
‘ আপন গন্ধে মাতোয়ারা হরিণ ‘ এমন একটি রূপক, যা নিজের ভেতরের সম্পদকে বাইরে খুঁজে বেড়ানোর বিড়ম্বনাকে বোঝায়। কস্তুরী মৃগ নিজের নাভিতে থাকা অসামান্য সুগন্ধের উৎস না জেনে সারাদিন বনের মধ্যে তার গন্ধ খুঁজে বেড়ায় এবং শেষে ক্লান্ত হয়ে তার দশা হয় পাগলপারা। মানুষের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে না তা নয়। তবে সেটা অন্তরাত্মার স্বরূপ খুঁজে না পেয়ে সারা দুনিয়ায় ছুটে বেড়ানোর মতো আহাম্মকির নামান্তর।

পরম জ্ঞানের উৎস খুঁজতে নিজের বোধের ওপর ভরসা হারিয়ে ‘ হেথা নয় হেথা নয় ‘ করে ছুটে মরার মতোই বিড়ম্বনা। এই রূপকের কাছাকাছি থাকে আত্মমুগ্ধতা, আত্মপ্রেম, আত্মকেন্দ্রিকতা ইত্যাদি। আজকের আধুনিক পৃথিবীতে যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রামক ব্যাধির মতো। এ প্রসঙ্গে একটি প্রাচীন গল্পের উল্লেখ করতে হয়। ‘ নিজের রূপে নিজেই বিভোর ‘ হয়ে বিপদ ডেকে আনে এ কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র। গ্রিক পুরাণের নার্সিসাস ছিলেন নদীদেবতা সেফিসাস ও জলপরী লিরিওপির অতি রূপবান পুত্র, যিনি নিজের প্রতিবিম্বের প্রেমে আত্মহারা হয়ে অভুক্ত অবস্থায় এক জলকুণ্ডের পাশে মারা যান। দেবী নেমেসিসের অভিশাপে নিজের সৌন্দর্যে আত্মমুগ্ধ নার্সিসাস জলপরীদের প্রেম চরম অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করতেন এবং শেষে তাঁর করুণ পরিণতির পর যেখানে মারা যান, সেখানে নার্সিসাস ( ড্যাফোডিল) ফুল ফোটে, যা তাঁর নামের উৎস। নার্সিসাস নিজের রূপ নিয়ে এতটাই অহংকারী ছিলেন যে আর সবাইকে তিনি তুচ্ছ ভাবতেন। তিনি জলপরী ইকো-র ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করেন, যার ফলে ইকো দুঃখে শুকিয়ে নাকি ধ্বনিতে
( echo) পরিণত হন। প্রত্যাখ্যাত প্রণয়ীদের মধ্যে কেউ একজন প্রতিশোধের দেবী নেমেসিসের কাছে বিচার প্রার্থনা করলে তিনি নার্সিসাসকে অভিশাপ দেন।

এরপরেই নার্সিসাস একদিন স্বচ্ছ এক পুকুরের জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজের রূপে নিজেই এতোটা মোহিত হয়ে পড়েন যে ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে সেই প্রতিবিম্বের প্রেমেই ডুবে থাকেন এবং শেষে মারা যান। নিজের প্রতিবিম্বকে আলিঙ্গন করতে না পারার হতাশায় ভীষণ মুহ্যমান হয়ে নার্সিসাস অকাল মৃত্যুর শিকার হন। আত্মমুগ্ধতা, আত্মপ্রেম এবং আত্মকেন্দ্রিক মানসিক অবস্থাকে নার্সিসাসের নামানুসারে নার্সিসিজম ( narcissism ) বলা হয়। অতি রূপবান হওয়ার মত্ততায়, অহংকারে এবং নিজের প্রতিবিম্বকে আলিঙ্গন করতে না পেরে ভালবাসার যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে তাঁর এই মৃত্যুবরণের কাহিনী যথেষ্ট শিক্ষনীয়। সারাক্ষণ নিজেকে নিয়ে মত্ত থাকার বিপদ কি চরম পরিণতির আগের মুহূর্তেও টের পাওয়া যায় না ? এক পরম জ্ঞানী ভবিষ্যতদ্রষ্টা নাকি নার্সিসাসকে বলেছিলেন যে, নার্সিসাস যদি নিজেকে চিনতে পারে তাহলে সে দীর্ঘ জীবন লাভ করবে। কিন্তু নিজেকে চিনতে পারেন নি তিনি। নিজেকে চেনার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর অসামান্য রূপ।

