, লালকেল্লার বাইরে যখন বিস্ফোরণ হল তার মাত্র ৪ কিমি দূরে অমিত শাহর বাসভবন।

উন্নয়ন: বাংলায় তৃণমূলের সময়ে অনুন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে বাংলার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে তোপ দাগেন অমিত শাহ। তিনি দাবি করেন, এই নির্বাচন ভয়ের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়ে ভরসার সঙ্গে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। সেখানেই বিজেপি রাজ্যের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে তৃণমূলের তরফে বিজেপির বঞ্চনা নিয়ে সরব রাজ্যের শাসকদল। ব্রাত্য বসু দাবি করেন, প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আমাদের আটকে রেখেছেন। জলজীবন মিশনের বকেয়া টাকা, গ্রামীণ আবাসনের টাকা আটকে দেওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ পাচ্ছে। বাংলার বেলায় একটাই কথা অনুপ্রবেশকারী।

যেভাবে বাংলার মানুষকে বঞ্চিত করছে কেন্দ্রের সরকার, তার প্যাটার্ন নিয়ে মহুয়া মৈত্র দাবি করেন, কোনও ভাঁড় সিংহাসনে বসলে তিনি রাজা হন না। রাজ্যটাই সার্কাস হয়ে যায়। আর তাদের দ্বারা বাংলার মানুষের বঞ্চনা নির্দিষ্ট পথে। প্রথমে তাঁদের অপমান করো। তারপর তাঁদের বঞ্চিত করো। এরপর তাঁদের দোষী বলে দাগিয়ে দাও। শেষে হয়রান করে। মহুয়া তথ্য পেশ করে দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি সম্পর্কে জ্ঞান এত যে তার তাঁর নিজের পাসপোর্ট সাইজের ছবির পিছনে লিখে দেওয়া যায়। তারপরেও কিছুটা জায়গা থেকে যাবে যেখানে কোনও স্লোগান লিখে ফেলা যাবে। মোদি সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছিল তখন জাতীয় ঋণ ছিল ৫৬ লক্ষ কোটি। আজ সেই ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ লক্ষ কোটি। চার গুণ বেড়েছে। ভারতে প্রতিটি শিশু এখন মাথার উপর ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

নারী নিরাপত্তা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বাংলায় নির্বাচনের আগে নিজের চার্জশিটে পেশ করেন বাংলাকে দেশের অন্যতম নারী বিপদসংকুল রাজ্য হিসাবে। মহিলারা এখানে কোথাও নিরাপদ নয় বলেও তিনি দাবি করেন। আরজিকরের ঘটনায় যিনি আইনজীবী ছিলেন তাঁকে পুরস্কার হিসাবে নির্বাচনের টিকিট দেওয়ারও অভিযোগ তোলেন তিনি। সেখানেই তৃণমূলের তরফে ব্রাত্য বসু প্রশ্ন তোলেন, তবে অমিত শাহ নিজে ব্রিজভূষণকে পাশে নিয়ে কেন ঘুরছেন? ব্রিজভূষণ নিয়ে একটাও কথা বললেন না কেন? উন্নাও, হাথরস নিয়ে চুপ কেন? মনিপুর নিয়ে একটাও কথা বললেন না কেন?

বিজেপির মহিলা নীতি কতটা ঘৃণ্য এদিন অমিত শাহর পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে দেন মহুয়া মৈত্র। তিনি দাবি করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বত্র পাওয়া যায় যেখানে গুজরাটে তারা মহিলাদের উপর নজরদারির নির্দেশ দিচ্ছে। অবশ্যই তারা মহিলারা কোথায় যাচ্ছে, কখন যাচ্ছে তা নিয়ে খুব আগ্রহী। এনসিআরবি-র ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে মহিলা অপরাধে প্রথম স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, দ্বিতীয় মহারাষ্ট্র, তৃতীয় রাজস্থান। ধর্ষণের ঘটনার পরিসংখ্যান দিলে রাজস্থান প্রথম, দ্বিতীয় উত্তরপ্রদেশ, তৃতীয় মধ্যপ্রদেশ। পণের জন্য বধূহত্যায় প্রথম উত্তরপ্রদেশ প্রথম, বিহার দ্বিতীয়, মধ্যপ্রদেশ তৃতীয়। এটাই বিজেপির নারীর সম্মান। ব্রাত্য বসু এই তিন বিজেপি রাজ্যের পরিসংখ্যান তুলে দাবি করেন, আমরা তিনটি ভাই, মিলে-জুলে খাই।

