একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই কেবল আবেগ বা শ্রদ্ধার্ঘ্য নয়, বরং ঘরের মাটিতে নিজের ভাষার অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই সুরেই গর্জে উঠল বাংলা পক্ষ। ১৯৫২-র ঢাকার রাজপথ থেকে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ— মাতৃভাষার সম্মান রক্ষায় বাঙালির লড়াই যে আজও ফুরিয়ে যায়নি, মঙ্গলবার রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠনের কর্মসূচি থেকে সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিলেন কৌশিক মাইতি ও গর্গ চট্টোপাধ্যায়েরা।

এ বছর ভাষা দিবস উপলক্ষে গত এক সপ্তাহ ধরে রাজ্যজুড়ে ‘বাংলা ভাষার অধিকার সপ্তাহ’ পালন করেছে এই সংগঠন। কেবল সভা-সমিতি নয়, বরং সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করার দাবিতে দফায় দফায় ডেপুটেশন ও আন্দোলনের পথে হেঁটেছে তারা। পিএসসি ভবন থেকে মেট্রো রেলের সদর দফতর, কিংবা স্কুল শিক্ষা দফতর থেকে পুরসভা— সর্বত্রই সংগঠনের দাবি ছিল স্পষ্ট: পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে সরকারি ও বেসরকারি সমস্ত কাজে বাংলার ব্যবহার এবং বাংলা জানা কর্মীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

শনিবার বেলেঘাটায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি বলেন, ব্যাঙ্কিং পরিষেবায় বাংলার দাবিতে আমরা আইনি লড়াই চালাচ্ছি। হলফনামা দিয়ে পরিষেবা দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে বহু জায়গায় বাঙালি বঞ্চিত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটব আমরা। পাশাপাশি উবের বা ওলার মতো অ্যাপ-ক্যাব পরিষেবাতেও বাংলা জানা চালক ও বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করার দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে ইমেল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্য দিকে, বরাহনগরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গর্গ চট্টোপাধ্যায় বলেন, এই দিনটি শপথ নেওয়ার দিন। আজও বাংলায় কথা বলার অপরাধে এ রাজ্যে বাঙালি আক্রান্ত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে মাতৃভাষার দায়ে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে ভাষা শহীদের মর্যাদা দিতে হবে।

শুধু কলকাতা নয়, পাহাড় থেকে মোহনা— রাজ্যের প্রতিটি জেলাতেই এ দিন ভাষা দিবসের কর্মসূচি পালন করেছে বাংলা পক্ষ। আসানসোলে ইস্কোর বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলি বন্ধ করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে তারা। শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন উত্তরবঙ্গের এই শহরে সাইনবোর্ডে বাংলা বাধ্যতামূলক করার আইন কার্যকর হচ্ছে না? নিউটাউনে ‘বাংলা শিল্পী পক্ষ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা ও গানের মাধ্যমেও ভাষা রক্ষার লড়াইয়ের ডাক দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এ দিনের কর্মসূচিতে কেবল বাংলার অধিকার নয়, বরং হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সমমনোভাবাপন্ন কন্নড়, তামিল বা পাঞ্জাবি সংগঠনগুলির সঙ্গেও ঐক্যের বার্তা দিয়েছে বাংলা পক্ষ। সব মিলিয়ে, পুষ্পস্তবক আর গানে গানে সীমাবদ্ধ না থেকে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে ভাষা আন্দোলনের পুনর্জাগরণের দিন হিসেবেই তুলে ধরল এই সংগঠন।

আরও পড়ুন – ২৬ দিন পর শনাক্ত ১৮ জনের দেহাংশ, পরিজনদের হাতে তুলে দিল পুলিশ

_

_

_
_