তাই তাঁর জীবনদীপ নিভে যায় অকালে। নিজের সম্পর্কে অহেতুক উচ্চ ধারণা বড়ো বিপজ্জনক। নার্সিসিজম যে কোনো মানুষের জন্যই যথেষ্ট ক্ষতিকারক। অপরিসীম দম্ভ, আত্মদর্প, নিজেকে অনন্য ভাবা এবং অন্যদের হেয় প্রতিপন্ন করার হীণ প্রবণতা এই অন্ধকার ভাবনার মূল কথা। এই ধরণের মানুষেরা অতিরিক্ত প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্খায় সারাক্ষণ মগ্ন থাকেন। অন্যদের অনুভূতিকে অবহেলা করেন। অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় কোনো সাধ থাকে না এঁদের। এঁদের মনে কারোর জন্যই কোনো সহানুভূতি থাকে না। এঁরা সবসময় নিজের কাজ ও যোগ্যতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর চেষ্টায় রত থাকেন। অন্যদের এঁরা গুরুত্বহীন মনে করেন। সবটুকু সম্মান ও মর্যাদা একাই পেতে চান। নিজের স্বার্থ ছাড়া এঁরা আর কিছু ভাবতে পারেন না। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এঁরা অন্যদের ব্যবহার করতে চান অথচ অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হন। অন্যের ক্ষতি কামনা করেন। এঁরা মানসিকভাবে এক ধরনের ভীতিকে লালন করেন নিজেদের অজান্তেই। অন্যদের কাছে সবসময় বিশেষ হয়ে ওঠার লালসায় এঁরা এক ধরনের মানসিক রোগের শিকার হন , যার নাম ‘ নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার ‘ ।

এই রোগের প্রধান কিছু লক্ষণ হলো অতিরিক্ত আত্মগুরুত্ব, প্রশংসিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা , মূঢ় অহংকার , ঈর্ষা ও হিংসা এবং সহানুভূতিহীনতা । এঁরা সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেন না। এঁরা ভীষণ অসহিষ্ণু। তীব্র আত্মকেন্দ্রিকতা এঁদের অন্ধ করে রাখে। সামান্য সমালোচনাকেও এঁরা ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখে এবং ক্রুদ্ধ হয়ে কুযুক্তি ও কুতর্কে অবতীর্ণ হয়। এঁরা মূলত মনের অন্ধকার সত্তা দ্বারা পরিচালিত হন। এঁরা নিজেদের অজান্তেই মানসিক বিচ্ছিন্নতার অনুশীলনে প্রবৃত্ত হন এবং এই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারেন না। নার্সিসিস্ট মাত্রেই যে খারাপ , তা কিন্তু নয়। আসলে তাঁদের আচরণ সমস্যাযুক্ত এবং এই সমস্যা থেকে সহজে মুক্তি মেলে না। নিয়মিত কাউন্সেলিং এই জটিল রোগের নিরাময়ে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। আসলে ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতায় আক্রান্ত এই পৃথিবীতে রুগীর সংখ্যা যত বাড়ছে , ততই কমে আসছে চিকিৎসকের সংখ্যা। এটাই বড়ো উদ্বেগের বিষয়।

আরও পড়ুন- বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ: নাম বদল হলো মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের

_

_

_

_
_