এসআইআর (SIR): বাংলায় নির্বাচন পরিস্থিতিতে বিজেপি ও অমিত শাহর বক্তব্যে যে এসআইআর প্রসঙ্গে উঠবেই, তা বলা বাহুল্য। অমিত শাহ দাবি করেন, দেশের অন্য কোনও রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য বিচার বিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করতে হয়নি। শুধুমাত্র বাংলাতেই হয়েছে। কারণ এসআইআরে বাধা দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যে আশ্রয় দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখতে চায়। আদতে এসআইআর করে যে বিজেপি দেশের একটি সম্প্রদায়কে হেনস্থা করার জন্য, তা তুলে ধরে মহুয়া মৈত্র তুলে ধরেন, এসআইআরে আপনি বনগাঁ, বসিরহাট, রানাঘাটে যান। সেখানে ওপার বাংলা থেকে যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানকার ভোটার ছিলেন তাঁদের কত নাম বাদ গিয়েছে। বিহারেও এসআইআর (SIR) করেছিল অনুপ্রবেশকারী (infiltrator) তাড়ানোর অজুহাতে। সেখানে বাদ পড়েছে বিহারী মহিলাদের নাম। তাহলে এটাই বিজেপির অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞা।

আরও পড়ুন : ধসপ্রবণ রানিগঞ্জে ৭০০ কোটির ফ্ল্যাট: শিল্পে কেন্দ্র-রাজ্য তুলনার খতিয়ান মমতার

মুখ্যমন্ত্রী ভিকটিম-কার্ড: এসআইআর নিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে বাংলার মানুষের দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছেন, তাতে বাংলার উপর প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপের পথে হেঁটেছে নির্বাচন কমিশন। তারই সাফাই গেয়ে বাংলায় এসে অমিত শাহ দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বত্র ভিকটিম কার্ড খেলেন। কখনও পা ভেঙে ফেলেন। কখনও মাথায় পট্টি পরে নেন। আবার কখনও নির্বাচন কমিশনের সামনে বেচারা সেজে গালিগালাজ করেন। বিজেপির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এই কদর্য আক্রমণকেও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েনি তৃণমূল কংগ্রেস। ব্রাত্য বসু পাল্টা দাবি করেন, কথাটা হাস্যকর। তিনি ব্যান্ডেজ পরেছেন। কিন্তু দিনের মধ্যে পাঁচবার ব্য়ান্ডেজ বদল করেন না প্রধানমন্ত্রীর পোশাক বদলের মতো। ভিকটিম কার্ড (victim card) কে খেলে, কখন খেলে, কোথায় খেলে সেটা সবাই জানি। সারা পৃথিবীতে ভিকটিম কার্ড খেলতে গিয়ে কে হাসির খোরাক সেটাও সবাই জানেন।
সেই সঙ্গে এক্ষেত্রেও যে সেই বিজেপির নারীর প্রতি মানসিকতা ফুটে ওঠে, তা স্পষ্ট করে ব্রাত্য বসু দাবি করেন, বিজেপি একটি পিতৃতান্ত্রিক মনুবাদী দল। মহিলাদের খারাপ কথা বলতে তাদের নজির রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে, বিহারে কী করা হয় মহিলাদের সঙ্গে তা সবাই জানেন। মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে সম্মান করবেন আপনারা। যদিও আপনারা নিজেদের অধীনের যে মুখ্যমন্ত্রীরা রয়েছেন, তাঁদেরও সম্মান করেন না।
