Saturday, March 14, 2026

কবিতার বোধিবৃক্ষ, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

‘ কোনো যুগে কোনো আততায়ী শত্রু ছিল ব’লে
আজো কাঁটায় পরিবেষ্টিত হ’য়ে গোলাপ যেমন থাকে,
তেমনি রয়েছো তুমি ; ‘
লিখেছেন বিনয় মজুমদার।
‘ ফিরে এসো চাকা ‘, অঘ্রানের অনুভূতিমালা ‘, শিমুলপুরে লেখা কবিতা ‘, ‘নক্ষত্রের আলোয় ‘, ‘ ঈশ্বরীর ‘, ‘ অধিকন্তু ‘, ‘ বাল্মীকির কবিতা ‘, এসবই বিনয় কবির কাব‍্যগ্রন্থগুলির নাম।

কি আশ্চর্য সব কথা লিখে গেছেন কবি তাঁর কবিতাগুলির ছত্রে ছত্রে!

‘ শত্রু না মিত্র না শত্রু
বোঝবার চেষ্টা করে যাবে শতাব্দীটি। ‘
লিখেছেন,
‘এর নাম দেবতার মগজ ধোলাই
যত নির্বাচন হয় সর্বত্র পৃথিবীময়
মগজ ধোলাই হয় ততবারই, ভাই। ‘
আরও পড়তে হয়,
‘ এখন বকুল ফুল হয়ে গেছে জবা।
দেখে এ অদ্ভুত রঙ্গ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ
আমাকেই একযোগে দিয়েছে বাহবা। ‘

কবিতার জগতে এই কবির স্বকীয়তা তাঁর প্রচলিত রীতি ও প্রথা ভাঙার নিরন্তর অনুশীলনের কারণে। বিজ্ঞান,
বিশেষ করে গণিতের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ও কবিতায় সেসবের প্রতিফলন তাঁকে বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র ক’রে রেখেছে।

‘ অরুণ, আমার চোখদুটো দেখেছো? কেমন? এক চোখে আমি তোমার ভেতরটা দেখছি , অন‍্য চোখে বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ড।
একে ট‍্যারা বলে। ‘

অনেকেই বলেন বিনয় মজুমদার ছিলেন কবিদের কবি। পাঠকদের চেয়েও তাঁর সমকালের কবিরা বেশি আগ্রহী থাকতেন বিনয় কবির নতুন লেখার জন‍্য।
বিনয় মজুমদারের নিজের গোটা জীবনটাই উঠে এসেছে তাঁর কবিতাগুলির বিষয়বস্তু হয়ে। একটা গভীর বেদনাবোধ যেন সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াত কবিকে। সেই অব‍্যক্ত বেদনাই যেন মধুর সঙ্গীত হ’য়ে অপরূপ আলো ছড়িয়ে গেছে তাঁর অতি প্রসিদ্ধ ও বিরল কাব‍্যপংক্তিগুলিতে।

‘ ফিরে এসো ফিরে এসো চাকা,
রথ হ’য়ে জয় হ’য়ে,
চিরন্তন কাব‍্য হ’য়ে এসো।
আমরা বিশুদ্ধ দেশে
গান হবো, প্রেম হবো,
অবয়বহীন সুর হ’য়ে
লিপ্ত হবো পৃথিবীর
সকল আকাশে। ‘

এই আত্মোন্মাদ সাধক তথা আত্মভোলা শিশুর সারল‍্যমাখা কবিই লিখেছেন অসামান্য সব পংক্তি ও হিরন্ময় শব্দগুচ্ছ। যেমন,

‘ মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!’
যেমন,
‘ এই যে অমেয় জল —
মেঘে-মেঘে তনুভূত জল —
এর কতোটুকু আর ফসলের দেহে আসে বলো? ফসলের ঋতুতেও অধিকাংশ শুষে নেয় মাটি।
তবু কী আশ্চর্য, দ‍্যাখো, উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে তার এই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়। ‘
যেমন,
নিষ্পেষণে ক্রমে- ক্রমে অঙ্গারের মতন সংযমে হীরকের জন্ম হয়,
দ‍্যুতিময়, আত্মসমাহিত। ‘

আরও এক উল্লেখযোগ্য পংক্তি :
‘ শিশুদের আহার্যের মতন
সরল হও তুমি,
সরল, তরল হও ;
বিকাশের রীতিনীতি এই। ‘

বিনয় মজুমদার সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন,
” বিনয় চাইলে যে কোনো কিছু নিয়েই কবিতা লিখতে পারে। মল-মূত্র-গোবর নিয়েও পারে। ”
ঋত্বিক ঘটক বলেছেন,
” আমার মনে হয় এ-কালে বাংলাদেশে এতোবড় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কবি আর জন্মান নি। তিনি কবিতা লেখার জন্যই জন্মেছেন। ”

কবির নিজের জীবনেও ছিল এক আশ্চর্য আঁধার। সেটিকেও তিনি কবিতার বিষয়বস্তু করতে ছাড়েন নি।

‘ চিৎকার আহ্বান নয়,
গান গেয়ে ঘুম ভাঙালেও
অনেকে বিরক্ত হয় ; শঙ্খমালা , তুমি কি হয়েছো? ‘
এই কবি তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে।

