‘হংসধ্বনি’,  উৎপল সিনহার কলম

উৎপল সিনহা

যেও না দাঁড়াও বন্ধু
আরো বলো কুকথা
হংসপাখায় পাঁক লাগে কি
সরস্বতীর আসন যেথা…

অথবা,

হংসপাখা দিয়ে
নামটি তোমার লিখি…

এইসব কালজয়ী গান সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালির বুকের ভিতরে জেগে আছে ও থাকবে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু, ধান ভানতে শিবের গীত কেন? আমাদের আলোচ‍্য বিষয় তো’ হংসধ্বনি ‘। ‘ হংস ‘ তো নয়। আসলে ‘ হংসধ্বনি ‘ উচ্চারণ করলেই কিংবা কথাটা ভাবলেই ‘ হংস ‘ শব্দটা আগে চলে আসছে। আগে হংস, পরে ধ্বনি। আর, মহাজন মাত্রেই জানেন ‘ হংস ‘ শব্দটা খুব নিরীহ বা সাধারণ নয়। এটি ভিন্নার্থক, ব‍্যঞ্জনাময় ও অভিজাত। এক একটা শব্দ আছে অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন। গান, কবিতা, নাটক তথা সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক শিক্ষিত বাঙালি চিরকালই শব্দের হাত ধরে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে। একটা শব্দ, একটা মাত্র নির্দিষ্ট ও বিশেষ শব্দই তাদের বর্তমান, ভূত ও ভবিষ্যতের নানা অভিমুখে মানসভ্রমণের আহ্বান জানাতে পারে এবং সেই তীব্র আকর্ষক আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে না একাধারে নষ্টালজিক ও ভ্রমণপিপাসু বাঙালি।

‘… মন মোর হংসবলাকার পাখায় যায় উড়ে
ক্কচিৎ ক্কচিৎ চকিত তড়িত-আলোকে। ‘
( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

‘ মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম… ‘
( নজরুল ইসলাম )

রবি ঠাকুর ও নজরুল সাহেব ছুঁয়ে এবার পন্ডিত কুমার গন্ধর্বের গাওয়া অনবদ্য ভজনে চোখ রাখা যাক।

‘ উড় যায়েগা হংস আকেলা
জগ দর্শন কা মেলা… ‘

আশ্চর্য গায়কীর এই ভজনটি শুনলে মুহূর্তেই মন দার্শনিক হয়ে ওঠে। মনে এক অবর্ণনীয় ভাবের উদয় হয়।

হংস অতিক্রম করে হংসধ্বনিতে যাওয়া খুব সহজ নয়। জলে থাকে অথচ জল লাগে না গায়ে! পাঁক ঘাঁটলেও পাঁক লাগে না পাখায়! এ কি কোনো সহজ ব‍্যাপার? নিজেকে কতটা শুদ্ধ রাখলে তবে সরস্বতীর আসন হওয়া যায়? সারদা-সুরেশ্বরীর বাহন হওয়ার অসীম গৌরব অর্জন করেছে যে পরমহংস প্রাণীটি, তাকে সহজে এড়িয়ে যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা? শিক্ষা,শিষ্টাচার, শালীনতা, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি, এককথায় সমগ্র সারস্বত সমাজের ভার বহন করে চলেছে শ্বেতশুভ্র আপাতনির্লিপ্ত যে প্রাণীটি, জলেস্থলে শান্তির পতাকা উড়িয়ে পবিত্রতার সুরসঞ্চার করে চলেছে যে ক্লান্তিহীন আশ্চর্য প্রাণীটি, সে তো প্রায় অনতিক্রম‍্য!

