৩ মে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস হিসাবে উদযাপন করেন বিশ্বের সাংবাদিক মহল। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গোটা দেশ এমনকি গোটা বিশ্বে বর্তমানে যে সংবাদ-বিস্ফোরণ প্রতি মুহূর্তে হয়ে চলেছে তার কতটা সঠিক বা নির্ভরযোগ্য তার সত্যতা যাচাই করে তুলে ধরেন সাংবাদিকরা (reporters)। সম্প্রতি বিশ্বে যে অশান্তি ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বেড়ে গিয়েছে তাতে কার্যক্রম বেড়ে গিয়েছে সাংবাদিকদের ব্যস্ততা। যদিও আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিসংখ্যান (news index) সংস্থাগুলির মত, গোটা বিশ্বে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্র ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলি সংবাদ মাধ্যমের (media house) স্বাধীনতার নিরিখে পিছিয়ে পড়েছে বেশ কয়েক ধাপ। সেই তালিকায় অন্যতম ভারত (India)। ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান আগে ১৫৭-এ। পাকিস্তান (Pakistan), বাংলাদেশের (Bangladesh) নজিরও ভারতের থেকে ভালো, জানাচ্ছে আরএসএফ (RSF) রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার সমীক্ষা সংস্থা।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে প্রশ্ন উঠেছে ভারতীয় সংবাদ সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে। প্রশ্ন গড়িয়েছে দেশের সংসদ পর্যন্ত। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগে ন্যাশানাল হেরল্ড পত্রিকা (National Herald) দফতরে বারবার একাধিক কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তল্লাশি ও হয়রানির ঘটনায় শাসকদল বিজেপির স্বৈরাচারী মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। আবার নরেন্দ্র মোদির আমলে ধর্মীয় নিপীড়নের সমালোচনা করার পরে সেই স্বৈরাচারী শাসকের রোশের শিকার হয় বিবিসি-ও (BBC News)। শেষ পর্যন্ত সেখানে আয়কর দফতরের (income tax) তল্লাশি চালাতেও দ্বিধা করেনি মোদি সরকার। যেখানে আন্তর্জাতিক মানের সংবাদ সংস্থাগুলি ভারতে শাসকের রোশ থেকে রেহাই পায়নি, সেখানে জাতীয় স্তরের সংবাদ সংস্থা বা সংবাদ মাধ্যমকে যে ব়্যাডারে বারবার রাখা হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
ভারতে সাংবাদিকদের পরিস্থিতি যে স্বৈরাচারী শাসকের অধীনে শোষিত, তার প্রমাণ এই সমীক্ষা। যে চিনে নাগরিক স্বাধীনতা থেকে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা (press freedom) নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয় ভারতের শাসকরা, সেই চিনের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে ভারত। চিন রয়েছে ১৮০ টি দেশের মধ্যে ১৭৮ তম স্থানে। কিম জং উনের উত্তর কোরিয়ার বাস্তব ছবির প্রতিফলন হয়েছে তাদের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাতেও। তাদের অবস্থান ১৭৯-এ। আমেরিকার অবস্থান ৬৪ নম্বরে হলেও ২০২৬-এর সমীক্ষায় (press freedom index) তারা নেমে গিয়েছে ৭টি স্থান। ২০২৫ সালে আমেরিকা ৫৭-তে থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের এই অধঃপতন।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রথম দিকে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলি। সেখানে এশিয়া থেকে তলার দিয়ে রয়েছে পাকিস্তান, যাদের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫৩-তে। বাংলাদেশ রয়েছে ১৫২-তে। মহম্মদ ইউনূস পরবর্তী তারিক রহমান (Tarique Rahman) জমানাতে অবনতির দিকে বাংলাদেশ, ১৪৯ থেকে তাদের অবস্থান নেমে গিয়েছে। সেখানে সদ্য পালাবদল হওয়া বলেন্দ্র শাহর (Balendra Shah) জমানায় নেপালের অবস্থান ৮৭-তে। দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাও ১৩৪ নম্বরে। অর্থাৎ ভারতের সব কটি বড় প্রতিবেশী দেশই ভারতের থেকে এগিয়ে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায়।

এই সমীক্ষায় মূলত দেখা হয়েছে সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের আইনি সহযোগিতা কোন দেশে কেমন। কোন দেশ সাংবাদিকদের পক্ষে কতটা ভালো আইন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সেই বিচারেই প্রথম স্থানে নরওয়ে। টানা ১০ বছর ধরে তারা এই স্থান ধরে রেখেছে। আর ভারতের পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, কীভাবে সংবাদ মাধ্যমকে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের প্রচারের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে এসেছেন, সেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় (press security) কোনও আইন প্রণয়নই করেননি। এমনকি যে আইন রয়েছে তাকেও ভেঙেচুরে কার্যত সাংবাদিকদেরই বিপক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : ২৯ কিমি সাঁতরে পার! পক প্রণালী পেরিয়ে বিশ্বরেকর্ড রাঁচির ঈশাঙ্কের

সেই সঙ্গে এই সমীক্ষা চালানো হয় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আদৌ সাংবাদিকদের কাজ করার মতো রয়েছে কি না, তার ভিত্তিতে। দেখা হয় সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমগুলির আর্থিক পরিস্থিতি কেমন। চলতি এক বছরে নিরাপত্তার (press security) দিকটি ভারতীয় সাংবাদিক ও সংবাদ সংস্থাগুলির জন্য এতটাই কমে গিয়েছে,যা বিশ্ব সংবাদ মাধ্যম স্বাধীনতার তালিকায় ক্রমশ ১৫১ থেকে ১৫৭-তে পাঠিয়ে দিয়েছে ভারতকে। ঠিক একই হারে যে সাংবাদিকরা অর্থনৈতিকভাবেও দুর্বল হয়েছে, তারও প্রমাণ বহন করে চলতি বছরের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স। এই ৩ মে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার দিবসে তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভারতে সাংবাদিকদের বাস্তব অবস্থানের এই তথ্য।

–
–
–
