কাদের ব্যর্থতায় ‘গোষ্ঠী সংক্রমণ’ ছাড়াই আক্রান্তের ঢল? কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

বিভ্রান্তিকর৷ ‘গোষ্ঠী সংক্রমণ’ কি গোপন করা হচ্ছে ?

একদিকে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক রবিবার অর্থাৎ ১৪ জুন, সকালে জানিয়েছে, ভারতে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৯,১৯৫ জন৷ গত ২৪ ঘণ্টায় ৩১১ জনের করোনায় মৃত‍্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ‍্যাতেও নয়া রেকর্ড গড়েছে৷ স্বাস্থ‍্যমন্ত্রকের সর্বশেষ হিসেব বলছে, ভারতে মোট করোনা আক্রান্ত ৩,২০,৯২২ জন৷ ২৪ ঘন্টায় নতুন আক্রান্ত হয়েছেন ১১,৯২৯ জন। গত কয়েকদিন ধরেই দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের উপর৷ করোনা সংক্রমণে প্রাণহানির নিরিখে গোটা বিশ্বে ভারত এখন নবম স্থানে৷

অন্যদিকে, ICMR বারবার দাবি করেই চলেছে, এখনও ভারতে করোনার গোষ্ঠী সংক্রমণ হয়নি৷

প্রশ্ন উঠছে, ‘গোষ্ঠী সংক্রমণ’ ছাড়াই সংক্রমণ এভাবে ছড়াচ্ছে কেন ? ব্যর্থতা কার ? কাদের ? গোষ্ঠী সংক্রমণ না হওয়া সত্ত্বেও যদি করোনা ভারতে এই সর্বগ্রাসী চেহারা নেয়, তাহলে এটা নিশ্চিত করোনা-যুদ্ধের কৌশলেই গলদ আছে৷ এটা ঠিক এই ভাইরাস সহজে নিশ্চিহ্ন হবেনা, কিন্তু কোন পথে লড়াই চালালে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে, কেন্দ্রের সেই স্ট্র্যাটেজি কতদূর কার্যকর, তা নিয়ে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠছে দেশজুড়ে৷ ভারতের করোনা- পরিসংখ্যান ভয় ধরানোর। উদ্বেগ বাড়তে বাধ্য। প্রায় প্রতি দিনই শীর্ষে থাকা কোনও না কোনও দেশকে টপকে করোনা আক্রান্তের তালিকায় উপরে উঠে যাচ্ছে ভারত।
ফলে প্রশ্ন উঠবেই, করোনা নিয়ন্ত্রণে চরমতম ব্যর্থতা ঢাকতেই কি কেন্দ্র এ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করছে ? কেন্দ্র কি মুখরক্ষা করতেই স্বীকার করছে না ভারতে
গোষ্ঠী সংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি ? যদি তাই হয়, তাহলে দেশবাসীকে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি থাকতেই হবে ৷
উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করে যুদ্ধে নামলে রুখে দেওয়া সম্ভব কমিউনিটি ট্রান্সমিশন৷ বিশ্বের বহু দেশ সফল হয়েছে গোষ্ঠী সংক্রমণ রুখে দিতে৷ সঠিক সময়ে, সঠিক উপায়ে যুদ্ধে নামা যায়নি বলেই হয়তো ভারত রুখতে পারেনি এই কমিউনিটি ট্রান্সমিশন৷