এবার আসা যাক হংসধ্বনি-তে । এটি দক্ষিণ ভারতীয় একটি রাগ। কর্ণাটকজাত। উত্তর ভারতীয় রাগ সঙ্গীতেও এটি অতি সুপরিচিত ও জনপ্রিয়। এই রাগটি বিলাবল ঠাটের অন্তর্গত। জাতি ঔড়ব- ঔড়ব।
বাদী সা। সম্বাদী পা। রাতের রাগ। পকড় পা গা রেসা নি রেসা। এর সম-প্রকৃতির রাগ শংকরা। তবে, রাগ শংকরার সাথে এই রাগের বিশেষ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় ধৈবত ব‍্যবহারের বিচারে।

উস্তাদ আমীর খান সাহেবের কন্ঠে যাঁরা হংসধ্বনি শুনেছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অবিস্মরণীয়। তবে, শিক্ষিত ও সঙ্গীতে দীক্ষিত সিনেমাপ্রেমী বাঙালি শ্রোতাদের কাছে হংসধ্বনি বললেই অনিবার্যভাবে চলে আসে অনিল চট্টোপাধ্যায় ও সুপ্রিয়াদেবীর অসামান্য অভিনয়সমৃদ্ধ কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী ছবি মেঘে ঢাকা তারা। শক্তিপদ রাজগুরুর মূল কাহিনী অবলম্বনে এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন আরেক কিংবদন্তি মৃণাল সেন। সঙ্গীত নির্দেশনায় ছিলেন জ‍্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও অনিল চন্দ্র সেনগুপ্ত।

কিছুতেই ভোলা যায় না মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে ব‍্যবহৃত পণ্ডিত এ টি কাননের গাওয়া
( অনিল চট্টোপাধ্যায়ের লিপ-এ ) সেই অবিস্মরণীয় বন্দিশ : লাগি লগন পতি সখি সন / পরম সুখ অতি আনন্দন…
এই বন্দিশের রচয়িতা আমান আলি খান, যিনি মুম্বাইয়ের ভেন্ডিবাজার ঘরানার এক সঙ্গীতশিল্পী, ১৯৫৩ সালে প্রয়াত হন। বন্দিশটির সংক্ষিপ্ত মূল অর্থ : আমি আমার প্রভু ও বন্ধুদের নিয়ে আনন্দ অনুভব করছি।
১৯৪৭- এর ভারত ভাগের পর একটি শরনার্থী পরিবার আশ্রয় নেয় কলকাতার এক প্রান্তে। মেঘে ঢাকা তারা ছবির মূল চরিত্র নীতা নামের একটি মেয়ে। ভাই, বোন, দাদা, মা ও বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে নীতার সংসার বাঁচানোর প্রাণপন লড়াই। তারই মধ‍্যে স্বপ্নও দেখে সে নিজের প্রেমিককে নিয়ে ঘর বাঁধার। আর, দাদা শংকর, যার সংসারে মন নেই, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা করে, বড় গায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সে যখনই গেয়ে ওঠে ‘ লাগি লগন পতি সখি সন… ‘, অমনি যেন বিশ্বসংসারে আনন্দের বান ডাকে। অভাব অনটনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে থাকা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ও কালো মেঘে আচ্ছন্ন মনে সহসা যেন ঠিকরে ঠিকরে পড়তে থাকে রাশি রাশি ঝলমলে রৌদ্রকণা।
ওহ্! কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ,/ দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ—/ সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে, / তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
লাগি লগন গাইলেই যেন শাখে শাখে পাখি ডেকে ওঠে,
ডালে ডালে ফুল ফোটে।
কি অতুল ঐশ্বর্য এই বন্দিশটির, আর কি অন্তহীন বৈভব ও জাদুকরী ক্ষমতা এই হংসধ্বনির!
‘ রঞ্জয়তি ইতি রাগ ‘, স্বরলহরী দ্বারা মনকে রঞ্জিত করলে তাকে রাগ বলা হয়। হংসধ্বনি যার দিব‍্য উদাহরণ।

‘ বাস্তব ও অবাস্তবের মাঝখানে একটি সুক্ষ্ম পর্দা রয়েছে ব’লে অনুমিত হয়। সত‍্যদ্রষ্টা কবিগণ সে পর্দার নাম দিয়েছেন মায়াবী পর্দা।

মাঝেমাঝেই, কোনও এক পরম মুহূর্তে কোন্ এক খেয়ালের বশে সে মায়াবী পর্দাটি নিজে থেকেই দুলে ওঠে। মানুষ তার সমস্ত সুখভোগের পরে উন্মুখ হয়ে থাকে কখন সেই মায়াবী পর্দাটি দুলে উঠবে। মানুষ অবশ‍্য তীব্র সাধনায় নিজে থেকে পর্দাটি ক্ষণিকের জন্য হলেও সরিয়ে দিতে পারে, ক্ষণিকের জন‍্য দেখতে পায় দুই জগতের মধ‍্যখানের এক অলীক-ঝিলিক পরাবাস্তবতা। তবে সেজন‍্য তার প্রয়োজন হয় সাধন-মাধ‍্যমের। এক্ষেত্রে ভারতীয় রাগসঙ্গীত একটি শ্রেষ্ঠ মাধ‍্যম এবং রাগ হংসধ্বনি সেই কাঙ্খিত অলীক-ঝিলিক পরাবাস্তবতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর জন‍্য প্রয়োজন শ্রোতার গভীর অভিনিবেশ ও তন্ময়তা। ‘

‘ হংসধ্বনি রাগের নামকরণ নিয়ে গবেষণা চলতে থাকুক, তবে, আমার মনে হয় রাগটি গাওয়ার সময়কাল যদিও রাত্রি, তবুও রাগটির পরিবেশনায় প্রগাঢ় এক বৈকালিক আবহ যেন খুঁজে পাওয়া যায়, যখন নিস্তব্ধ জলাভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যায় ঝাঁক ঝাঁক হাঁস গোধূলি লগ্নের চরাচরের স্তব্ধতাকে ভেঙেচুরে… রাগ হংসধ্বনি সেই রকমই কিছু বলে। ‘
( ইমন জুবাই- এর লেখা থেকে )
কেউ কেউ বলেন হংসধ্বনি নামের সঙ্গে গমকের সম্পর্কও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন- “মমতাদির উপর আস্থা রাখুন, সরকার আপনাদের শত্রু নয়”, চাকরিপ্রার্থীদের অবস্থান মঞ্চে বার্তা কুণালের

উপসংহারে আবার ফিরে আসা যাক মেঘে ঢাকা তারা ছবিটিতে। শেষ পর্যন্ত কী হোলো নীতা ( সুপ্রিয়া দেবী ) ও শংকরের ( অনিল চট্টোপাধ্যায় )? অনেক ঘটনা দুর্ঘটনা পার হয়ে নীতা অসুস্থ হয়ে পড়ে, শরীর ভেঙে যায় তার, যক্ষ্মা হয়, তবু সে হাল ছাড়ে না পরিবারের। শংকর পুরোদস্তুর ক্ল‍‍্যাসিকাল গায়ক হয়ে ফিরে আসে মুম্বাই থেকে। বোনের অসুস্থতায় সে উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হয়। আর, জীবন-মৃত‍্যুর দোলাচলে বিধ্বস্ত নীতা শংকরকে আঁকড়ে ধ’রে বেঁচে থাকার আকুল আর্তি জানায়, দাদা, আমি বাঁচতে চাই দাদা… সেই মর্মন্তুদ বেদনাঘন আর্তি শুনে পৃথিবীর আহ্নিক গতিও কয়েক মুহুর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু, নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা দাদাকে দেখে দর্শকদের বারবার মনে হতে থাকে নীতা কিছুতেই মরবে না, নীতা মরতে পারে না,কেননা দাদার অন্তরে রয়েছে মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার মন্ত্র, দাদার কন্ঠে রয়েছে মৃতসঞ্জীবনীসুধা, যার নাম হংসধ্বনি।

Previous articleBreakfast Sports: ব্রেকফাস্ট স্পোর্টস