Sunday, January 18, 2026

Sunday Feature : সেনাবাহিনীর বন্দুকে নয়, দেশের মানুষকে ‘ইচ্ছা’ দিয়ে জঙ্গিদের থেকে রক্ষা করেছিলেন তিনি

Date:

Share post:

দিনটা হতে পারত ২৩তম জন্মদিনের উৎসবের প্রস্তুতি। হতে পারত নতুন কোনো মডেলিং অ্যাসাইনমেন্টের ঝলমলে আলোয় ফেরা। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের সেই অভিশপ্ত ভোর নীরজা ভানোটের সামনে অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। করাচি বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩-এর অন্দরে একে-৪৭ হাতে চার জঙ্গি ঢুকে পড়ল, তখন এক লহমায় বদলে গিয়েছিল সব সমীকরণ। আজ দশকের পর দশক পেরিয়েও করাচির সেই রক্তাক্ত পিচ আর বিমানের ইমার্জেন্সি এক্সিট সাক্ষী দেয় এক ২২ বছরের তরুণীর অবিশ্বাস্য সাহসিকতার।

মুম্বই থেকে নিউইয়র্কগামী সেই বিমানে তখন ৩৮০ জন যাত্রীর প্রাণ সংশয়। ‘আবু নিদাল’ গোষ্ঠীর জঙ্গিরা যখন ককপিটের দিকে এগোচ্ছে, নীরজার উপস্থিত বুদ্ধিই প্রথম ধাক্কা দিয়েছিল তাদের পরিকল্পনায়। ইন্টারকমের সংকেতে ককপিট থেকে পাইলটদের সরিয়ে দিয়ে বিমানটিকে অচল করে দেন তিনি। অর্থাৎ, আকাশপথে নয়, লড়াইটা হবে মাটিতেই—আর সেই লড়াইয়ের সেনাপতি হয়ে উঠলেন বিমানের সিনিয়র পার্সার নীরজা।

জঙ্গিদের মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন নাগরিকরা। তাদের নির্দেশে যাত্রীদের পাসপোর্ট সংগ্রহের কাজ শুরু হলে শুরু হয় এক ছায়াযুদ্ধ। নীরজা জানতেন, আমেরিকান পাসপোর্টগুলো জঙ্গিদের হাতে যাওয়া মানেই মৃত্যু নিশ্চিত। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা একের পর এক পাসপোর্ট লুকিয়ে ফেললেন সিটের তলায়, কেউ বা ময়লার ঝুড়িতে। জঙ্গিরা হন্যে হয়ে খুঁজেও সেদিন আলাদা করতে পারেনি কাদের তারা হত্যা করতে চায়।

টানা ১৭ ঘণ্টা। এসি বন্ধ, জল নেই, চারদিকে শুধু বন্দুকের নল আর ঘাম মেশানো আতঙ্ক। সেই নরকেও নীরজা ছিলেন শান্ত। বারবার যাত্রীদের জল ও খাবার দিয়ে আশ্বস্ত করেছেন, যেন তিনি নন, পরিস্থিতিই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। রাত ঘনানোর পর যখন বিমানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তখনই শুরু হয় চূড়ান্ত তাণ্ডব। অন্ধকারের সুযোগে জঙ্গিরা যখন এলোপাথাড়ি গুলি আর গ্রেনেড ছুড়ছে, নীরজা খুলে দিলেন প্রাণের দুয়ার—বিমানের ইমার্জেন্সি এক্সিট।

চাইলেই তিনি সবার আগে স্লাইড দিয়ে নেমে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু দায়িত্বের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল ব্যক্তিগত জীবনের চেয়েও বড়। একে একে যাত্রীদের বাইরে পাঠানোর সময় তাঁর চোখে পড়ে তিনটি অসহায় শিশু। সিটের আড়ালে কুঁকড়ে থাকা সেই তিন প্রাণকে বাঁচাতে গিয়েই জঙ্গির নজরে পড়ে যান তিনি। চুলের মুঠি ধরে কাছ থেকে চালিয়ে দেওয়া হয় গুলি। রক্তে ভিজে যায় ইউনিফর্ম, কিন্তু তার আগেই সেই তিনটি শিশুকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি।

দু’দিন বাদে ৭ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর জন্মদিন। সেই দিন যখন মুম্বই বিমানবন্দরে কাঠের কফিনে তাঁর দেহ ফিরল, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ। ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘অশোক চক্র’ সম্মানে ভূষিত করে—এই সম্মান পাওয়া তিনি প্রথম মহিলা এবং সর্বকনিষ্ঠ নাগরিক। পাকিস্তানও তাঁকে কুর্নিশ জানিয়েছিল ‘তমঘা-ই-ইনসানিয়াত’ পদকে। আজ যখন নীল আকাশে বিমান ডানা মেলে, তখন নীরজা ভানোট নামের সেই তেজস্বিনী তরুণী আমাদের মনে করিয়ে দেন—মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার পেশায় নয়, চরম সংকটেও অটুট থাকা তার মানবিকতায়।

আরও পড়ুন- এসআইআর চলাকালীন অশান্তি ঠেকাতে রাজ্যকে সতর্ক করল কমিশন

_

 

_

 

_

 

_

spot_img

Related articles

সেবাশ্রয় ২.০: চলাফেরার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে দশ বছরের শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার 

জনসেবার ধারাবাহিক যাত্রা অব্যাহত রেখে 'সেবাশ্রয় ২.০' (Sebaashray 2.0) মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এবার সহানুভূতি...

কুয়াশায় দৃশ্যমান্যতার অভাব, রবিবাসরীয় সকালে দিল্লিতে ব্যাহত বিমান পরিষেবা

প্রবল ঠান্ডা আর কুয়াশার জোড়া ইনিংসে কাবু দেশের রাজধানী। মৌসম ভবনের (IMD) পূর্বাভাস মিলিয়ে রবিবাসরীয় সকাল থেকে ঘন...

আজ নদিয়া সফরে অভিষেক, রোড শো করবেন কৃষ্ণনগরে

'আবার জিতবে বাংলা কর্মসূচি'তে রবিবার নদিয়া জেলায় যাচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। শনিবার বহরমপুরে রোড শো করতে দেখা...

‘উড়ন্ত ডাচ জাহাজ’, উৎপল সিনহার কলম

যে জাহাজ কখনও বন্দরে পৌঁছোতে পারে না , চিরকাল নাকি সমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়, অভিশপ্ত এক জাহাজ, যাকে...