ICMR যতই দাবি করুক দেশে গোষ্ঠী সংক্রমণ এখনও ঘটেনি, তা মানতে নারাজ মহামারি- বিশেষজ্ঞরা৷ তাঁরা বলছেন, ICMR- এর দাবি বাস্তবসম্মত নয়। ভারতে জবরদস্তভাবে গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হয়েছে বলেই আক্রান্তের সংখ্যা এভাবে লাফিয়ে বাড়ছে। এখানেই শেষ নয়, বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ইতিমধ্যেই দেশের নির্দিষ্ট কিছু প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সে কারনেই দেশের ৫-৬ রাজ্য এবং মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই, আমেদাবাদ, সুরাত, পুণে, ইন্দোরের মতো শহরে লাগামছাড়া হয়েছে করোনা’র প্রকোপ৷ যে বিশেষজ্ঞ টিম এই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেই টিমে আছেন দিল্লি AIIMS-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর এম সি মিশ্র। তিনি বলছেন, “নিশ্চিতভাবেই ভারতে গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে লকডাউন তুলে দেওয়ার ফলে তা আরও দ্রুত ছড়াচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এমন এমন অঞ্চলে করোনা আক্রান্তের খবর মিলছে যেখানে আগে কোনও সংক্রমণই ছিল না। এটা হচ্ছে কীভাবে, তা জানার চেষ্টা কে করছে ? এখন দেশবাসীকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে৷”

ওদিকে, সাংবাদমাধ্যমে ICMR- এর ডিরেক্টর বলরাম ভার্গব বলেছেন, ভারতে এখনও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি।

অনেকেরই খেয়াল থাকবে, প্রায় দু-মাস আগে প্রথমবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল৷ গত ২৮ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক জানায়, দেশে ‘নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠী সংক্রমণ’ শুরু হয়ে গিয়েছে। ৯ এপ্রিল ICMR এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রকের গবেষকরা একটি রিসার্চ পেপার প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয়, “দেশের ১৫ রাজ্যের ৩৬ জেলায় গোষ্ঠী-সংক্রমণের ইঙ্গিত মিলছে। টাস্ক ফোর্স তখন জানায়, এপ্রিল মাসে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ১০২ জনের মধ্যে ৪০ জনের করোনা ধরা পড়ে। তাঁদের কারও বিদেশযাত্রার ইতিহাস নেই, বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শেও তাঁরা আসেননি। তবুও কীভাবে তারা করোনা আক্রান্ত হলেন, এটা ভাবার বিষয় “৷

এতকিছুর পরেও তাহলে আজ কেন গোষ্ঠী-সংক্রমণের তত্ত্ব ICMR খারিজ করে দিচ্ছে?

‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ একটি টেকনিক্যাল-টার্ম৷ কোথা থেকে সংক্রমণের সূত্রপাত তা বোঝা না গেলে তাকে সাধারণভাবে ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ বলা হয়৷ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মোকাবিলা করা কঠিন৷ সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা কাজ করেনা৷

‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’-এর কথা কেবলমাত্র কেন্দ্রই ঘোষণা করতে পারে।
দেশের করোনা-পরিস্থিতি ক্রমশই খারাপ হচ্ছে৷ সংক্রমণ যে দেশে আরও জটিল আকার ধারণ করছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই৷ পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তার মোকাবিলা করার জন্য মোদি সরকার কি আদৌ প্রস্তুত ? হাসপাতাল, নমুনা পরীক্ষার পরিকাঠামো, চিকিৎসা ব্যবস্থা কতখানি আছে অথবা আদৌ আছে কি’না, তা নিয়ে গভীর ভাবনার সময় সম্ভবত দেশ পার করে দিয়েছে৷ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে, জ্ঞান দেওয়া ছাড়া, প্রকৃত লড়াই কীভাবে চলবে, তা এখনও বোঝা যাচ্ছেনা কেন্দ্রের ভাবগতিক দেখে৷ এ ধরনের কাছাখোলা পরিস্থিতিতে ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’- এর ঘোষণা করা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ৷

অপরিনত পরিকাঠামোকে সম্বল করে ‘গোষ্ঠী সংক্রমণ’ -এর কথা কেন্দ্র কিছুতেই স্বীকার করবে না৷
অথচ, আত্মসন্তুষ্টিতে না ভুগে, সত্যিটা সহজেই সামনে আনতে পারে কেন্দ্র৷ দেশবাসীকে বাস্তবটা জানানো দরকার৷ তাহলেই তো করোনার প্রকৃত মোকাবিলা সম্ভব হবে।

সে পথ এড়িয়ে ভারতকে ছক কষেই কি গভীরতম অতলে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ?