Saturday, January 10, 2026

‘হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

মেলার মধ্যে মাইকে একজন হাঁকছে, ‘ হরনাথ , তুমি যেখানেই থাকো , আমাদের অনুসন্ধান অফিসের সামনে চলে এসো , তোমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন । ‘

এটি একটি কবিতার সূচনা- অংশ । কবিতাটি শেষ হচ্ছে এইভাবে , ‘ হরনাথ , তুই কি আর বাড়ি ফিরবি না’
আমরা কোনদিনও জানতে পারি না হরনাথের শেষ পর্যন্ত কী হলো । সে কি বাড়ি ফিরলো , নাকি চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো ! সাবালকেরা নিখোঁজ হলে তার কারণ হিসেবে হতাশা , সংসারবৈরাগ্য , দারিদ্র্য , বিপথগমণ ইত্যাদি বহুবিধ কথা উঠে আসে । কিন্তু নাবালক শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ? পথ ভুলে নিজের ঠিকানায় না ফিরে অন্য কোথাও চলে যায় আর ক’জন ? তাহলে ? কী হয় তাদের শেষপর্যন্ত ?
‘ নীল , তুমি যেখানেই থাকো ফিরে এসো । তোমার মা ভীষণ অসুস্থ । ‘

এমন বিজ্ঞপ্তি তো কতই দেখা যায় রোজকার খবরের কাগজে । আবার এমন বিজ্ঞপ্তিও থাকে , ‘ বিধু মজুমদার , উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি , বয়স ৪৩ , কপালের ডানপাশে ছোট্ট কালো দাগ , সবুজ হাফহাতা জামা , কালো প্যান্ট , বাড়ি দরিয়ানগর , পূর্ব বর্ধমান , গত ৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ । উক্ত ব্যক্তির সন্ধান পেলে অনুগ্রহ করে লালবাজার মিসিং স্কোয়াডের নিম্নলিখিত ঠিকানায় জানান অথবা এই নম্বরে ফোন করুন। ‘

এরা যায় কোথায় ? কেনই বা যায় ? সবাই কি স্বেচ্ছায় ঘরবাড়ি , আত্মীয় স্বজনদের ছেড়ে চলে যায় ? তথ্য অনুযায়ী জানা যায় এদের একটা বড় অংশ ফিরে আসে না । কেন ফিরে আসে না ? মনে মনে হারিয়ে যাওয়ার মানা হয়তো নেই । কিন্তু সশরীরে কারো হারিয়ে যাওয়া , সাবালক অথবা নাবালক , নারী অথবা পুরুষ , বয়স্ক কিংবা অল্পবয়সী , দারুণ এক আলোড়ন তোলে পরিচিতদের মনে । শুরু হয় খোঁজাখুঁজি , থানাপুলিশ । নিরুদ্দেশ বিজ্ঞপ্তিও ছাপা হয় খবরের কাগজে । কাছাকাছি কুয়োয় , পুকুরে , নদীতে , কাছে ও দূরের রেললাইনে , হাসপাতালে ও মর্গে কিছুদিন টানা চলতে থাকে খোঁজাখুঁজি। তারপর সময় গড়ানোর সাথে সাথে আলোড়ন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে । সকলেই যে যার কাজে ডুবে যায় । শুধু যে বাড়ির মানুষটি হারিয়ে গেল , সেই পরিবারে এই হঠাৎ হারিয়ে যাওয়াটি বড়ো বেদনার মতো , নিঃশব্দ হাহাকারের মতো নিশিদিন জেগে থাকে । আমাদের মনে পড়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের হাহুতাশ : কোথায় চলে গেলি রে বিলু !

এই বিলুর চলাফেরা ছিল হুইলচেয়ারে । বিলু আর ফেরে নি । কিন্তু কেউ কেউ ফিরেও আসে অবশ্য । খুঁজে পাওয়া যায় কয়েকজনকে । অনেকেই ফেরে না । এই যে সকলের মাঝে সকলের সঙ্গে থাকতে থাকতে হঠাৎই একদিন ভোজবাজির মতো একজনের উধাও অথবা গুম হয়ে যাওয়া , এ বিস্ময়ের ঘোর সহজে কাটে না । কেউ নিখোঁজ হয় একেবারে নিঃশব্দে , কাউকে বিন্দুমাত্র কিছু জানতে না দিয়ে । আবার কেউ নিখোঁজ হয় চিঠি বা চিরকুট লিখে । আবার এর মধ্যে বেমালুম চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে । কিডন্যাপিং নয় , জলজ্যান্ত একটা মানুষকে স্রেফ চুরি করে নিয়ে গেল কতিপয় দুস্কৃতী , অবশ্যই অসদুদ্দেশ্যে , এও তো মাঝেমাঝেই ঘটে । এইসব ঘটনার কোনো হিল্লে হয় না সহজে ।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর অন্যতম ভারতবর্ষ । ভারতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান দেখায় যে , ভারতে প্রতি ঘণ্টায় ৪৪ জন মহিলা , পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ হয় , প্রতিদিন ২১৩০ জন এবং প্রতি মাসে ৬৪৮৫১ জন মানুষ নিখোঁজ হয় । বিশ্বের সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ ভারতের অধিবাসী ।

