সেই নিখোঁজ মানুষটি

প্রীতিময় চক্রবর্তী

৪ অগস্ট ১৯৭১। প্রায় মধ্যরাত। দক্ষিণ কলকাতার রাজা বসন্ত রায় রোডে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে লালবাজারের কর্তা দেবী রায়ের নেতৃত্বে সাদা পোশাকে এক পুলিশ দলের আচম্বিত আবির্ভাব। এ ঘর সে ঘর দেখে ভেতরের এক ঘরে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকা ভদ্রলোককে দেখিয়ে দেবী রায়ের প্রশ্ন, ‘ইনি কে?’ দেবীপ্রসাদবাবুর উত্তর, ‘আমার মামা’। দেবী রায় ডাকলেন, ‘মামা।’ ভদ্রলোক সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, ডাক শুনে মুখ ঘুরিয়ে চাইলেন। দেবী রায় ওনার দিকে তাকিয়ে সামান্য সৌজন্যের হাসি হেসে ঘর থেকে যখন বেরিয়ে যেতে উদ্যত তখনই তাঁর নজরে পড়ল ভদ্রলোকের ডান বাজুতে হাতঘড়ি বাঁধা। আবারও ঘুরে তিনি ভদ্রলোকের খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। ইতিমধ্যে ভদ্রলোক উঠে খাটে বসেছেন। এবার দেবী রায় আর এক মুহূর্ত সময় খরচ না করে ভদ্রলোককে বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে চলুন।’

সেই নিকষ কালো মধ্যরাতে নিকটবর্তী রবীন্দ্রসরোবরের প্যাঁচারাও তাদের ডাক ভুলেছে। কলম যখন তরবারি, তখন তরবারি দিয়েই কাটতে হয় কলমধারী। এই তো শাসকের রীতি।

আর এক মুহূর্ত কাল বিলম্ব না করে, কলমধারী শশাঙ্ক ওরফে সরোজ দত্তকে নিয়ে দেবী রায়ের দল সোজা চলে গেল টালিগঞ্জে পুলিশের গোপন টর্চার চেম্বার ‘রিট্রিট’এ। তখন রাত প্রায় দেড়টা। তারপর কী হয়েছিল কেউ জানে না।

ভোর সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ বাংলার মহানায়ক উত্তমকুমার তখন ময়দান চত্বরে মর্নিং ওয়াক করতে আসতেন নিয়মিত। ৫ অগস্ট ভোরবেলা মর্নিং ওয়াকে এসে দেখলেন, ধুতি-পাঞ্জাবী পরিহিত এক বিধ্বস্ত মাঝবয়সী ভদ্রলোককে পুলিশ ভ্যান থেকে নামিয়ে হেঁটে এগিয়ে যেতে বলল। তিনি যেই এগোলেন, পুলিশ পিছন থেকে গুলি করল। লুটিয়ে পড়লেন তিনি। তারপর ধড় থেকে মুণ্ডুটিকে আলাদা করে পুলিশ ভ্যানে তুলে চলে গেল।

মহানায়ক দেখলেন, ভদ্রলোকের ডান বাজুতে হাতঘড়ি বাঁধা।

স্তম্ভিত উত্তমকুমার সেদিনই টালিগঞ্জ পাড়ায় শুটিং’এ এসে স্টুডিওতে কিছু লোকজনকে ঘটনাটি বললেন। আগুনের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল। পরদিন দৈনিক ‘হিন্দুস্থান টাইমস’ উত্তমকুমারকে উদ্ধৃত করে খবরটি ছোট করে প্রকাশও করল। তৎক্ষণাৎ তৎকালীন যুব নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় উত্তমকুমারকে প্রাণনাশের ধমকি দিয়ে বোম্বাই পাঠিয়ে দিলেন।

আজ ৫ অগস্ট ২০১৯। আজও পুলিশের খাতায় সরোজ দত্ত নিখোঁজ।