কাঁচের বাটি চাপা কাশ্মীর দৃশ্যত শান্ত

চাণক্য চৌধুরি

স্পেশাল স্ট্যাটাস হারিয়েছে। রাজ্য ভেঙ্গে দু’টুকরো হয়েছে। রাজ্যের প্রথম সারির নেতারা বন্দি বা গৃহবন্দি। হাজার হাজার সেনা কার্যত ঘিরে রেখেছে ভূস্বর্গ। উপত্যকাজুড়ে 144 ধারা। কেমন আছে জম্মু-কাশ্মীর ?

ডোভালের দাবি, উপত্যকা শান্ত এবং স্বাভাবিক। আর গোটা দুনিয়ার সংবাদমাধ্যমের দাবি, ভূ-স্বর্গ এখন কাঁচের বাটির ঘেরাটোপে। দূর থেকে সব দেখা যাচ্ছে, কিন্তু শোনা যাচ্ছে না টুঁ শব্দও। শোনা যাবেই বা কীভাবে? উপত্যকা এখন বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। রবিবার রাত থেকে বন্ধ ভূ-স্বর্গের ইন্টারনেট এবং মোবাইল পরিষেবা। সরকারি ঘোষনা এইটুকু হলেও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় ব্রডব্যান্ড, কেবল, ল্যান্ডফোন সংযোগও। আপডেট করার প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলি 48 ঘন্টা আগের খবরাখবর নিয়েই নাড়াচাড়া করে চলেছে। কাশ্মীর কার্যত অবরুদ্ধ। কেউ জানেনা কবে কাঁচের বাটির ঘোমটা সরিয়ে স্বাভাবিক হবে উপত্যকা।
জাতীয় সংবাদমাধ্যম মঙ্গলবার সকাল থেকে যা বলছে তাতে উপত্যকার প্রকৃত ছবি কিছুই উঠে আসছে না। হয় 24 ঘন্টা আগের খবর অথবা কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা, টক শো। একাধিক জাতীয় সংবাদ মাধ্যম কাশ্মীরে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে, কিন্তু তাঁরা শ্রীনগরের বাইরে পা রাখতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে, কাশ্মীরের টাটকা খবর আসার সব পথ তালাবন্ধ। তাই পুরনো অভিজ্ঞতা আর ছিটকে আসা দু-একটা খবরের টুকরো দিয়েই দিনভর চলছে কাশ্মীরের গত 24 ঘন্টার হাল-হকিকত। কাশ্মীরের প্রধান দলগুলির শীর্ষনেতাদের আটকে রাখা হয়েছে অজ্ঞাত কোনও নির্জনে। নেতা-নেত্রীহীন দলগুলি ফলে বিভ্রান্ত। এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত ওই দলগুলির মেজো-সেজো-ছোটো নেতারা বুঝতেই পারছেন না। তাই 370 বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে রাজ্যের কোথাও কোনও মিছিল-মিটিংয়েরও খবর নেই। এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের 24 ঘন্টাতেও যদি কাশ্মীরের পথে মিছিল-পিকেটিং দেখা না যায়, তাহলে তো অজিত ডোভাল বলতেই পারেন, পরিস্থিতি শান্ত এবং স্বাভাবিক। তার মাঝেই মঙ্গলবার সংবাদ মাধ্যমে হদিশ মিলেছে ফারুক আবদুল্লার। সংবাদ মাধ্যমে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে “আমাকেও গৃহবন্দি করা হয়েছিল।আমি দরজা ভেঙে বাইরে এসেছি”। অমিত শাহ অবশ্য এই দাবি উড়িয়ে বলেছেন, “ফারুক আবদুল্লাকে বন্দি বা গৃহবন্দি করাই হয়নি। তিনি তো মুক্তই আছেন। উনি যা বলতে চাইছেন, তা অসত্য”। উপত্যকার ‘ব্রেকিং’ খবর একমাত্র দিয়ে চলেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। নিরাপত্তা উপদেষ্টা দিল্লিকে জানিয়েছেন, “জম্মু কাশ্মীরের পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক। 370 ধারা বিলোপ করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন কাশ্মীরের মানুষ। চারধারে কোনও অশান্তি-বিক্ষোভ নেই”।
কিন্তু স্থানীয় মানুষের বক্তব্য, সব ধরনের পরিষেবা বন্ধ করে জোর করে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। সব ধরনের পরিষেবা বন্ধ। জরুরি কাজকর্মও বিঘ্নিত হচ্ছে। ভারতের অন্যান্য স্থানে থাকা কাশ্মীরিরা তাঁদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না যেমন, তেমনই কাশ্মীরে থাকা মানুষরাও অন্যত্র ছড়িয়ে থাকা স্বজনের খোঁজ নিতে পারছেন না।
ডোভালের দাবি তাই অনেকটাই ঠিক। কারন, কাঁচের বাটির তলায় দেখা এই জম্মু-কাশ্মীর আপাত শান্ত। কিন্তু এ শান্তি কসমেটিক। এখনও পর্যন্ত ভূ-স্বর্গের মাটি থেকে শান্তির বাণী শোনা যায়নি। এই না শুনতে পাওয়ার বাধা যত দ্রুত সরানো যাবে, তত দ্রুতই হাজারো গুজবের বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারবে কাশ্মীর। তাই কাশ্মীরবাসী চাইছেন, সব পরিষেবা দ্রুত চালু হোক।