রবীন্দ্রতীর্থের সান্ধ্য আসরে চাঁদের হাট। সমাজসেবা এবং বিশ্ব শান্তি প্রসারের ধারাকে কুর্নিশ জানাতে শহর কলকাতায় বসেছিল ‘আন্তর্জাতিক বুদ্ধ শান্তি পুরস্কার ২০২৬’-এর বর্ণাঢ্য আসর। মৈত্রী পিস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত নিউ টাউনের এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানটি অবশ্য শুধু কৃতিদের সংবর্ধনাতেই সীমাবদ্ধ রইল না, তা হয়ে উঠল রাজ্যের নতুন শাসনব্যবস্থার প্রথম এক মাসের খতিয়ান ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা পেশের অন্যতম মঞ্চ। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টদের উপস্থিতিতে এই বিশেষ সভার মূল আকর্ষণ ছিলেন রাজ্যের নবনিযুক্ত পঞ্চায়েত, কৃষি বিপণন ও প্রাণিসম্পদ বিকাশ মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এবং সদ্য নির্বাচিত বিধায়করা। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, মানবিক কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি বাংলায় শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই আয়োজনের লক্ষ্য। আর সেই মঞ্চকে হাতিয়ার করেই এদিন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা থেকে শিল্পায়ন— একাধিক ইস্যুতে বার্তা দিলেন মন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন থেকে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের অরাজকতা ও দুর্নীতির অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করেন দিলীপ ঘোষ। বর্তমান সরকারের এক মাসের কাজের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ বার্তা দেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দিলীপ ঘোষ বলেন, গত ৫০ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন ছিল না, বরং শাসকের আইন চলত। বিগত ১৫ বছরের কু-অভ্যাস রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে মানুষ যে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব বর্তমান সরকার সুচারুরূপে পালন করতে বদ্ধপরিকর। তিনি দাবি করেন, দেশে আইন বলে যে কিছু আছে, তা রাজ্যের মানুষ প্রায় ভুলতে বসেছিলেন। আইন ভাঙাটাই যেখানে রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল, সেখানে এখন পুলিশ প্রশাসনকেও সবার আগে আইন মেনে চলার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরজি কর কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি পুলিশ প্রশাসনের একাংশের সমালোচনা করে বলেন, আইন আড়াল করার বা অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বর্তমান সরকার কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। ইতিপূর্বেই আরজি করের ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে তিনজন সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। যারা আইনকে পদদলিত করতে চাইবে, নতুন ব্যবস্থায় তাদের কোনো স্থান নেই।

রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও নারী সুরক্ষার বিষয়ে জোর দিয়ে মন্ত্রী জানান, বিগত ১৫ বছরে রাজ্যে ৭ থেকে ৭০ বছরের কোনো নারীই সুরক্ষিত ছিলেন না। সেই সমস্ত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একজন মহিলা পুলিশ অফিসারের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতে যারা রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করেছেন, এখন সাধারণ মানুষই তাদের জবাব দিচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে একই সাথে তিনি সতর্ক করে বলেন, আইন সবার জন্য সমান। কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন।

রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং যুব সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দিলীপ ঘোষ বলেন, কাজের খোঁজে রাজ্যের প্রায় ৫০ লক্ষ যুবককে বাইরে চলে যেতে হয়েছে। টাটাদের বিদায় দেওয়ার পর থেকে বাংলায় শিল্প পরিস্থিতি শূন্য হয়ে পড়েছিল। পরিযায়ী শ্রমিকদের আমরা বাংলায় ফিরিয়ে এনে এখানেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। তিনি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, এখন থেকে রাজ্যে ব্যবসা করতে গেলে আর কোনো তোলাবাজি বা সিন্ডিকেট রাজের মুখোমুখি হতে হবে না। ইট-বালি-সিমেন্ট কেনা থেকে শুরু করে ব্যবসার সমস্ত সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীরা স্বাধীনভাবে নিতে পারবেন। কোনো দাদাগিরি সহ্য করা হবে না।

রাজ্যের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কলকাতায় নতুন এয়ারপোর্ট তৈরির পাশাপাশি খড়গপুরের কলাইকুন্ডা বিমানঘাঁটিকে সিভিলিয়ান বা সাধারণ যাত্রীদের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জাতীয় সড়ক, রেল ও জলপথের আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাজ্যকে ব্যবসার এক আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকেই দেশ-বিদেশ থেকে বহু শিল্পপতি বাংলায় হাসপাতাল, বিমা ও নতুন শিল্প গড়ার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে তিনি জানান। আগামীকাল থেকেই এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার রূপরেখা আরও স্পষ্ট হবে।

আরও পড়ুন- প্রয়াত সাংবাদিক নারায়ণ বসু

_
_
_
_
