চার লাইনের চিঠিতে তাতল দার্জিলিং, ফের প্রাসঙ্গিক বিমল গুরুং

কিশোর সাহা

আর পাঁচটা মিটিংয়ের চিঠি যেমন হয় তেমনই। মাত্র চার লাইনের একটা চিঠি। তাতেই তেতে উঠল দার্জিলিং পাহাড়ের সব রাজনৈতিক শিবির। এবং ফেরার থেকেও পাহাড়ে ফের অতিমাত্রায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেন বিমল গুরুং, রোশন গিরিরা।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে চিঠিটি দেওয়া হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব দার্জিলিঙের গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ)-এর নানা ব্যাপার নিয়ে ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় বসতে চান। সেখানে রাজ্য, জিটিএ এবং গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। আগামী ৭ অগাস্ট, বেলা তিনটেয় নতুন দিল্লির নর্থ ব্লকের ১১৯ নম্বর ঘরে। সেই আপাত নিরীহ চিঠির জোরেই যেন দার্জিলিং পাহাড়ে ফের বিমল গুরুং-রোশন গিরিদের প্রাসঙ্গিক করে দিল কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

পাহাড়ের আলোচনায় এটা উঠে আসছে যে, গুছিয়ে, হিসেব করেই চিঠিটা পাঠানো হয়েছে। না হলে চিঠি পাঠানোর পরে রাজ্যের তরফে নবান্ন থেকে কিংবা জিটিএ-র পক্ষ থেকে অনীত থাপা, বিনয় তামাংরা কিছু বলার আগেই রোশন গিরি অন্তরাল থেকে প্রেস বিবৃতি দেবেন কেন! রোশন জানিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু তাদের দাবি গোর্খাল্যান্ড এবং সেই প্রশ্নে পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান তাই তা নিয়ে আলোচনা হলেই তাঁরা যাবেন। আগামী ৭ অগাস্টের আলোচনার বিষয় জিটিএ। তাই তাঁরা বা তাঁদের প্রতিনিধি কেউ সেখানে যাবেন না। কারণ, তাঁরা জিটিএ থেকে অনেক আগেই পদত্যাগ করেছেন।

অর্থাৎ, রোশন যা বলেছেন তাতে, কেন্দ্রের ডাকা ওই প্রশাসনিক বৈঠকে মোর্চার তরফে যদি বিনয় তামাং, অনীত থাপারা যান তা হলে তাঁরা পাহাড়ের গোর্খাল্যান্ডপন্থীদের প্রশ্নের মুখে পড়বেন। আর এটা কে না জানে, স্থায়ী পাহাড়বাসীদের সিংহভাগই গোর্খাল্যান্ডের বিরোধিতাকারীদের তীব্র অপছন্দ করে থাকেন। তাই তো ছোট রাজ্যের মতাবলম্বী বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে সেই আবেগকে সামনে রেখে অনায়াসে পাহাড়ের লোকসভা আসনটি দখল করে নিচ্ছে। কোনও সংগঠন ছাড়াই। ফলে, অনীত, বিনয়দেরও ওই বৈঠক এড়ানোর কথা ভাবতে হচ্ছে।

অবশ্য চিঠি পাঠানোর অনেক আগে সলতে পাকানো শুরু হয়। গত ২২ জুলাই রোশন গিরিদের পক্ষে দাবি করা হয়, তাঁদের প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে দার্জিলিং পাহাড়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকার আর্জি জানিয়েছেন। সেই দাবি নিয়ে চাপানউতোর শুরু হয় পাহাড়ে। কেউ বলেন, মিথ্য কথা। কারও মতে, সত্যি।

ঘটনাচক্রে, ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে জিটিএ নিয়ে ওই চার লাইনের চিঠি পাঠানো হয় নবান্নে, দার্জিলিংয়ের জেলাশাসকের কাছে ও জিটিএ-র দফতরেও। চিঠিতেই দার্জিলিংয়ের ডিএমকে বলা হয়েছে, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিনিধিদের মিটিংয়ে থাকার জন্য জানিয়ে দিতে হবে।

প্রয়াত সুবাস ঘিসিংয়ের দল জিএনএলএফের কয়েকজন নেতা জানান, কেন্দ্রের চিঠিতে ডিএমকে মোর্চার নেতাদের জানানোর নির্দেশ দেওয়াটাই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখন মোর্চার চেয়ারম্যান হিসেবে বিনয় তামাং ও সহ সভাপতি হিসেবে অনীত থাপাকেই সামনে রাখেন তাঁদের অনুগামীরা। যা কি না বিমল গুরুং, রোশন গিরির লোকজনরা একেবারেই মানতে নারাজ। এমনকী, গত লোকসভা ভোটে বিনয় তামাংরা সরাসরি তৃণমূলের হয়ে প্রচারে নামলেও গুরুংপন্থীরা আড়াল থেকে এমন ঝড় তুলে দিয়েছিলেন যে বিজেপি রেকর্ড ব্যবধান নিয়ে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছে।

প্রশ্নটা হল, এখন যদি মোর্চার প্রতিনিধিদের ডাকতে হয় তা হলে ডিএমের পক্ষ থেকে বিনয় তামাংদেরই বলতে হবে। তাহলে পরে যদি বিমল গুরুংরা কোনও নথিপত্র সামনে এনে দাবি করেন, তাঁরাই আসল মোর্চা তখন জেলা প্রশাসনের তরফে কী জবাব দেওয়া হবে! এমনিতেই মোর্চার দুটি শিবিরই নানা সময়ে নির্বাচন কমিশনের কাছেও চিঠি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ডিএমকেও সাবধানী পদক্ষেপ করতে হবে।
মেপে পা ফেলছে পাহাড়ের তৃণমূলও। বাম-কংগ্রেস শিবির এখন নীরব। কারণ, এই মুহূর্তে পাহাড়ে তারা প্রায় অস্তিত্বহীন। কেউ চাইছেন, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকটা হোক। সেখানে কে বা কারা যায় সেটা দেখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হবে। আবার কেউ চাইছেন, করোনা পরিস্থিতিতে ওই বৈঠক আপাতত স্থগিত করে দেওয়া হোক। জিএনএলএফ তো একধাপ এগিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, তারাও বিজেপিকে সমর্থন করেছিল গত লোকসভায়, তাই পাহাড়ের সমস্যার সমাধান নিয়ে কোনও বৈঠক হলে তাঁদেরও ডাকতে হবে।

গোপন ডেরায় বসে পাহাড়ের রাজনীতিতে ফের প্রাসঙ্গিক হতে পেরে নিশ্চয়ই আত্মতৃপ্তিতে হাসছেন বিমল গুরুং। হয়তো বিজেপি নেতাদের কাছেও ভূরিভূরি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন তাঁকে আলোচনার শিরোনামে ফের তুলে আনার জন্য।
কিন্তু, পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য করে দেওয়া হবে এমন কোনও ঘোষণা বিজেপির পক্ষ থেকে কখনও করা হচ্ছে না। হয়তো হবেও না। কারণ, তাতে রাজ্যের বিধানসভা দখলের স্বপ্ন চিরতরে হাতছাড়া হতে পারে।
তাই আপাতত যা ভীষণ প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে তা কিন্তু রাজনীতির জাঁতাকলে চিরতরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতেই পারে।