ইশারা সঙ্কেতে এপারের গরু দিব্যি ভাসছে জলে! ঘুরতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু(পড়ুন- গরু), তর্কে বহু দূর! আসলে কাজ চলে ইশারায়। লেখা হয় সঙ্কেতে। এ দিক থেকে গরু যায়। ওদিক থেকে আসে চিরকুট, টাকা। এই চোরাপাচারেও বিশ্বাসের কদর আকাশচুম্বি ।
গরু নিয়ে সারা দেশ জুড়ে হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার। কেউ গরুর গলায় মালা দিতে গিয়ে কসরত করছেন। কেউ আবার ভক্তিভরে প্রণাম করছেন। চর্চায় ব্যস্ত নিন্দুকেরাও। নেতাদের সৌজন্যে প্রায়দিনই গরুর ছবিও দেখা যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমে।
তবে এ সব নিয়ে একেবারেই ভাবার সময় নেই ওদের। ওরা মানে ওসমান, জাব্বার, ফড়িং, মুক্তেশরা। ওরা জানে, আর পাঁচটা ব্যবসার মতো এটাও একটা ব্যবসা। তাই ওদের স্পষ্ট কথা, এত ভাবলে চলে না। নদীর বাঁকটা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলেই কাজ শেষ। তবে এই পুলিশ ও বিএসএফও একেবারে ছিনে জোঁকের মতো লেগে থাকে ।
যদিও পাচারকারী শব্দটায় ঘোর আপত্তি ওদের । ওরা বলে, পাচারকারী আবার কী, বলুন ব্যবসায়ী। বিএসএফ ও পুলিশের দাবি, পাচার আগের চেয়ে অনেক কমেছে। কিন্তু একেবারে বন্ধও হয়নি। পুলিশ ও বিএসএফ সতর্ক থাকে। তক্কে তক্কে থাকে পাচারকারীরাও। ফলে পাচার চলে তার নিজের নিয়মে। নতুন ছন্দে, নতুন নতুন পদ্ধতিতে !
এ দেশের গরু ও দেশে যাবে। ও দেশ থেকে আসবে একটা আটপৌরে কাগজ। সেই কাগজ যাবে নির্দিষ্ট লোকের কাছে। সেখানে সে কাগজ দেখালে মিলবে টাকা। কোনও ‘বাউন্স’ নেই। লিঙ্ক ফেলিওরের ব্যামো নেই। শুধু আছে বিশ্বাস।
মাঝেমধ্যেই পুলিশ কিংবা বিএসএফের ফাঁদে ‘পাখি’ পড়ে। হাতে আসে ভাঁজ করে রাখা মলিন কাগজ। সে কাগজ যেন তাদের কাছে জানের থেকেও প্রিয়। হাতছাড়া হলেই সব শেষ। কিন্তু ওই যে বলে পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা! তাই চমকে-ধমকে সে কাগজ বেরোয়। অত্যন্ত খারাপ হস্তাক্ষরে যা লেখা থাকে তার মানে উদ্ধার করতে পুলিশেরও কালঘাম ছুটে যায়। এক পুলিশ আধিকারিক বলেছেন, কাগজে লেখা আছে পেপসি তিরিশটা…! বহু কষ্টে জানা গিয়েছে পেপসি মানে গরু। এ সব গরু-মোষ বাংলাদেশে কার কাছে যাবে তা-ও লেখা থাকে সেই চিরকুটে। সেখানেও জট। কারও নাম লেখা নেই। আঁকা আছে কোকিল, ফড়িং কিংবা জবা ফুলের ছবি। কোকিল থাকলে পাচারকারীদের এক জন যে কি না ভাল গান গায়। জবা মানে জাব্বার শেখ। আর ফড়িং মানে রোগাপাতলা কেউ যার আসল নাম হয়তো ফরজ বা বিমল।
সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় জড়ো করে রাখা হয় গরু। তৈরি থাকে রাখালেরা। তারা রীতিমতো দৌড়ে ওস্তাদ। আর বর্ষার পাচারে বড় আড়াল পাট। সীমান্তে পাটচাষ হবে কি, হবে না— তা নিয়ে ফি বছর বিএসএফ ও স্থানীয় চাষিদের মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলে। তার পরেও পাটচাষ একেবারে বন্ধ করা যায়নি। মানুষ সমান ঘন পাটের মধ্যে দিয়ে গরু নিয়ে চলে গেলে দূর থেকে বোঝার কোনও উপায় থাকে না। পরের দিন অবশ্য খেতের চেহারা দেখে চোখ কপালে ওঠে চাষির।  কখনও কখনও পাট জমি থেকে না উঠতেই বহু জমির পাট পাচারকারীরা কিনে নেয়। দামও দেয় গড়ে বিঘা প্রতি দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা। সেই পাট জাঁক দেওয়া হয় পদ্মায়। জাঁকে ভাল করে মাটি, খড় দিয়ে কষে বাঁধা হয় একটু ছোট সাইজের গরু। রাতের অন্ধকারে সেই জাঁক দেড় থেকে দু’কিলোমিটার ভাসিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা মিত। বিশেষ পদ্ধতিতে কলার ভেলা তৈরি করা হয়। গরু থাকে জলের নীচে। মুখটুকু জেগে থাকে ভেলার মাঝে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কলাগাছ ভেসে যাচ্ছে। ফলে জলে গেল মানে সবসময় যে ক্ষতি হয়ে গেল, এমনটা ভাবার কারণ নেই।
এখন তো করোনার দৌলতে বাংলাদেশের বাজার খারাপ।
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দাবি , নদীর জলে ভাসিয়ে রোজ রাতে শয়ে শয়ে গরু পাচার চলছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজেলায় হাটে ভারতীয় গরু বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে। ফলে বাংলাদেশের খামার ব্যবসায়ীরা গরুর দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। নিশ্চয়ই ভাবছেন , কী করে বোঝা যাচ্ছে কোনটা ভারতের আর কোনটা বাংলাদেশের গরু! জানা গিয়েছে, চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাটে পাঠানো ভারতীয় গরুগুলির গায়ে বিশেষ চিহ্ন থাকছে। সেই চিহ্ন থাকা অবস্থাতেই প্রকাশ্যে গরু বিক্রি চলছে। এমনকী ট্রাক বোঝাই করেও শয়ে শয়ে ভারতীয় গরু প্রত্যেক দিন বিভিন্ন হাটে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী ও সদর উপজেলার জলপথে মূলত চোরাকারবার চলছে বলে অভিযোগ
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে।
নজরদারিতে কোনও ঢিলেমি না থাকলেও বর্ষায় নদ-নদীতে জল বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। কোরবানি ঈদের আগে বাংলাদেশের কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানানো হয়েছে । হাটে বিক্রির আগে এসব গরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনও ব্যবস্থা থাকছে না। ফলে ঝুঁকিও রয়েছে। তবু এই ঝুঁকি নিয়েই রমরম করে চলছে গরুর হাতবদল।