ব্রিগেড এড়ালেন কেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা? কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

এমন ‘বিপাকে’ তিনি আগে পড়েননি৷

বাংলার বামেরা আপাতত কংগ্রেসের ‘বন্ধু’৷ এই বন্ধুত্বে সিলমোহরও লাগিয়েছে দিল্লি৷ শুধু বন্ধু নয়, ‘পরম-মিত্র’৷ হাত আর হাতুড়ি একজোট হয়ে এবং যৌথভাবে আব্বাস সিদ্দিকির ‘দোয়া’ নিয়ে এ রাজ্যে হারাতে চায় একুশের ভোটের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ তৃণমূল এবং বিজেপিকে৷

কিন্তু কেরলের ছবি ঠিক উল্টো৷ কেরলের বামেরা ‘ভয়ঙ্কর’ শত্রু কংগ্রেসের৷ ওখানে এই বন্ধুত্বের লেশমাত্র নেই৷ কেরলে বামেদের হারিয়েই ক্ষমতা দখল করতে চাইছে কংগ্রেস ৷

২০১৬-তেও অবশ্য কং-বাম জোট হয়েছিলো বাংলায়৷ কিন্তু তখন এমন জটেও তিনি ফাঁসেননি৷ তখন ছিলেন ‘মুক্তপুরুষ’৷ কেরলের সঙ্গে এভাবে ‘সহ-বাস’ করতে হয়নি৷ তাই ২০১৬-র ২৭ এপ্রিল ২০১৬ পার্ক সার্কাস ময়দানে কংগ্রেসের তৎকালীন সহ- সভাপতিকে এক মঞ্চে দেখা গিয়েছিলো রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে৷ ২০১৬ সালে কৌশলগত কারণে সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরি পার্ক সার্কাসের সভা এড়িয়ে গিয়েছিলেন৷ আর এবার, ২০২১-এ ‘অন্য ধরনের’ কৌশলগত কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেড সমাবেশ এড়িয়ে গেলেন তিনি৷ তিনি মানে রাহুল গান্ধী৷ এআইসিসি’র প্রাক্তণ সভাপতি৷ সব অঙ্ক ঠিকঠাক থাকলে তিনিই ফের ওই পদে ফিরছেন৷ এবার বড়ই বিপাকে এই কংগ্রেস সাংসদ৷

না, কোনও আদর্শগত কারনে নয়, স্রেফ নিজের লোকসভা কেন্দ্রে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখতেই এবার আর ব্রিগেডমুখী হলেন না রাহুল৷ তিনি এখন কেরল থেকে নির্বাচিত সাংসদ৷ এজন্য অবশ্য দায়ী সেই বিজেপি- ই৷ ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির স্মৃতি ইরানির কাছে প্রায় ৫৫ হাজার ভোটে হেরে যান রাহুল গান্ধী ৷ সৌভাগ্যবশত দ্বিতীয় একটি কেন্দ্রেও প্রাথী ছিলেন তিনি৷ উত্তরপ্রদেশের আমেথির পাশাপাশি কেরলের ওয়ানাড় লোকসভা কেন্দ্র থেকেও লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন রাহুল গান্ধী৷ ওই কেন্দ্রে জয়ী হয়েই তিনি এখন সাংসদ৷
ওই কেরলে বিধানসভা নির্বাচন হবে বাংলার সঙ্গেই৷ কংগ্রেস হাই কম্যাণ্ডের এবার ধারনা হয়েছে, কেরলে এবার ক্ষমতায় আসবে কংগ্রেস৷ কেরল থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী, ওই রাজ্যে কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বামেদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কলকাতায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলে, কেরলে তাঁর এতটুকু বিশ্বাসযোগ্যতাও আর থাকবেনা৷ এটা হাড়ে হাড়ে বুঝেই রাহুল গান্ধী সম্ভবত বাংলায় এসে কং-বাম যৌথমঞ্চে উঠতে নারাজ৷ গোটাটাই ব্যক্তিগত,এর মধ্যে কোনও ব্যস্ততা বা নীতি-আদর্শ নেই৷

ব্রিগেডে রাহুল গান্ধী না হয় ব্যক্তিগত কারনে এলেন না,কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেডে কংগ্রেসের ‘মুখ’ কে? বাংলার রাজনীতিতে একটা ব্রিগেড সমাবেশের মূল্য এখনও আছে৷ ইচ্ছা থাকলেও এই মুহুর্তে এককভাবে কংগ্রেসের ব্রিগেড ডাকা কার্যত অসম্ভব৷ বামেদের অবস্থাও একই রকম৷ তাই দু’তরফ একে অপরের পিঠ চাপড়ে একসঙ্গে নেমেছে ব্রিগেড সফল করতে৷ কিন্তু প্রশ্ন একটাই, ব্রিগেডে কংগ্রেসের ‘মুখ’-কে ? সোনিয়াজি অসুস্থ৷ তাঁর পক্ষে আসা সম্ভব নয়৷ সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী নেই, তিনি উত্তর প্রদেশে বিরাট ব্যস্ত, রাহুল গান্ধী তো নেই-ই৷ তাহলে রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী- সমর্থকদের বাড়তি অক্সিজেন যোগাবেন কে ? পাল্টা প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন, প্রদেশ কংগ্রেসের নেতারাই তো যথেষ্ট ? হাইকম্যাণ্ডের শীর্ষনেতাদের আসা কি বাধ্যতামূলক?

