Thursday, May 14, 2026

‘ মাইলস টু গো ‘, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

‘ মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ ‘ যেন সবারই মনের কথা । এক কবি লেখেন , ‘ দীর্ঘ জীবন কত দুঃখতাপ ‘ , তো আরেক কবি আক্ষেপ করেন , ‘ জীবন এত ছোট কেনে ? ‘ ছোট অথবা বড় যা-ই হোক না কেন , এক জীবনে সব কাজ সেরে ফেলা বড়ই কঠিন। আশি বছর বয়সে পৌঁছেও গৃহস্থের , এমনকি সন্ন্যাসীরও মনে হয় , ‘ কত কাজ বাকি রয়ে গেল ! ‘ তাই ‘ মাইলস টু গো ‘ সর্বজনমান্য বাক্যবন্ধ হিসেবে শাশ্বত হয়ে থাকে।

‘ স্টপিং বাই উডস অন এ স্নোয়ি ইভনিং ‘ কবিতার স্রষ্টা রবার্ট ফ্রস্ট যদি আর একটি কবিতাও না লিখতেন , তবু এই একটি কবিতার জন্যই তিনি অমর হয়ে থাকতেন । ঘন তমসাচ্ছন্ন হিম সন্ধ্যা । এক অশ্বারোহী ( সম্ভবত কবি স্বয়ং ) সহসা ঘোড়া থামালেন গায়ে গায়ে লাগা গাছেদের গা ঘেঁষে । ‘ বন্য বন্য এ অরণ্য ‘ । অমোঘ এর টান । কে উপেক্ষা করতে পারে এমন মধুর হাতছানি ? হাড়হিম রাতে এ কিসের ইশারা ? এ কোন ইঙ্গিত ? ‘ এখনো সময় হয় নি কি ? বন্ধ দুয়ারে বারবার করাঘাত শোন না কি ? ‘ কিসের সঙ্কেত ? এ সব প্রশ্নের কিছুটা উত্তর পাওয়া যায় উত্তরকালের একটি বাংলা কবিতায় । যে কবিতার শিরোনাম ‘ যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো ‘ , কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ।

রবার্ট ফ্রস্ট ছিলেন সেই কবি , পৃথিবীর সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক ছিল অন্তহীন প্রেম ও বিরামহীন কলহের । তিনি বলতেন , ‘ অনুবাদে যা হারিয়ে যায় তা কবিতা । ‘ বলতেন , ‘ অর্ধেক পৃথিবী এমন লোকেদের নিয়ে গঠিত যাদের কিছু বলার আছে অথচ বলতে পারে না এবং বাকি অর্ধেক যাদের বলার কিছু নেই অথচ বলতে থাকে । ‘ তাঁর অবিস্মরণীয় পর্যবেক্ষণ , ‘ কেউ বলে পৃথিবী আগুনে শেষ হবে , কেউ বলে বরফে । ‘

জমাট অন্ধকারে ঢাকা এক শীতসন্ধ্যায় যেতে যেতে একলা পথে ঘোড়সওয়ার হঠাৎ থেমে গেলেন অরণ্যের ধারে । কবি সম্ভবত জানেন কে এই বনের মালিক । কিন্তু ছুটতে ছুটতে হঠাৎ এইভাবে দাঁড়িয়ে পড়ায় খুব অবাক হয়েছে ঘোড়াটি । বন এবং বরফে ঢাকা হ্রদ ছাড়া আর তো কিছুই ঠাহর হয় না । ধারেকাছে নেই কোনো খামারবাড়ি । তবু বছরের এই অন্ধকারতম সন্ধ্যায় সহসা এখানে থেমে যাওয়া কেন ? ঘোড়া মাথা নাড়ায় , ঝাঁকুনিতে বেজে ওঠে গলায় বাঁধা ঘন্টা , এছাড়া শব্দ বলতে তো মৃদুমন্দ বাতাস আর অবিরাম তুষারপাত । তাহলে কি ভুল হচ্ছে কোথাও ? আহা , কি সুন্দর অরণ্য , কী অন্ধকার , কী গভীর ! কবির ঘুম পায় ।

‘ শ্রান্তি লাগে পায়ে পায়ে ‘ , কিন্তু এই আঁধার তরুছায়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার উপায় কোথায় ? এখনও বহু কাজ বাকি । পূরণের অপেক্ষায় বহু প্রতিশ্রুতি । তাই ঘুমোবার আগে পাড়ি দিতে হবে আরও অনেক মাইল পথ ।

রবার্ট লি ফ্রস্ট । আমেরিকান কবি । জন্ম ২৬ মার্চ , ১৮৭৪ । মৃত্যু ২৯ জানুয়ারি , ১৯৬৩ । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হওয়ার আগেই তাঁর লেখা প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ডে । নাট্যকার হিসেবেও তাঁর পরিচয় সুবিদিত । ফ্রস্টই একমাত্র কবি যিনি কবিতার জন্য ৪ টি পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন । তিনি শিক্ষকতা করেছেন , আবার খামারে দীর্ঘদিন কৃষিকাজ করে ব্যর্থও হয়েছেন । তাঁর প্রধান টান ছিল কবিতা । গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতি তাঁর কাব্যের অনিবার্য ছবি এবং তার সঙ্গে মানুষের জটিল সংসার । তাঁর লেখায় একাকার হয়ে আছে ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা , অপরিসীম বেদনাবোধ , সম্পর্কের টানাপোড়েন ও পারিবারিক জীবনের হতাশা ।

অথচ এই কবির ‘ স্টপিং বাই উডস … ‘ কবিতাটি বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান প্রেরণারূপে বিবেচিত হয় । পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর শেষ জীবনের সান্ত্বনা ছিল এই কবিতাটি । রবার্ট ফ্রস্টের প্রথম দিকের কবিতাগুলিতে পাওয়া যায় শরতের পাতাঝরা রঙ ঝলমলে দিন , গ্রীষ্মের সূর্যস্নাত দীর্ঘ দুপুর ও বসন্তের সন্ধিক্ষণে পরিযায়ী পাখিদের ফিরে আসার গল্প । পরের দিকের কবিতাগুলিতে পাওয়া যায় জীবনের নানা রঙের দিনগুলির আনন্দ-বেদনা । তাঁর বৈদগ্ধ ও উপলব্ধি পরবর্তী সময়ে তাঁর কাব্যভাষায় এক অনন্য মাত্রা যোগ করে । ক্রমেই তিনি হয়ে ওঠেন অসামান্য ।‌

নিজের পরিবারের সদস্যদের ঘনঘন মৃত্যুর অভিঘাত কবির বৈদগ্ধে যোগ করেছে দার্শনিক মাত্রা । তীক্ষ্ণ , শানিত করেছে জীবনবোধ । মায়ের মৃত্যু , স্ত্রীর মৃত্যু , এবং সন্তানদের একের পর এক মৃত্যু সহ্য করতে হয়েছে কবিকে । তবু বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান গাওয়ার মতোই রবার্ট ফ্রস্ট কিছুটা নিস্পৃহ , নিরাসক্ত ভঙ্গিতেই যেন ধ্বংসের মধ্যে মাথা তুলে দায়বদ্ধতার নিবিড় বার্তা দিয়ে গেছেন পৃথিবীকে । স্বজনদের মৃত্যু তো উপভোগ অথবা উদযাপন করা যায় না , সেটা সম্ভবও নয় , কিন্তু মৃত্যুও জীবনের একটা পর্বমাত্র , তার বেশি কিছু নয় , তাই মৃত্যু নয় , জীবন নিয়েই ভাবতে হয় , শব্দে শব্দে অক্ষরে অক্ষরে সারাজীবন ধরে রবার্ট ফ্রস্ট যেন দিতে চেয়েছেন এই গূঢ় সঙ্কেত ।

তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ scripsi ‘ – তে ( যার অর্থ what I have written , I have written ) উনি লিখে গেছেন তাঁর অসামান্য পর্যবেক্ষণ , যার বাংলা অনুবাদ হতে পারে কিছুটা এইরকম , ‘ আত্মা সময়ের বিভেদমুক্ত , জানি মৃত্যু নিশ্চিত , তাই আমাকে যদি আমার নিজের শোকগাথা লিখতে হয় তাহলে আমি ছোট্ট একটি সংবাদ রেখে যাবো : আমার প্রস্তর ফলক বলবে , আমি প্রেম করেছি পৃথিবীর সঙ্গে , কলহ-ও ।

আরও পড়ুন- মুম্বই সফরে এবার বিগ-বি’র আমন্ত্রণে অমিতাভ-জয়ার বাড়িতে মমতা

Related articles

সাসপেন্ড দমকল আধিকারিক: তিলজলার ঘটনায় কর্পোরেশনকে নোটিশ, জানালেন অগ্নিমিত্রা

তিলজলার আগুনের ঘটনায় একের পর এক পদক্ষেপ বর্তমান রাজ্য সরকারের। বুধবারই ভাঙা শুরু হয়েছে বাড়ি। জমা পড়েছে দমকল...

টলিউডে ক্ষমতার পালাবদল: চার বিধায়ককে দায়িত্ব দিলেন শুভেন্দু

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক ঝাঁক কৃতি তারকা এবার বিজেপির বিধায়ক হিসাবে রাজ্যে জায়গা করে নিয়েছেন। সেই সময়ই টলিউডে...

মজাদার চ্যালেঞ্জে ‘মুচমুচে’ প্রমাণ, বিশ্বের সেরা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজের দাবি ওয়াও মোমোর

ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে কে না ভালোবাসে! কিন্তু গরম প্যাকেট খোলার কিছুক্ষণ পরেই তা নেতিয়ে গেলে মন খারাপ হওয়াটাই...

পাঁচ টাকায় এবার মাছে-ভাতে বাঙালি, আমজনতার পাতে বড় চমক রাজ্যের 

বাঙালির পাতে এবার শুধু ডিম নয়, জায়গা করে নিতে চলেছে মাছও। রাজ্য সরকারের নতুন পরিকল্পনায় এবার মাত্র পাঁচ...