Sunday, May 3, 2026

‘উপভোগ্য হেঁয়ালি’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

‘ যে সবাইকে খারাপ ভাবে সে সবার চেয়ে খারাপ । ‘সত্যিই কি তাই ? সবাইকে খারাপ ভাবার মৌলিক অধিকার তো সবারই আছে । সবাইকে ভালো ভাবার স্বাধীনতাও সকলেরই আছে । অতএব অন্যদের খারাপ ভাবলেই নিজেরও খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তেমন আছে কি ? ঠিক তেমনি এর উল্টোদিকটাও ভাবতে হবে । যে সবাইকে খারাপ ভাবছে , সে আসলে সবার খারাপ দিকটাই দেখতে পাচ্ছে , ভালো দিকগুলো দেখতে পাচ্ছে না । তার মানে , তার নজর খারাপ দিকেই । কথায় আছে , শকুন যত উঁচুতেই উড়ুক না কেন তার নজর ভাগাড়ের দিকে । অতএব , যে মানুষের ভালো দিকগুলো দেখার ক্ষমতা যে হারিয়ে ফেলেছে , খারাপ দিকগুলো ছাড়া আর কিছু যে দেখতে পায় না , সে নিজেও অবশ্যই খারাপ অথবা নেতিবাচক ভাবনায় পরিচালিত মানুষ সবকিছুর মধ্যেই খারাপ দেখে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে , নেতিবাচক চিন্তায় প্রভাবিত মানুষের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে শূন্য ।

কথায় কথা বাড়ে । আবার , রাম খটাখট ঘ্যাচাং ঘ্যাচ , কথায় কাটে কথার প্যাঁচ । অনেকেই বলেন , প্যাঁচহীন কথা আলুনি ব্যঞ্জনের মতো ।‌কথার প্যাঁচ তথা কথার জট খুলতে না পারলে ভাবনার জানলা খোলে না । যে নিজে সবসময় মিথ্যা বলে , সে সবাইকে ভাবে মিথ্যাবাদী । যে নিজে অপরাধপ্রবণ , সে সবাইকে ভাবে অপরাধী । চোখ কান একটু খোলা রাখলেই এসব বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় । এর জন্য মনোবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না ।

কেউ যদি বলে , ‘ জগতে কেউ ভালো নয় ‘ , তাহলে সে নিজেও ভালো নয় ধরে নিতেই হয় , কেন না, সে নিজেও তো জগতের বাইরে নয় । কিন্তু , ‘ জগতে কেউ ভালো নয় ‘ , কথাটির সঙ্গে যদি সে এই কথাটি যোগ করে দেয় যে , ‘ এটি একটি মিথ্যা ‘ , তাহলে কী দাঁড়ায় ? এভাবেই ক্রমশ জটিল হতে থাকে জাল , কথার জাল ।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিমেনাইডেস- এর একটি বিখ্যাত উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় । তিনি ছিলেন ক্রিটের নাগরিক । তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা ছিল ,’ ক্রিটের সকল নাগরিক মিথ্যাবাদী ‘ । এক্ষেত্রে কথাটা যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় , তাহলে তিনি নিজেও মিথ্যাবাদী , কারণ তিনি নিজেও ক্রিটের নাগরিক ।‌ আবার তাঁর কথাটা যদি মিথ্যা হয় , তাহলে ক্রিটের নাগরিকেরাও মিথ্যাবাদী নয় । এ থেকে স্থির কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো সম্ভব কি ?

এবার অন্য একটি উদাহরণ । যে শব্দগুলো নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারে তাদের autological শব্দ বলে । যেমন noun নিজেও একটি noun । আবার যে শব্দগুলো নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারে না তাদের heterological শব্দ বলা হয় । যেমন verb নিজে কিন্তু verb নয় , একটি noun । এখন প্রশ্ন হলো ,
heterological শব্দটি কি নিজে heterological ? এর উত্তর যদি ‘ হ্যাঁ ‘ হয় , তাহলে ধরে নিতে হয় heterological শব্দটি নিজে heterological , কিন্তু তাই যদি হয় , তাহলে তো শব্দটি নিজেকে বা নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারছে । কিন্তু আমরা তো জানি, যে শব্দগুলো নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারে তারা autological ! আবার এর উত্তর যদি , ‘ না ‘ হয় , তার মানে heterological শব্দটি নিজে heterological নয় , autological । আর autological হলে সে নিজেকে ব্যাখ্যা করতে পারবে , যা কিনা heterological- এর সংজ্ঞার বিপরীত।