এটা নেহাতই অবান্তর প্রশ্ন৷ বিধানসভা ভোটের মুখে ‘মিলিজুলি’ ব্রিগেড সমাবেশ করছে কংগ্রেস, আর সেখানে গোটা গান্ধী-পরিবার গরহাজির থাকবেন কেন ? প্রদেশস্তরের নেতাদের ভাষণ তো বাংলার মানুষ রোজই শোনেন, শুনবেনও৷ ব্রিগেড সমাবেশেও তাঁদের কথাই শুনতে হবে ? জানা নেই, তবে হয়তো দিল্লি থেকে জনাকয়েক ‘জাতীয়’ নেতাকে পাঠানো হবে ভাষণ দিতে৷ আপাতত শোনা যাচ্ছে ছত্রিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল, রাজ্যসভায় যার বিদায়বেলায় নরেন্দ্র মোদি চোখের জল ফেলেছেন, সেই গোলাম নবি আজাদ, মল্লিকার্জুন খাড়গের নাম৷

কিন্তু তাঁরা কতখানি প্রাসঙ্গিক এ রাজ্যে ? দিল্লির ওই সব তথাকথিত ‘ওজনদার’ নেতাদের থেকে বঙ্গ- রাজনীতিতে অনেক অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক এবং বিশ্বাসযোগ্য জেলাস্তরের ‘ডেডিকেটেড’
কংগ্রেস নেতারা৷ যারা শত সুযোগ এবং প্রলোভন উপেক্ষা করে আজও বাংলায় কংগ্রেস পতাকা বহন করে চলেছেন৷ তাই বাংলায় ন্যূনতম প্রভাব নাথাকা দিল্লির ওই সব কাগুজে নেতারা এসে কংগ্রেস বা জোটের ক’টা ভোট বাড়াবেন ?

ব্রিগেডে কে বা কারা হবেন কংগ্রেসের মুখ, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এখনও ব্যর্থ প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। রাহুল বা প্রিয়াঙ্কা, কেউই আসছেন না৷ দলের তরফে বক্তা ঠিক করতে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে প্রদেশ কংগ্রেস৷ তবে এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে, প্রবীন দু-একজন নেতা পাঠিয়ে দায় এড়াবে হাইকম্যাণ্ড৷ কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন, কেন আসবেন না, প্রিয়াঙ্কা বা রাহুল গান্ধী ? তার জবাব নেই বিধান ভবনের কাছে৷ যান্ত্রিকভাবে প্রদেশ নেতারা বলেই যাচ্ছেন, ‘ওই দু’জনই বড্ড ব্যস্ত ৷ পরে আসবেন’৷ এতই ব্যস্ত যে প্লেনে চেপে ৫ ঘন্টার জন্য কলকাতায় এলে উত্তর প্রদেশ এবং কেরল কংগ্রেসের ‘হাতছাড়া’ হয়ে যাবে৷

এসব কোনও যুক্তিই নয়৷ আসলে, রাহুল কেরলের সাংসদ৷ কেরালায় বামেদের উপড়ে ফেলার ডাক দিচ্ছেন যে রাহুল গান্ধী, সেই তিনিই বাংলায় এসে বামের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালে, কেরলের কংগ্রেসিরা তা কখনই মেনে নেবেন না৷ একঘরে হবেন রাহুল৷ কেরলে কংগ্রেসকে জেতানোর দায় রাহুলেরও৷ তাছাড়া ওই রাজ্যে কংগ্রেস বাংলার তুলনায় ভালো অবস্থায় ৷ এআইসিসি জানে, বাংলায় কংগ্রেসের জেতার সম্ভাবনা বড়ই ক্ষীণ৷ বলা ভালো তৃতীয় হওয়ার সুযোগও সীমিত৷ তাহলে এখানে এসে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা তাঁদের অমূল্য সময় এবং ভাবমূর্তি নষ্ট করবেন কেন ? প্রদেশ নেতারা এখনও মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বটে, কিন্তু এবারের কংগ্রেসের ব্রিগেড ‘গান্ধী’-হীন হওয়ার আশঙ্কাই বেশি৷

তবে এখনও সময় আছে, প্রদেশ কংগ্রেস একবার ট্রাই করতে পারেন বাংলা থেকে নির্বাচিত রাজ্যসভার কংগ্রেস সাংসদ তথা কংগ্রেসের ‘সর্বভারতীয়’ নেতা ও মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি’কে৷ আগামী ২০২৪-এর ২ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলার সাংসদ ৷

বাংলার রাজনীতি, প্রশাসন, জোট ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁর ধারনা অসীম৷ কোন লক্ষ্যে কং-বাম জোট হয়েছে, ব্রিগেড- মঞ্চে দাঁড়িয়ে তা বিশদে বুঝিয়ে বলতে পারতেন কংগ্রেস সাংসদ সিংভি ৷

বাংলার গ্রাম-শহরে এখনও যে সব নেতা-কর্মী নিঃস্বার্থভাবে, প্রলোভন উপেক্ষা করে দলের জন্য কান্না- ঘাম-রক্ত দিয়েই চলেছেন, যারা আজও কোনও প্রত্যাশা না করে নীরবে কংগ্রেস প্রতীকে ভোট দিয়ে চলেছেন, তাদের সঙ্গে এআইসিসি এবং গান্ধী পরিবার স্পষ্টতই অবিচার করছে৷ অবিচার শব্দের বদলে ‘বেইমানি’ শব্দটি ব্যবহার করলেও ভুল কিছু হবে না৷

আরও পড়ুন- চালু হচ্ছে এনজেপি-ঢাকা ‘ননস্টপ’ রেল পরিষেবা, কবে থেকে জানুন

Advt