অনুষ্ঠান শুরুর আগে যখন স্পিকারে বেজে উঠল আমাজন প্রাইমের জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’-এর সেই চেনা সুর, তখন সভাগৃহে হাসির রোল। কিন্তু মঞ্চে যিনি উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর জীবনকাহিনি স্রেফ বিনোদন নয়, বরং হার মানাবে যে কোনও চিত্রনাট্যকেও। তিনি ছবি রাজাওয়াত— ভারতের সর্বকনিষ্ঠ এবং সম্ভবত একমাত্র এমবিএ ডিগ্রিধারী পঞ্চায়েত প্রধান। আগ্রার তাজ হোটেলের কনভেনশন সেন্টারে ৪৫ বছরের এই ‘শের-দিল’ মহিলার লড়াইয়ের গল্প শুনে উপস্থিত জনতা তখন বিস্ময়ে থমথমে।

দিল্লির লেডি শ্রীরাম কলেজের ঝকঝকে ছাত্রী, কাঁড়ি কাঁড়ি বেতনের কর্পোরেট চাকরি— সবটাই ছিল ছবির হাতের মুঠোয়। কিন্তু বাঁধ সাধল ২০০৭-০৮ সালের এক ফোন কল। খরাকবলিত রাজস্থানের সোডা গ্রাম থেকে এক বৃদ্ধের কাতর আর্তি ভেসে এল— “বেটি, বাঁচালো হামে!” নিজের মাটির সেই টান উপেক্ষা করতে পারেননি ছবি। ৩০ বছর বয়সে এসির আরাম আর দামি গাড়ি ছেড়ে স্রেফ একটা ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলেন গ্রামের ধুলো-বালির পথে।

সেদিন গ্রামের কুয়োয় জল ছিল না, ক্ষেতে ছিল না ফসল। কিন্তু ছবির জেদ ছিল পাহাড়প্রমাণ। ২০১০ সালে কোনও রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা ছাড়াই রেকর্ড ভোটে জিতে পঞ্চায়েত প্রধান হলেন তিনি। গত ১৩ বছরে ভোল বদলে দিয়েছেন মরণাপন্ন গ্রামটির। আজ সোডা গ্রামে আছে বাচ্চাদের স্কুল, মেয়েদের হাইস্কুল, আইটি হাব, এমনকি সোলার পাওয়ারের আলো। দিল্লির রাজপথে এককালে সিডান চালানো মেমসাহেব আজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে গ্রাম পরিদর্শনে যান।

তবে এই পথটি গোলাপ বিছানো ছিল না। পর্দার ‘শের-দিল’ ছবির গঙ্গারামজীর মতো তিনিও লড়াই করেছেন রাজনৈতিক শ্বাপদদের বিরুদ্ধে। ছবির কথায়, ‘প্রজেক্টের অফিস ভেঙে দেওয়া হয়েছে, সহকর্মীরা মার খেয়েছে, এমনকি বন্দুক দেখিয়ে খুনের হুমকিও এসেছে। কিন্তু আমি ভয় পাইনি।’ অবিবাহিত এই লড়াকু নেত্রীর সাফ কথা— বিপদে পড়লে কখনও বয়ফ্রেন্ড, হাসব্যান্ড বা বাউন্সারের কথা মনে পড়েনি। তাঁর ভরসা কেবল ‘উপরে ভগবান আর নিচে সাধারণ মানুষ’। সংসার বা স্বামী নেই বলে কোনও খেদ নেই ছবির। তাঁর পরিবার এখন হাজার হাজার মানুষের। ঘর-সংসারের দশ বাই দশ ফুটের মায়া কাটিয়ে তিনি তো নীল আকাশটাই চেয়েছেন। তাঁর লড়াইয়ের গল্প শুনতে শুনতে উপস্থিত শ্রোতাদের মনে হচ্ছিল, ডেস্কে বসে ফাইল ওল্টানোর চেয়েও বোধহয় অনেক বেশি রোমাঞ্চকর গ্রামের ওই মেঠো পথের শাসনভার।

আরও পড়ুন – ভোটার তালিকায় বিভ্রাট: ‘বিচারাধীন’ খোদ বিধায়ক ও বিডিও, নাম কাটা গেল কাউন্সিলরের

_

_
_

_
_

_