আরও পড়ুন- পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ওমেন প্লেগ্রাউন্ড গেমিং স্টোর চালু হল

এবার আরেকটি কথার প্যাঁচ দেখা যাক । একটা কার্ডের দু’পাশে দুটি বাক্য লেখা আছে । একপাশে লেখা আছে যে , ‘ অপর পাশের লেখাটি সত্য ‘ । আবার অপর পাশে লেখা আছে যে , ‘ অপর পাশের লেখাটি মিথ্যা ‘ । এবার ভেবে যেতে হবে , অনন্তকাল ধরে ভেবে যেতে হবে যে উল্লেখ্য দুটি বাক্যের মধ্যে কোনটি সত্য ।

কথার জটিল জাল পাতা রয়েছে সর্বত্র । এক শহরে একটা রেস্টুরেন্ট আছে । সেই রেস্টুরেন্টে এত ভিড় হয় যে , কেউ সেখানে যায় না । এখন প্রশ্ন হলো , কেউ যদি না যায় , তাহলে সেখানে এত ভিড় হয় কীভাবে ?

সক্রেটিসের বিখ্যাত উক্তি : আমি কিছুই জানি না । এখানে তাঁর কথা যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় , তাহলে তিনি সত্যিই কিছু জানেন না । কিন্তু তাহলে তো তাঁর জানাটা সত্য প্রমাণিত হলো , যা কিনা না জানার মধ্যে পড়ে । আবার তাঁর কথাটা যদি মিথ্যা বলে ধরা হয় , তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় , ‘ তিনি অনেক জানেন , যা কিনা তাঁর উক্তির সঙ্গে সঙ্গতিসূচক নয় ।

আসলে এ সবই প্যারাডক্স , অর্থাৎ কূটাভাস । প্যারাডক্স হলো এমন কিছু বাক্য বা উক্তি , যা থেকে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় না । এইসব বাক্যের অর্থ বের করতে গেলে সাধারণত দুটি পরস্পরবিরোধী সমাধান পাওয়া যায় , যার কোনোটিকে সম্পূর্ণ সত্য বা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলা যায় না।

এমন দুটি সমাধানের একটি সত্য হলে অপরটি মিথ্যা হয় , আবার অপরটি সত্য হলে অন্যটি মিথ্যা হয় । এই সমস্ত বিভ্রান্তিকর গাণিতিক ও দার্শনিক বাক্য চিন্তার চর্চা ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে দারুণ জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । চিন্তার জড়তা থেকে মুক্তি দেয় মানুষকে । নতুন ভাবনাচিন্তার দরজা খুলে দেয় । তাই চিন্তাশীল মানুষেরা প্যারাডক্স পছন্দ করেন । সাধারণ মানুষের কাছেও প্যারাডক্সের যথেষ্ট কদর আছে । Paradox ইংরেজি শব্দ হলেও মূল শব্দটি এসেছে একটি গ্রিক শব্দ থেকে । এর উৎপত্তিস্থল প্রাচীন গ্রীস ।

যদি কেউ বলে , ‘ হায় , একদিন সব শেষ হয়ে যাবে ‘ , তাহলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার কোনো দরকার নেই । কারণ , শেষ না হলে শুরু হবে কীভাবে ? তার মানে, একদিন সব কিছুর শুরু হবে একেবারে শূন্য থেকে।

 

Related articles

গণনা কেন্দ্রে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা, সোমে অগ্নিপরীক্ষা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের 

দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সোমবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হচ্ছে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা।...

ফলাফল অসম বিধানসভা নির্বাচনের: হিমন্তের ‘ঘৃণা’য় রাশ টানার লড়াই বিরোধীদের

দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের আগে জোরালো আলোচনায় অসম। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার ঘৃণা ভাষণের জেরে বাংলাদেশের কাছে...

বিচারকের ঝুলন্ত দেহ! পারিবারিক অশান্তির জেরে মৃত্যুতে চাঞ্চল্য

ন্যায়বিচার দেওয়ার আসনে বসে অন্যের জীবনের জট খোলার কথা ছিল তাঁর। অথচ নিজের জীবনের অশান্তির ভার আর বইতে...

ভোটগণনার আগের দিন অতিসক্রিয় NIA, মোথাবাড়ি কাণ্ডে এবার তলব তৃণমূল নেতাদের

রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা সোমবার। তার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে মালদহে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা...