Saturday, March 14, 2026

‘এ নদী এমন নদী’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

এ নদীতে নেমো না,

পুড়ে যাবে চোখ ।

জীবন্ত প্রাণীগুলো যখন এ নদীর জলে পড়ে , প্রথমেই পুড়ে যায় তাদের চোখ , অন্ধ হয়ে যায় , ঝলসে যায় , সেদ্ধ হয়ে যায় , গলে গিয়ে ফ্যাটফেটে সাদা হয়ে যায় ।
এ নদীর ফুটন্ত জলে কোনোভাবে পড়ে গেলেই ভবলীলা সাঙ্গ । পুড়ে যাওয়া চোখ নিয়ে ছটফট করতে করতে প্রাণীগুলো প্রাণপণ চেষ্টায় পার হতে চায় নদী ।
তীর খোঁজে , বাঁচতে চায় । কিন্তু যতই এগোতে থাকে ততই পুড়তে থাকে এদের দেহ। ধীরে ধীরে এদের পেশী ও হাড় সেদ্ধ হতে শুরু করে ।

প্রচণ্ড উত্তপ্ত ফুটন্ত জল মুখের ভেতর দিয়ে ঢুকে গোটা দেহ অবশ করে দেয় । প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে শক্তি হারাতে থাকে। একসময় মারা যায় । পুড়ে যায় জীবন নশ্বর । ভেসে থাকে এদের গলিত শব । এ অনেকটা যেন রূপকথার মতো , কিন্তু রূপকথা মোটেই নয়। এ পৃথিবীতে সত্যিই আছে ফুটন্ত এক রহস্যময় নদী , যে নদীর জলে আঙুল ছোঁয়ানো মাত্র আঙুল পুড়ে যায় , গভীর ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয় পোড়া আঙুলে ।

” আমি নদীতে বিভিন্ন প্রাণীকে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি । এরা সবাই পুড়ে ঝলসে মারা গেছে । এটা আমাকে খুব অবাক করেছে ।

কারণ সকল ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি প্রায় একইরকম । ” বলেছেন পেরুর ভূ-বিজ্ঞানী আন্দ্রে রুজো , যিনি নিজে সেই নদীর কাছে গিয়ে স্বচক্ষে দেখে এসেছেন কীভাবে এই নদীর ফুটন্ত জলে পুড়ে মরে যায় প্রাণীরা । কখনো কখনো রূপকথার গল্পকেও হার মানায় রুঢ় বাস্তব । রহস্যময় এ নদীর নাম শ্যানাই – টিম্পিশকা । আমাজনের গভীর অরণ্যে রয়েছে এই নদী , যার জল টগবগ করে ফুটছে সবসময় । ২০১৪ সালে টেড এক্স-এর এক বক্তৃতায় এই নদী নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ প্রায় সমস্ত তথ্যাবলী এবং ফলাফল সকলের সামনে তুলে ধরেন আন্দ্রেজ রুজো ।

তিনি বলেন, আমাজনে কোনো আগ্নেয়গিরি নেই । পেরুর বেশিরভাগ অংশেও নেই । যে জায়গায় এই নদীটি রয়েছে তার থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে রয়েছে নিকটবর্তী আগ্নেয়গিরি । তিনি আমাজনের এই উষ্ণ- প্রস্রবণ স্বচক্ষে দেখে হতবাক হয়ে যান । দূর থেকেই তিনি শুনতে পেয়েছিলেন নদীর জলের মৃদু তরঙ্গের শব্দ । যত কাছে যাচ্ছিলেন শব্দও তত জোরালো হচ্ছিল । অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের ক্রমাগত আছড়ে পড়ার শব্দের মতো সেই শব্দ । এরপর নদীর যত কাছে গিয়েছেন দেখেছেন বাষ্প ক্রমাগত নিচ্ছে ধোঁয়ার মতো রূপ । এরপর নদীর জলের গড় তাপমাত্রা মাপেন তিনি । তা ছিল ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ( ১৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট ) । দ্রুত প্রবাহিত হয় এই গরম নদী । এই নদীকে অনুসরণ করে কিছুটা এগোনোর পর রুজো লক্ষ্য করেন এক অদ্ভুত বিষয় । নদীর পবিত্র স্থান শামানের আখড়া থেকে ঠাণ্ডা স্রোতের প্রবাহ দেখা যায় । এই নদী শামানদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ।‌ তারা এ নদীর জল পান করে । এর বাষ্প গ্রহণ করে । রান্নার কাজে ব্যবহার করে ।‌ এ নদীর জল দিয়ে তৈরি করে ওষুধ । নদীর ধারের তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে গিয়ে এক আশ্চর্য ব্যাপারের হদিশ পান আন্দ্রে । শুরুতে নদীর জল ঠাণ্ডা , তারপর ধীরে ধীরে উত্তপ্ত ও ফুটন্ত , তারপর আবার ঠাণ্ডা , আবার গরম এবং ততক্ষণ উত্তপ্ত যতক্ষণ না ঠাণ্ডা জলের ধারায় গিয়ে মিশছে ।