‘ যখন কিছু না থাকে,
কিছুই নিমেষলভ‍্য নয়,
তখনো কেবলমাত্র বিরহ
সহজে পেতে পারি। ‘
মনে পড়ে যায় মীরা
দেববর্মণের লেখা ও শচীন কর্তার গাওয়া সাড়াজাগানো গান :
‘ বিরহ বড় ভালো লাগে… ‘

বিনয় কবি সবিনয়ে রেখে গেছেন কঠিন প্রশ্ন :
‘ ভালবাসা দিতে পারি,
তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?
লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝ’রে যায় —
হাসি, জ‍োৎস্না, ব‍্যথা, স্মৃতি,
অবশিষ্ট কিছুই থাকে না। ‘
এই কবিতাটির উপসংহারে তিনি লিখেছেন :
‘ প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী
হাসি নিয়ে তুমি চলে যাবে ;
ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হবো আমি। ‘

হাংরি আন্দোলনের জনক মলয় রায়চৌধুরীর মতে,
‘ ফিরে এসো চাকা ‘ ছিল বাংলা কবিতার জগতে এক ক‍্যামব্রিয়ান বিষ্ফোরণ। ‘

‘ জাগতিক সফলতা নয়,
শয়নভঙ্গির মতো অনাড়ষ্ট
সহজবিকাশ সকল মানুষ
চায় ‘

গণিতের সৌন্দর্যে সমর্পিতপ্রাণ এই কবির মননে ও যাপনে গণিত ছিল অনির্বচনীয়। গাণিতিক সৌন্দর্যের বিখ্যাত উদাহরণটি হলো পিথাগোরাসের উপপাদ‍্যটি। আর গণিতের সঙ্গে সঙ্গীত, কবিতা ও সমগ্র ললিতকলার সম্পর্ক নিয়ে বারট্র‍ান্ড রাসেল-সহ অনেক বিদগ্ধজন লিখে গেছেন।
কবির আরেকটি কবিতার শেষাংশ উদ্ধৃত করা যাক :

‘ অবশেষে ফুল ঝ’রে,
অশ্রু ঝ’রে, আছে শুধু সুর।
কবিতা বা গান… ভাবি,
পাখিরা — কোকিল গান গায়
নিজের নিষ্কৃতি পেয়ে, পৃথিবীর কথা সে ভাবে না। ‘
আরো একটি কবিতাংশ :
‘ স্বর-সুর এক হ’য়ে কাঁপে বায়ু , যেন তুষ্ট শীতে,
কেঁদে ওঠে, জ‍্যোৎস্নার কোমল উত্তাপ পেতে চায়। ‘

বাংলা সাহিত্যে বাঁকবদলের অন‍্যতম এই কবিকে মলয় রায়চৌধুরী বলেছেন,
‘ কবিতার বোধিবৃক্ষ ‘।
ব‍্যক্তিগত যন্ত্রণার অভিঘাতে ছিন্নভিন্ন, বস্তুত পুড়ে খাক হওয়া জীবন থেকেও বিন্দু বিন্দু আনন্দরস আহরণ ক’রে বাংলা কাব‍্যকে এক কান্তিময় দিশার সন্ধান দিয়ে গেছেন এই আশ্চর্য কবি।
এ লেখার শেষেও ছড়ানো থাক তাঁরই প্রসিদ্ধ কবিতার অন্তরঙ্গ আলো :

‘ আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,
তোমার ঠিকানা আছে
আমার বাড়িতে,
চিঠি লিখব না।

আমরা একত্রে আছি
বইয়ের পাতায়। ‘

আরও পড়ুন- রাত পোহালেই চন্দননগর পুরনিগমে উপনির্বাচন, কড়া নিরাপত্তা বলয়

 

 

spot_img

Related articles

মঞ্চ থেকে পুলিশের সঙ্গে বাদানুবাদ, সেন্ট্রাল পার্কে হেনস্থার শিকার শিলাজিৎ! 

সল্টলেকের বইমেলা প্রাঙ্গনে (Boimela Prangan) শো করতে গিয়েছিলেন শিলাজিৎ ( Shilajit )। আর সেখানে পুলিশের আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র...

চাপের মুখে পিছু হঠল শাহর দফতর: সোনম ওয়াংচুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি তোলা হচ্ছে

লাদাখের পরিবেশ আন্দোলন কর্মী সোনম ওয়াংচুকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারি আদৌ আইনসিদ্ধ কী? প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ...

কলকাতায় শুষ্ক আবহাওয়া, শনিবার বৃষ্টি উত্তরবঙ্গে!

উইকেন্ডে সকাল থেকে আংশিক মেঘলা আকাশ থাকলেও বেলা বাড়তে রোদের দাপট চওড়া হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গে (South Bengal weather)। কলকাতায়...

IPL শুরুর আগেই নাইটদের বিরাট ধাক্কা, টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেলেন হর্ষিত!

আগামী মাসের শুরু হচ্ছে আইপিএলের (IPL) নতুন সিজন। ইতিমধ্যেই প্রত্যেক দল নিজেদের টিম মেম্বারদের নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি...