Monday, January 12, 2026

হয়তো এই শেষ নববর্ষ!

Date:

Share post:

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক

আমাদের সেই পুরোনো কলকাতায় হালখাতার ছোট ছোট দোকানগুলো। চুল কাটার সেলুন। রেশন থেকে তুলে আনা গম ভাঙানোর ঘুম ঘুম দোকানগুলো। মুড়ি-তেলেভাজার দোকান। পাঁউরুটি-বিস্কুট মেম খায় কুটকুট সাহেব বলে ভেরি গুডের দোকান। আমাদের রাস্তাছোঁয়া মেজেনাইন ফ্ল্যাটের ঠিক নীচে তারাপদবাবু স্যাকরার দোকান। বাড়ির সামনেই ছোট্ট লেদ মেশিনের কারখানা, যেখানে বারো কি পনেরো জন মিস্ত্রি কাজ করে, আর কী যেন সব তৈরী করে মেশিনে। আমাদের নিতাইদার সাইকেল সারানোর দোকান, যেখান থেকে সাইকেল ভাড়া করে চালাতে শিখেছিলাম।
ওদিকে মানিকতলা বাজার — তার ভেতরে আর বাইরে নানারকম দোকান। ছোটবেলার ফুটবল-ক্রিকেট খেলার বন্ধু কার্তিক পাল। সেখানে ওদের চিঁড়ে-বেসন-মুড়কি-ছোলাভাজার দোকানে এখন বসে ওর বাবা মারা যাওয়ার পরে। স্কটিশ স্কুলের আর এক বন্ধু যাঁর সঙ্গে বুট পরে স্কুলের লিগে খেলতাম, সেই স্বপন সাহাদের কাঠচেরাইয়ের কল। ক্রিকেট খেলার রাইভ্যাল অসিত দাশ, সরোজ দাশদের মিষ্টির দোকান যুগিপাড়ায়। এই প্রত্যেকটা দোকানে পয়লা বৈশাখ নববর্ষ হালখাতার কলাগাছ, দেবদারু পাতা আর শোলার কদম ফুল দিয়ে সাজানো গণেশ পুজো এখনও পরিষ্কার মনে আছে। যেন এই সেদিনের কথা।
কর্পোরেট আমেরিকার নিষ্ঠুর, মানবতা-ধ্বংসকারী অর্থনীতি ভারত প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করার পর এসব দোকানের অনেকগুলোই আস্তে আস্তে এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেছে। এবারে বাকিগুলোও যাবে। আমাদের কলকাতার বইপাড়া কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলোও চলে যাবে। বিশাল হাউসগুলো যাবে না। বড় বড় সোনার গয়নার দোকান, সুপারমার্কেট, মল উঠে যাবে না।
ছোট ছোট রাস্তার দোকানগুলো শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে বৈঠকখানা বাজারের বই বাঁধানোর দোকানগুলো। যাবে হ্যারিসন রোডের ট্রামলাইনের ধারের বিয়ে আর অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণ কার্ডের দোকানগুলো। চলে যাবে শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের মুখে বসা পরোটা, রুটি আর আলুর দমের সরু কাঠের বেঞ্চি পাতা দোকানগুলো।
শেষ হয়ে যাবে মঙ্গলবার বসা হাওড়ার মংলাহাট, রবীন্দ্রসেতুর ঠিক নীচে বসা ফুলের বাজার, বালিগঞ্জে রেল ব্রিজের তলায় চট পেতে বসা সন্ধের আবছা আলোয় গ্রামের দিদিদের লাউ, কুমড়ো, মোচা, জামরুল, থানকুনি পাতা বিক্রির পসরা। কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি নিয়ে কলকাতার বাজারে আর আসবে না। বংশীবদন না খেতে পেয়ে মরবে। ভাগ্নে মদন হারিয়ে যাবে কোথায়।
আরও কত দোকান, আরও কত ব্যবসা। আমার বন্ধুরাই অনেকে সেসব ব্যবসা গড়ে তুলেছে নিজের হাতে। যতটা পেরেছে সৎভাবে ব্যবসা করেছে এই দুর্নীতির যুগেও। চেষ্টা করেছে, কীভাবে গরিব কর্মচারীদের বিপদে আপদে তাঁদের পাশে থাকা যায়। এই নববর্ষের পরে আর তারা পারবে বলে মনে হয় না।
তাই বলছি “হয়তো এই শেষ নববর্ষ।” আমার জীবন সামনের পয়লা বৈশাখ পর্যন্ত থাকবে কি না, সেটা বড় কথা নয়। আমার দেশটা, আমার বাংলা দেশটা, আমার চেনা দুঃখ চেনা সুখ চেনা চেনা হাসিমুখের কলকাতা শহরটা থাকবে কি না, সেটা অনেক বড় প্রশ্ন এই ১৪২৭ বাংলা সনের বৈশাখে।
আজকের করোনাভাইরাস সঙ্কট হয়তো এক মাস, দু মাস, কিংবা তিন মাস পরে একটু কমবে। মানুষ হয়তো আবার একটু একটু করে রাস্তায় বেরোবে। বাচ্চারা স্কুলে যাবে। প্রেমিক প্রেমিকারা লেকের ধারে, কলেজ ক্যাম্পাসে, কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের আসরে আবার একবার যাবে। হাত ধরবে। কিংবা …
এমনও হতে পারে, এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার “অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয়তা” — আর্জেন্ট নেসেসিটি দেখিয়ে শাসকশ্রেণী রবীন্দ্রজয়ন্তী, সভা সমাবেশ, মিটিং মিছিল, নাট্যোৎসব, চলচ্চিত্র সপ্তাহ, পৌষ মেলা, বারোয়ারি দোল দুর্গোৎসব, ঈদের মেলামেশা — সবকিছুই একটু একটু করে নিষিদ্ধ করে দেবে। শাসকযন্ত্রের মিডিয়া হিন্দিতে চব্বিশ ঘণ্টা প্রচার করবে, বাঙালিরা কেন রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল মেলা, বাউল গানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না।
সেখানে একটাই মুখ প্রতিদিন দেখা যাবে — সেই জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসের বিগ ব্রাদারের মতো। আমরা সকলেই শাসকশ্রেণী এবং তাদের মিডিয়া প্রোপাগাণ্ডা নিঃশর্তে মেনে নেব। যে মানবে না, তার জন্যে নানা ব্যবস্থা থাকবে।
“এই হয়তো শেষ নববর্ষ” আমাদের, বাঙালি জাতির। বাংলাদেশে একরকম। পশ্চিমবঙ্গে আর এক রকম।