ইনকাদের কাছে এই নদী ছিল সূর্যদেবের জলস্রোত । সূর্যের তাপেই ফুটতো নদীর জল — এটাই বিশ্বাস ছিল প্রাচীন এই জনজাতির । এঁরা ছিলেন সূর্যের উপাসক ।

পেরুর রাজধানী লিমা-র বাসিন্দা আন্দ্রে রুজো এই নদীর কথা শুনে তাঁর কিশোর বয়সেই ভেবে রেখেছিলেন একদিন না একদিন এই আশ্চর্য নদীর রহস্য উন্মোচন করবেন তিনি । টেক্সাসের সাদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে জিওফিজিক্স-এ স্নাতক হন তিনি । তারপর তৈরি করেন পেরুর থার্মাল ম্যাপ অর্থাৎ তাপমানচিত্র । এরপর তিনি বুঝতে পারেন যে সূর্যের তাপে নয় , নদী ফুটছে পৃথিবীর ভূভাগের অভ্যন্তরস্থ তাপে ।

তারপর নদীর রহস্য ভেদ করতে ২০১১ সালের নভেম্বরে পেরুর মধ্য অংশ অভিযানে যান রুজো । বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে অবশেষে সন্ধান মেলে সেই নদীর । কিন্তু শেষমুহুর্তেও বাধা । তিনি বহিরাগত , তাই নদীর কাছে যেতে দিতে রাজি নন নদীর তীরবর্তী গ্রামের পুরোহিত সম্প্রদায় ( শামান ) । বিস্তর সাধ্যসাধনার পর মেলে নদীর কাছে যাবার ছাড়পত্র ।

ছয় মাইল লম্বা এই নদীকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে ঘন গাছের সবুজ প্রাচীর । নদীর গভীরতা ১৬ ফুট পর্যন্ত উষ্ণপ্রস্রবণের মতো নিজের খেয়ালেই সে l যাত্রাপথের শেষে মিশে গিয়েছে আমাজনের গভীরে ।

জিওথার্মাল বা হাইড্রোথার্মাল চক্রের বিক্রিয়াই ফুটন্ত জলের নদীর মূল রহস্য । ‘ দ্য বয়েলিং রিভার ; অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড ডিসকভারি ইন আমাজন ‘ বইয়ে নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছেন আন্দ্রে । তিনি বলেন , এই বিস্ময়- নদীকে বাঁচাতে আমাজন অরণ্যে বৃক্ষনিধন বন্ধ করতেই হবে ।

 

 

spot_img

Related articles

আজ যুবভারতীতে লাল-হলুদ ম্যাচ, বেঙ্গালুরুতে খেলবে মোহনবাগান 

শনিবার জমজমাট সবুজ ঘাসে পায়ে পায়ে লড়াই। দুই ভিন্ন প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে মাঠে নামছে মোহনবাগান (Mohun Bagan) ও...

কৃষিখাতে উন্নয়নের খতিয়ান উল্লেখ করে কৃষক দিবসে শুভেচ্ছা পোস্ট মুখ্যমন্ত্রীর 

কৃষক দিবস (Farmer's Day) উপলক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social media) শুভেচ্ছা পোস্ট বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee)। ২০০৭...

কুলদীপের মেহেন্দিতে কোমর দোলালেন চাহাল! আজ মুসৌরিতে সাতপাক ঘুরবেন বিশ্বকাপজয়ী তারকা

শনিবার সাতপাকে ঘুরতে চলেছেন ভারতীয় ক্রিকেট তারকা কুলদীপ যাদব। একাধিক নায়িকাদের সঙ্গে নাম জড়ালেও ছোটবেলার বন্ধু বংশিকা চাড্ডাকে...

আজ বাংলায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী, সকাল থেকে শহরের একাধিক রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণ

ভোটের আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ডেইলি প্যাসেঞ্জারি ট্র্যাডিশন বজায় রেখে আজ বঙ্গে আসছেন নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। ভারতীয়...