প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব বেতার দিবস (World Radio Day) পালিত হয়। ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রসংঘ (United Nations) বেতারের প্রতিষ্ঠা এই দিবসের প্রেক্ষাপট। বেতার সব সময়েই এক বিশেষ আবেদন বহন করেছে। সহজ অথচ শক্তিশালী, অন্তরঙ্গ অথচ বিস্তৃত। দৈনন্দিন জীবনে নিঃশব্দে প্রবেশ করে সে সঙ্গ, তথ্য ও আত্মীয়তার অনুভূতি দেয়। পর্দার দুনিয়া প্রাধান্য পাওয়ার বহু আগে বেতারই ছিল ঘরের বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর। দূরবর্তী অঞ্চল, নানা ভাষা ও অগণিত মানুষের জীবনকে একসূত্রে বেঁধেছে এই মাধ্যম। বিশ্ব বেতার দিবস ২০২৬-এর বিষয় “বেতার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সহায়ক উপকরণ, কণ্ঠস্বর নয়।”

ইতিহাসের বহু মুহূর্ত মানুষের স্মৃতিতে অম্লান রয়েছে বেতার ঘোষণার মাধ্যমে। ১৪ ও ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এর মধ্যরাতে স্বাধীনতার ঘোষণা বেতারের (Radio) তরঙ্গেই পৌঁছেছিল মানুষের কানে। সেই একক সম্প্রচার সমগ্র দেশকে স্বাধীনতার এক অভিন্ন সুরে যুক্ত করেছিল।

২০১১ সালে রাষ্ট্রসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা তাদের ৩৬তম সাধারণ সম্মেলনে বিশ্ব বেতার দিবস ঘোষণার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০১২ সালে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ফলে, এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত দিবসের মর্যাদা পায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রসংঘ বেতারের স্মৃতিকে চিহ্নিত করতেই প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয়।

২০২৬ সালের বিষয় বা থিম “বেতার ও এআই: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সহায়ক উপকরণ, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর নয়।” এই থিম সম্প্রচার ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকার উপর আলোকপাত করে। বিষয়বস্তু নির্মাণ, সংরক্ষণ, অনুবাদ, শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি মানবকণ্ঠ, সম্পাদনাগত বিচক্ষণতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প নয়। এই মূল্যবোধই বেতারের পরিচয় নির্ধারণ করে। নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের উপর জোর দিয়ে এই থিম জানায়, নতুন উদ্ভাবন বেতারের মূল শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে।

বিশ্ব বেতার দিবস উপলক্ষে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে আকাশবাণী রায়পুর, রাষ্ট্রসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার সহযোগিতায় ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে ‘বিশ্ব বেতার দিবস সম্মেলন’-এর আয়োজন করছে। সরকারি থিমের ভিত্তিতে সম্মেলনে বিষয়বস্তু নির্মাণ, শ্রোতা সম্পৃক্ততা ও সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হবে।

আকাশবাণী, অল ইন্ডিয়া রেডিও নামে সুপরিচিত, প্রসার ভারতীর বেতার শাখা। “বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়” মন্ত্র নিয়ে ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর জনমালিকানাধীন সংস্থায় পরিণত হয়। ভাষার বৈচিত্র্য ও বিপুল শ্রোতাপরিসরের নিরিখে এটি বিশ্বের বৃহত্তম সম্প্রচার সংস্থাগুলির অন্যতম।

দেশজুড়ে ৫৯১টি কেন্দ্র নিয়ে আকাশবাণীর পরিষেবা দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা এবং ৯৯.১৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে আচ্ছাদিত করে। মোট ২৩টি ভাষা ও ১৮২টি উপভাষায় অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। মধ্য তরঙ্গ, স্বল্প তরঙ্গ, এফএম ও ডিজিটাল মাধ্যমে মহানগর থেকে দুর্গম গ্রাম ও সীমান্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যায় আকাশবাণী।

সংবাদ, সাম্প্রতিক বিষয়, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, যুব অনুষ্ঠান, শাস্ত্রীয় ও লোকসংগীত-সহ নানা বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আকাশবাণী নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করেছে।

কোভিড অতিমারীর সময় গ্রামীণ বিহার, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশের বহু অঞ্চলে বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। সেখানে শিক্ষার্থীরা আকাশবাণীর শিক্ষামূলক সম্প্রচারের উপর নির্ভর করেছে। ওড়িশা ও তামিলনাড়ুর উপকূলীয় অঞ্চলে জেলেরা সমুদ্রে যাওয়ার আগে আবহাওয়া বুলেটিন শোনেন। ২০১৯ সালের ফণী ঘূর্ণিঝড়ের সময় সময়োচিত সতর্কবার্তা বহু মানুষকে নিরাপদে ফিরতে সহায়তা করে।
বেসরকারি এফএম বেতার শহর ও অঞ্চলে স্থানীয় বিনোদন ও তথ্য পরিবেশন করে। ২০২৪ সালের অগাস্টে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২৩৪টি শহর ও নগরে ৭৩০টি নতুন এফএম চ্যানেল (FM Channel) চালুর অনুমোদন দেয়। সংরক্ষিত মূল্য ৭৮৪.৮৭ কোটি টাকা। আঞ্চলিক বিষয়বস্তু বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এফএম তৃতীয় পর্যায় নীতির আওতায় বর্তমানে ১১৯টি শহরে ৩৯১টি বেসরকারি এফএম চ্যানেল চালু রয়েছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব যোগাযোগ প্রয়োজন মেটাতে এই কেন্দ্র পরিচালনা করে। ২০০২ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে লাইসেন্স প্রদানের নীতি অনুমোদনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়। ২০০৪ সালে প্রথম কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়। ২০০৫ সালে অন্না বিশ্ববিদ্যালয় ‘অন্না কমিউনিটি রেডিও’ চালু করে।
২০১৪-র ৩ অক্টোবর শুরু হওয়া ‘মন কি বাত’ আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত একটি মাসিক অনুষ্ঠান। প্রতি মাসের শেষ রবিবার এটি প্রচারিত হয়। ইতিমধ্যে ১৩০টি পর্ব সম্পূর্ণ হয়েছে। এই কর্মসূচি দেখিয়েছে যে ডিজিটাল যুগেও বেতার গণযোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম।
বিশ্ব বেতার দিবস বেতারের স্থায়ী গুরুত্বকে স্মরণ করায়। দ্রুত ডিজিটাল পরিবর্তনের মধ্যেও বেতার সহজপ্রাপ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতা, ভাষা ও সংযোগের বাধা অতিক্রম করে এটি তথ্য, শিক্ষা ও দুর্যোগকালীন যোগাযোগে সহায়তা করে।
আরও পড়ুন- প্রভাব ফেলবে না SIR! নির্দিষ্ট সময়েই ফলপ্রকাশ, মাধ্যমিক শেষে ঘোষণা পর্ষদ সভাপতির