মিশরের একটি মানবাধিকার সংগঠনের বয়ান অনুযায়ী , সেদেশে গত চার বছরে কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ জন নিখোঁজ হয়েছে । হয়তো আসল সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি । এদেশে ‘ রহস্যময় অন্তর্ধান ‘ বিগত কয়েক বছরে বেশ বেড়েছে ।

পেরুতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২০২৩ সালের প্রথম চার মাসে ৩৪০৬ জন নারী নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে । এর মধ্যে ১৯০২ জনকে খুঁজে পাওয়া গেছে ।‌ সামাজিক , অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতা তো রয়েছেই , তার সঙ্গে এই ভয়ঙ্কর অস্থির সময়ের নৃশংস অমানবিকতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ সারা বিশ্বের নানা দেশে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী । আমেরিকায় প্রতি বছর লক্ষ মানুষ নিখোঁজ হয় । জাপানেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা বিপুল । যুক্তরাজ্যেও বিরাট- সংখ্যক মানুষ নিখোঁজ হয় প্রতি বছর ।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পার্সনস ( আই সি এম পি ) অনুসারে , বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ২০০০০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে অনুমান করা হয় । এই সংখ্যা বেশিও হতে পারে , কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রিপোর্ট করা বা নথিভুক্ত করা হয় না ।

কলম্বিয়া ও মেক্সিকোয় প্রচুর মানুষ নিখোঁজ হয় প্রতি বছর। অন্যদিকে , সিরিয়া , নাইজেরিয়া প্রভৃতি দেশে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক । সারা পৃথিবী জুড়েই মানুষের হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বিরামহীনভাবে চলতেই থাকে । স্বেচ্ছায় অন্তর্ধান নানা কারণে ঘটতে পারে । মানসিক বৈকল্য , বৈরাগ্য , অশান্তি , পারিবারিক বিবাদ , ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ , সাংস্কৃতিক দূষণ , চারপাশের জটিল কুটিল নেতিবাচক প্রভাব এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ মানুষকে স্বস্থান ছেড়ে চলে যেতে প্ররোচিত করতে থাকে প্রতিনিয়ত । এ এক গভীর অসুখ পৃথিবীর ।

পরিশেষে , পশ্চিম বর্ধমানের কোনো এক শহরের একটি ঘটনা । বিগত দিনের কোনো একটি নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে একটি বাড়িতে বুথ স্লিপ দিতে এসেছেন একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন কর্মী । বাড়িতে কড়া নাড়তেই বেরিয়ে এলেন সে বাড়ির প্রৌঢ় গৃহকর্তা । বাড়ির পাঁচজন সদস্যের জন্য পাঁচটি স্লিপ তাঁকে দেওয়া হলো । কিন্তু তিনি একটি স্লিপ কর্মীদের হাতে ফিরিয়ে দিলেন । কর্মীরা অবাক হয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই প্রৌঢ় বললেন , ‘ পলি তো ভোট দেবে না ‘ । ভোট না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে উনি বললেন , ‘ পলি হারিয়ে গেছে, আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওকে খুঁজে পাইনি কোথাও ।থানাপুলিশ , নিরুদ্দেশ বিজ্ঞপ্তি , কিছুই বাকি রাখি নি । কোথায় যে চলে গেলো আমাদের মেয়েটা ‘ !

আরও পড়ুন- তৃতীয় বিয়ে ‘অবৈধ’! ৭ বছরের সাজা ইমরান-বুশরা বিবির

spot_img

Related articles

সামান্য কমল পারদ, রাজ্যে জারি শীতের স্পেল!

শনিবার সকালে ভরপুর শীতের (Winter) আমেজ। হাওয়া অফিস (Weather Department) বলছে শুক্রবার কলকাতার তাপমাত্রা বাড়লেও এদিন ফের নিম্নমুখী...

ধুলাগড়ের কাছে রাসায়নিক বোঝাই লরিতে আগুন, পুড়ে ছাই বাস – গাড়ি 

হাওড়ার ধুলাগড় বাসস্ট্যান্ডের (Dhulagar bus stand) কাছে রাসায়নিক বোঝাই লরিতে অগ্নিকাণ্ডের জেরে মুহূর্তে দাউ দাউ জ্বলে উঠল বাস।...

আজ বাঁকুড়ায় অভিষেকের রণসংকল্প যাত্রা ঘিরে উন্মাদনা তুঙ্গে

বারুইপুর, আলিপুরদুয়ার, বীরভূম, মালদহ ঠাকুরনগরের পর এবার রণসংকল্প যাত্রায় শনিবার বাঁকুড়ায় সভা করতে চলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)।...

ক্ষুদিরাম বিতর্ক ভুলে টানটান ট্রেলারে চমকে দিল ‘হোক কলরব’! উন্মাদনা সিনেপ্রেমীদের

একদিকে সরস্বতী পুজো অন্যদিকে নেতাজির জন্মদিন, ২৩ জানুয়ারির মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে বক্স অফিসে  ‘হোক কলরব’ (Hok Kolorob) বার্তা...