Tuesday, April 7, 2026

বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারের কীর্তি, বিশ্বে প্রথম মহালয়ার ইংরেজি সংস্করণ নিয়ে উন্মাদনা !

Date:

Share post:

চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়

শরতের আকাশে যখন সাদা মেঘের আনাগোনা, আকাশে বাতাসে পুজো পুজো গন্ধ। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে মাতৃপক্ষের সূচনা হয়। মহালয়ার মাধ্যমে বাঙালি মহিষাসুরমর্দিনীর সেই সুর সেই গন্ধ মেখেই দুর্গাপুজোর আনন্দে মেতে ওঠে ‌। একদিকে সূর্য জানান দেয়, নতুন দিনের ভোর আসছে । আর অন্যদিকে আকাশবাণীর সুরে ভেসে ওঠে সেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র পাঠ। যেন আমাদের জানিয়ে দেয়, ওঠো জাগ্রত হও, পূজো এসে গেছে।

আরও পড়ুনঃ পুজোয় বাংলা বৃষ্টিহীন! রাজ্যবাসীকে সুখবর দিচ্ছে হাওয়া অফিস

আর সেই অমর সৃষ্টিকে সর্বজনীন করতে বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে তাকে বিশ্বায়ন ঘটিয়েছেন যিনি, তার নাম সুপ্রিয় সেনগুপ্ত।
কেন এমন একটি উদ্যোগ ? এই প্রশ্নের উত্তরে সুপ্রিয়র স্পষ্ট জবাব, বাঙালি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ বা এই দেশে নয় বাঙালি বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। আর সেই প্রবাসী বাঙালিদের নতুন প্রজন্ম অনেক ক্ষেত্রেই মহিষাসুরমর্দিনীর রূপ-রস গন্ধ থেকে বঞ্চিত হয় ভাষা সমস্যার কারণে। তাই সেই প্রবাসী বাঙ্গালিদের কাছে মহিষাসুরের মাহাত্ম্য পৌঁছে দিতেই এমন একটি উদ্যোগে আমি শামিল হয়েছি।

আদতে যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা সুপ্রিয়র মনোনে কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি। তাই তাকে কিভাবে ব্যাপ্তি ঘটানো যায় তারই খোঁজ লাগাতেই তার এই পদক্ষেপ।
শিল্পী কিন্তু স্পষ্ট জানিয়েছেন, সুরের কোনও ভাষা নেই। সুর মানুষকে এমনি আকৃষ্ট করে। কিন্তু সমস্যা ভাষার। আমাদের মহিষাসুরমর্দিনী বিদেশীদের কাছে ভালো লাগবে না এমন ভাবার কোনও কারণ নেই, অকপট স্বীকারোক্তি শিল্পীর। যদি তাই হতো তবে ইউনেস্কোর হেরিটেজ সম্মান আজ বাঙালির দুর্গাপুজোর মুকুটে জ্বল জ্বল করত না। তাই বিশ্বব্যাপী মহিষাসুরমর্দিনীর অমর সৃষ্টিকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমার চেষ্টা। আর এই কাজে তার মূল অনুপ্রেরণা জন্মদাত্রী মা ।‌তিনিই তাকে বলেন, যদি মহিষাসুরমর্দিনী নিয়ে অন্যরকম কোনও কাজ করা যায় তবে তা বিশ্বের সব মানুষের কাছে সমাদৃত হবে।
শুধু প্রবাসী বাঙালি নয় যারা বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী তাদের কাছে মহিষাসুরমর্দিনীর এই গন্ধ রূপ রস পৌঁছে দিতেই বাংলা মহিষাসুরমর্দিনীর ইংরেজি সংস্করণ ‌। বাংলা সংস্কৃতিকে ইউনেস্কো যেভাবে সম্মান জানিয়েছে তা আমাদের গর্বিত করে।।
এই মহিষাসুরমর্দিনী যখন আন্তর্জাতিক রূপ পাচ্ছে, তখন এটা প্রবাসী বাঙ্গালীদের কাছে বাংলার সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম উপাদান হিসাবে সমাদৃত হচ্ছে। আত্মবিশ্বাসী শিল্পী বলেন, এমন ক্রিয়েটিভ কাজ নিশ্চয়ই বিশ্বের দরবারে আরও বেশি করে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

শিল্পীর মুখ থেকে শুনুন কী বলছেন তিনি ? সুপ্রিয় বলছেন , প্রথম যখন কাজটা শুরু করি তখন প্রচুর মানুষ আমাকে বলেছিলেন তুমি কী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে নিজেকে এক আসনে বসাতে চাও? তারা বুঝতেই পারেননি যে প্রণম্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের যাতে কোনওরকম অবমাননা না ঘটে সেদিকটা সবার আগে মনে রেখেছি।

কেন নিজে পাঠ করলেন মহিষাসুরমর্দিনী? যা শুনলে অনেকেই বলছেন যে তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে অনুকরণ করেছেন ? এই কথা কিন্তু মানতে রাজি নন শিল্পী ।‌ তার স্পষ্ট কথা, আমি এর মাধ্যমে প্রথিতযশা শিল্পীকে সম্মান জানাতে চেয়েছি । কারণ, তিনি আমার অনুপ্রেরণা। আমি তার দেখানো পথে হাঁটতে চেয়েছি ,তাই এই প্রশ্নটা অবান্তর। তাকে কোনোভাবেই অপমান করা আমার উদ্দেশ্য নয় । আমি শুধু ভাষার গণ্ডিটাকে ভাঙতে চেয়েছি । আজকে যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তাহলে আমি বলতাম এটা তিনি পাঠ করবেন। আমি শুধু বাংলাটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেবো।
প্রথমে আমি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে অনুসরণ করেছি। তারপর কিছুটা অনুকরণ করেছি বলতে পারেন। পাঠের ভঙ্গিটাকে এক রাখার চেষ্টা করেছি । কিন্তু কন্ঠটা আমারই। আমি তার কন্ঠকে কখনো অনুকরণ করার চেষ্টাই করিনি।
তার একান্ত নিজস্ব মতামত , উত্তমকুমারের মহিষাসুরমর্দিনী মানুষ নেয়নি তার কারণ তিনি যে নমনীয় ঢঙে চণ্ডীপাঠ করেছিলেন তা কিন্তু চণ্ডীপাঠের যে রীতি বা ভঙ্গি বা নিজস্বতা তাকে সমর্থন করে না। অথচ বাণীকুমারের লেখা মহিষাসুরমর্দিনী যখন পাঠ করেছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তখন কিন্তু তার সেই চন্ডীপাঠের ভঙ্গি ছিল একেবারে পারফেক্ট । যা মানুষের মনের মনিকোঠায় জায়গা করতে পেরেছে।
এখনও পর্যন্ত আমার এই সৃষ্টি নিয়ে আমি কয়েক লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেতে পেরেছি এবং সেটা ডিজিটাল মাধ্যমকে সম্বল করে। ইউটিউবে ‘কারিগরি কবিয়াল’ এই নামেই তার একটি চ্যানেল আছে। যেখানে অনায়াসে আপনি গিয়ে শুনতে পারেন ইংরেজিতে অনুবাদ করা মহিষাসুরমর্দিনী ।

এই অনুবাদের প্রাথমিক কাজটি করেছেন শিল্পীর স্কুলের শিক্ষক নির্মল চন্দ্র সাহা। তারপর সেই পান্ডুলিপিকে সঠিক মাত্রায় এনে তার এই সৃষ্টিটির সঠিক রূপায়ণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সংযুক্তা চক্রবর্তী, সুবীর চন্দ , অঞ্জন নন্দী এবং প্রবাল চক্রবর্তী, শিল্পীর স্ত্রী জয়শ্রী সেনগুপ্ত এবং আমার দুই কন্যা ঈপ্সিতা ও জ্যোতিষ্মিতা। এদের উৎসাহ এবং সহযোগিতা ছাড়া এই সৃষ্টি কখনোই রূপ পেতো না বলে অকপট স্বীকারোক্তি শিল্পীর।
ইতিমধ্যে এই সৃষ্টি ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ স্বীকৃতি লাভ করেছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ নথিভুক্তর জন্য অপেক্ষার দিন গুনছে মহিষাসুরমর্দিনীর ইংরেজি সংস্করণ।

Related articles

নিজের ‘মতলবের’ জন্য এসেছিলেন: অসমে মোদির চা-পাতা তোলার পর্দাফাঁস অসমের মহিলাদের

যেখানেই যাবেন তাঁর ছবি তোলা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় নায়ক হিসাবে তুলে ধরে সেই ছবি ছড়িয়ে দেওয়াই যে প্রধানমন্ত্রী...

‘ওদের হাতে কমিশন, আমাদের সঙ্গে জনগণ’! রাজ্যকে বিজেপি-শূন্য করার ডাক মমতার 

রাজ্যকে বিজেপি-শূন্য করার ডাক দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার নদিয়ার চাকদহে মশড়া নবপল্লি মাঠের জনসভা থেকে দলনেত্রী বললেন, এবারের...

বুথে বসবে না পোলিং এজেন্ট! সত্যতা ব্যাখ্যা কমিশনের

ভোটার তালিকার পরে নির্বাচনের বুথ নিয়ে জলঘোলা নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন ঘোষণার সময়ই রাজ্যে নির্বাচনী বুথ নিয়ে অনেক আয়োজনের...

১২ বছর পর নিজস্ব রাজধানী পেল অন্ধ্রপ্রদেশ, অমরাবতীই এখন সরকারি কেন্দ্র

সরকারিভাবে অন্ধ্রের রাজধানীর তকমা পেল অমরাবতী। বিভাজনের প্রায় ১২ বছর পর নিজস্ব রাজধানী পেল অন্ধ্রপ্রদেশ। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর...