
প্রিয়তম ,
আমি নিশ্চিত যে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে , আমরা এই ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে আর যেতে পারবো না। এবং আমি জানি আমি এবার আর সুস্থ হবো না। আমি কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি এবং আমি মনোযোগ দিতে পারছি না। তাই , আমি যা করছি , সেটাই করার মতো সেরা কাজ বলে মনে হচ্ছে।

তুমি আমাকে যতটা সম্ভব সুখ দিয়েছো। সব দিক থেকেই তুমি আমার জন্য অসাধারণ ছিলে। এই ভয়াবহ রোগ আসার আগে পর্যন্ত আমরা দুজনে কতটা সুখী ছিলাম তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। আমি এর বিরুদ্ধে আর লড়াই করতে পারছি না। আমি জানি আমি তোমার জীবন নষ্ট করে দিচ্ছি। আমাকে ছাড়া তুমি কাজ করতে পারবে। এবং আমি জানি তুমি তা পারবেই।

দেখো, আমি এটা ঠিকমতো লিখতেও পারছি না। আমি পড়তে পারছি না। আমি যা বলতে চাই তা হলো — আমার জীবনের সমস্ত সুখের জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী। তুমি আমার প্রতি দারুণ ধৈর্য্যশীল ছিলে এবং অবিশ্বাস্য রকমের ভালো ছিলে। আমি বলতে চাই সবাই এটা জানে। যদি কেউ আমাকে বাঁচাতে পারতো, তবে তুমিই তা পারতে। তোমার ভালোত্ব নিশ্চিত হওয়া ছাড়া আর সবকিছু আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। আমি তোমার জীবন আর নষ্ট করতে পারবো না। আমার মনে হয় না যে আমরা ছাড়া অন্য কোনো দম্পতি এত সুখী হতে পারতো।

এই মর্মস্পর্শী ‘ সুইসাইড নোট ‘ লিখে ওজ নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন ভার্জিনিয়া উলফ। তাঁর স্বামী লিওনার্ড উলফকে এই চিঠিটি লেখেন তিনি। এটিই তাঁর শেষ লেখা। লেখিকা ভার্জিনিয়া বাইপোলার ডিসর্ডার রোগে আক্রান্ত ছিলেন। শোনা যায়, লেখিকা তাঁর ওভারকোটের পকেটে যতগুলো সম্ভব ভারী পাথরের টুকরো ভরে নেমে গিয়েছিলেন ওজ নদীর গভীরে । তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫৯ । তাঁর যাবতীয় বিষন্নতা ডুবে গেলো আকাশ আর জলকে সাক্ষী রেখে। ভার্জিনিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে টি এস এলিয়ট লিখলেন, ‘ পৃথিবীটা শেষ হয়ে গেল ‘ ।

ভার্জিনিয়া উলফ লিখে গেছেন, ‘ অনেক বেশি জেনে গেলে, পৃথিবীর আসল রূপ দেখে ফেললে এক ধরনের বিষন্নতার জন্ম হয়। এটা বুঝে যাওয়ার বিষন্নতা যে, জীবন কোনো মহৎ অভিযান নয়, বরং ছোট ছোট তুচ্ছ মুহূর্তের সমষ্টি; ভালোবাসা কোনো রূপকথা নয়, বরং এক ভঙ্গুর ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি; সুখ কোনো স্থায়ী অবস্থা নয়, বরং এমন কিছুর এক দুর্লভ, ক্ষণস্থায়ী ঝলক, যা আমরা কখনোই ধরে রাখতে পারি না। আর এই উপলব্ধির মধ্যেই রয়েছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা; পৃথিবী থেকে, অন্য মানুষ থেকে , এমনকি নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক অনুভূতি। ‘

তাঁর একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ A Room of One’s Own ‘( নিজের একটি ঘর )। সেখানে তিনি লিখেছেন,’ একজন মহিলাকে যদি কল্পকাহিনী লিখতে হয়, তবে তার টাকা এবং নিজের একটি ঘর থাকতে হবে। ‘তাঁর লেখা বই ‘ মিসেস ডালোয়ে ‘ , ‘ বিটুইন দ্য অ্যাক্টস ‘ , ‘ দ্য ওয়েভস ‘ ,
‘ টু দ্য লাইটহাউস ‘ ,’ অরল্যান্ডো ‘ এবং ‘ আ রুম অফ ওয়ানস ওন ‘ সমধিক প্রসিদ্ধ।

সাহিত্যিক ভার্জিনিয়া উলফ ( ১৮৮২ — ১৯৪১ ) ছিলেন একজন বৃটিশ লেখিকা। স্পষ্টবাদী ও বিদ্রোহী ভার্জিনিয়া বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার ও আন্দোলন নিয়ে সচেতন ছিলেন। যুদ্ধবিরোধী হিসেবেও তাঁর অবস্থান ছিল অকপট। ১৯৩০ এর দশকে সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল শীর্ষে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাঁর জনপ্রিয়তা কিছুটা যেন কমতে থাকে নানা কারণে। এই সময়েই তাঁর লন্ডনের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এক ধরনের মানসিক বৈকল্য দেখা যেতে থাকে তাঁর মধ্যে। তাঁর ছোটবেলার কিছু ভয়াল অভিজ্ঞতাও তাঁকে শান্তি দেয় নি কোনোদিন। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকে তাঁর দুই সৎ ভাইয়ের যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাতৃহারা হন। বাবা মারা যান দুরারোগ্য ক্যান্সারে । মারা যান তাঁর ভাইও। তাঁর ভীষণ যন্ত্রণাময় শৈশব ও কৈশোরের এই সময়কে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘ মৃত্যুর এক দশক ‘ হিসেবে। পরবর্তী পর্বে যখন তিনি লেখিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তখনও নানা পীড়া তাঁকে যথেষ্ট ভোগাতো, এমনকি তাঁর লেখায় ভীষণ ব্যাঘাত ঘটাতো। তাই হয়তো চরম অবসাদ থেকে চিরমুক্তির বাসনায় তিনি শেষপর্যন্ত বেছে নেন আত্মহননের পথ।

ধারণা করা হয়, তাঁর মৃত্যুর তিনদিন আগে লেখা তাঁর সুইসাইড নোট। ওজ নদীর তীরে নরম মাটিতে দেখা যায় তাঁর পায়ের চিহ্ন, খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর হাতের ছড়িটিও। কিন্তু নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া তাঁর দেহটি খুঁজে পাওয়া যায় বেশ কয়েকদিন পর ১৯৪১ সালের ১৮ এপ্রিল, শান্ত, সমাহিত, মৃত।
আরও পড়ুন – বারবার হার্ট অ্যাটাক, হাসপাতালে ভর্তি পরিচালক অগ্নিদেব
_

