শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ২ বছর ৪ মাস জেলে কাটিয়ে ২০২৪-এর নভেম্বরে মুক্তি পান প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের (Partha Chatterjee) বান্ধবী অর্পিতা মুখোপাধ্যায় (Arpita Mukharjee)। কিন্তু তার পর থেকেই অন্তরালে, খবরের শিরোনাম থেকে অনেক দূরে। এর মধ্যে রাজ্যে পালাবদল। হঠাৎ জুন মাসের এক প্রখর দুপুর স্যোশাল মিডিয়ায় হাজির অর্পিতা। পোস্টে (Post) পৃথিবীটা আমূল বদলে যাওয়ার কথা। মাকে হারানোর বেদনা। কিন্তু কোথাও ‘বন্ধু’ পার্থর সম্পর্কে একটি শব্দও নেই!

২০২২ সালের ২২ জুলাই- বাংলার রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য। অতটাকা একজনের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া, যন্ত্র এনে গোনা, লাইভ টেলিকাস্ট- সেই প্রথম বোধহয় দেখেছিল রাজ্যবাসী। শিক্ষক নিয়োগ মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট প্রথমে তল্লাশি চালায় অর্পিতার টালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে। নগদ টাকার পাহাড় মেলে। কয়েকদিন পরে অর্পিতার বেলঘড়িয়ার ফ্ল্যাট থেকেও মিলেছিল কোটি কোটি নগদ টাকা। সব মিলিয়ে প্রায় ৫২ কোটি টাকা এবং ৩ কোটি টাকার গয়না বাজেয়াপ্ত করে ইডি (ED)।

যদিও বারবার অর্পিতা (Arpita Mukharjee) দাবি করেন, ওই টাকা, গয়নাগাটি তাঁর নয়। বলেন, “আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই।“ তবে, সেই থেকেই তিনি জেলবন্দি। প্রায় ২ বছর ৪ মাস জেলে কাটিয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মায়ের মৃত্যুতে প্রথমে ৫ দিনের প্যারোলে মুক্তি পান। এরপর ইডি ও সিবিআই উভয় মামলাতেই আলিপুর আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। আনুষ্ঠানিকভাবে জেল থেকে মুক্ত হয়ে বেলঘরিয়ার বাড়িতেই ফিরে যান অর্পিতা।

তবে, সেই থেকেই অন্তরালে অর্পিতা। যদিও এবারের নির্বাচনে তৎকালীন তৃণমূল মন্ত্রীর বান্ধবীর বাড়ি থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধারের প্রসঙ্গ ওঠে। কিন্তু অর্পিতাকে প্রকাশ্যে দেখা তো দূর, স্যোশাল মিডিয়াতেও (Social Media) দেখা যায়নি। বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ক্ষমতা বদল। বিরোধী দলে বসেও শান্তি নেই তৃণমূলের (TMC)। ফাটল চওড়া হয়েই চলেছে। এই পরিস্থিতি হঠাৎ নিজের পেজ বুক পেজে পোস্ট করলেন অর্পিতা।
আরও খবর: একাধিক অভিযোগ! এবার জালে প্রাক্তন মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার

সেই পোস্টে কাউকে নিশানা নয়, বরং মাতৃ বিয়োগের শোক রয়েছে। রয়েছে জীবন তাঁকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তার উপলব্ধিও। কিন্তু কোথাও নেই বন্ধু পার্থর কথা। অথচ জেল (Jail) থেকে বেরিয়ে যখন পার্থ তাঁকে বান্ধবী বলে স্বীকার করেন, তখন সংবাদমাধ্যমে অর্পিতা জানিয়েছিলেন, “উনি তো আমার বন্ধুই। যদি আমাকে উনি বান্ধবী ভাবেন, আমি বন্ধু বলে মানবই। বান্ধবীতে তো অসুবিধার কিছু নেই। এটা পরকীয়া নয়।“ যদিও জেলে থাকাকালীন বরাবর পার্থ দাবি করেন, অর্পিতাকে তিনি চিনতেন না। আবার অর্পিতা ঘনিষ্ঠ বৃত্তে পার্থকে কখনও কাকা, কখনও মামা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে, জেলমুক্তির পরে দু’জনেই ‘বন্ধুত্বে’ সিলমোহর দেন।

তবে, প্রায় দুবছর পরে স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্টে বন্ধুর কোনও উল্লেখ নেই। সেখানে তাঁর পাশে থাকা মানুষদের ধন্যবাদ জানিয়ে অর্পিতা লেখেন,
“জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন সবকিছু থমকে যায় এবং পরিচিত পৃথিবীটা আমূল বদলে যায়। মাকে হারানোর বেদনা এক অপূরণীয় ক্ষতি—এমন এক নীরব শূন্যতা যা কোনও শব্দ দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। গত কয়েক মাসে তাঁর স্মৃতিই আমাকে ধরে রেখেছে; তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে নীরব অথচ দৃঢ় মনোবল বজায় রাখতে হয়।
যারা নীরবে আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, প্রার্থনায় আমাকে স্মরণ করেছেন কিংবা সংবাদ শিরোনামের বাইরের মানুষটিকে—অর্থাৎ প্রকৃত আমাকে—মূল্যায়ন করেছেন, তাঁদের সবাইকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ। আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে আপনাদের সহানুভূতি এক অবিচল আলোর মতো পাশে ছিল।“

জীবনবোধের কথায় অর্পিতা লেখেন,
“জীবন আমাদের নানাভাবে পরীক্ষা নেয়, কিন্তু একই সঙ্গে তা আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদও দেয়। সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং ধৈর্য ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রেখে ধাপে ধাপে জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলা। এই মুহূর্তে আমার সমস্ত মনোযোগ রয়েছে আমার পরিবার, নিজের মানসিক আরোগ্য এবং মায়ের রেখে যাওয়া দায়িত্বগুলি পালনের উপর।
ডিজিটাল জগতে আমি যখন ধীরে ধীরে আবার ফিরছি, তখন এখানকার কার্যক্রম হবে আমার জীবনের এই নতুন অধ্যায়েরই প্রতিফলন—যেখানে প্রাধান্য পাবে ব্যক্তিগত বিকাশ, শান্তি চিন্তা এবং জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার এক যাত্রা হিসেব। আমি এখন প্রতিটি দিনকে গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছি। আমার মনে জীবনের শিক্ষাগুলির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং আগামী দিনগুলির প্রতি পূর্ণ আস্থা।
সবাই ভালো থাকবেন এবং আমাকে আপনাদের শুভকামনায় রাখবেন।“

–
–
–