spot_img

Related articles

আইন রক্ষায় নিহত বাবা, তাঁরই ছেলে প্রতারণায় জেলে!

দু’দশক আগে এক বর্ষবরণের রাতে তিলোত্তমার বিবেক জাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এক অপরিচিতা তরুণীর সম্মান বাঁচাতে মদ্যপ সহকর্মীদের সামনে...

IND vs NZ: নতুন বছরে বিরাটের ব্যাটিং বিক্রম, জয়ের মধ্যেও থাকল উদ্বেগের ছায়া

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম একদিনের ম্যাচে ৪ উইকেটে জিতল ভারত। ২০২৫ সালেযেখানে শেষ করেছিলেন ২০২৬ সাল সেখান থেকেই শুরু...

সোমে মিলনমেলায় ডিজিটাল যোদ্ধাদের সঙ্গে বৈঠকে অভিষেক

বাংলা বহিরাগত জমিদারদের হাতে অপমানিত, লাঞ্ছিত। সেই বাংলাবিরোধীদের মিথ্যা ও অপপ্রচারের মোকাবিলায় তৃণমূল ময়দানে নামিয়েছে ডিজিটাল যোদ্ধাদের। ডিজিটাল...

অনুপ্রবেশকারী খুঁজবে AI! নির্বাচনে নতুন গ্যাঁড়াকল শিণ্ডে-ফড়নবিশ জোটের

ভোটের আগে ফের মাথা চাড়া দিচ্ছে মানুষের উপর নজরদারি আর হয়রানির রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নতুন অ্যাপ ব্যবহার...