তিনি কখনও প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। সারাদিন হাসপাতালের ব্যস্ততা আর রোগীদের ভিড় সামলানোই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু কাজই যখন কথা বলে, তখন স্বীকৃতিও আসে মাথা নত করে। ২০২৬ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যখন পদ্ম পুরস্কারের তালিকা ঘোষণা করল, তখন দেখা গেল বাংলার এক বিশিষ্ট চিকিৎসকের নাম— ডক্টর সরোজ মণ্ডল। রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি এবার ভূষিত হলেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে।

সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে অনেক সময়েই নানা অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে ডক্টর সরোজ মণ্ডল যে নজির গড়েছেন, তা কার্যত অভাবনীয়। ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলার চিকিৎসা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেদিন তাঁর নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল মাত্র ৯ ঘণ্টায় ২২ জন রোগীর শরীরে সফলভাবে পেসমেকার বসিয়েছিলেন। এই ঘটনার পিছনে কোনও বিশ্বরেকর্ড গড়ার লক্ষ্য ছিল না, ছিল কেবল মুমূর্ষু রোগীদের বাঁচানোর অদম্য তাগিদ।

সেদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়েছিল সেই ম্যারাথন কর্মযজ্ঞ। এক মিনিটের বিরাম ছিল না। ডক্টর মণ্ডলের নেতৃত্বে কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, শিনাথ সিংদের মতো চিকিৎসকরা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যখন একজনের শরীরে অস্ত্রোপচার চলছে, তখনই পরের জনের অ্যানাস্থেশিয়ার প্রস্তুতি সারা হয়ে যাচ্ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ যখন শেষ অপারেশনটি শেষ হয়, তখন দেখা যায় মোট ১৪টি ডাবল চেম্বার, দুটি আইসিডি এবং বাকি সিঙ্গল চেম্বার পেসমেকার বসানো সম্পন্ন হয়েছে।

তালিকায় থাকা রোগীদের বাইরেও সেদিন জরুরি বিভাগ থেকে আসা ৮০ বছর বয়সি এক প্রবীণ অধ্যাপককেও ফিরিয়ে দেননি ডক্টর মণ্ডল। নিজের ক্লান্তিকে তুচ্ছ করে তাঁর অস্ত্রোপচারও সফলভাবে সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীকালে এই সাফল্যের বিষয়ে সরোজবাবু জানিয়েছিলেন, তাঁদের বিভাগটি এমনিতেই খুব ব্যস্ত, তবে সেদিন পরিস্থিতিই তাঁদের ওই কাজের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। কোনও প্রচার নয়, দায়বদ্ধতাই ছিল আসল চালিকাশক্তি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এসএসকেএম হাসপাতালে এই সমস্ত জীবনদায়ী ব্যবস্থাপনাই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছিল। ফলে ২২ জন দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ নতুন জীবন পেয়েছিলেন। ডক্টর সরোজ মণ্ডলের এই পদ্মশ্রী সম্মান আসলে সেই সমস্ত সরকারি চিকিৎসকদের জয়গান, যাঁরা নিভৃতে থেকে প্রতিদিন অসাধ্য সাধন করছেন। রবিবারের বিকেলে তাঁর এই প্রাপ্তি বাংলার চিকিৎসা মহলে আনন্দের জোয়ার নিয়ে এল।

আরও পড়ুন – প্রসেনজিতের পদ্মশ্রী প্রাপ্তিতে গর্বিত টলিউড, শুভেচ্ছা সতীর্থ থেকে অনুরাগীদের

_

_

_

_
_


