ভারতের আকাশে বর্তমানে গুটিকতক বিমানসংস্থার আধিপত্য নিয়ে যখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই এক অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প শোনাল উত্তরপ্রদেশ। কানপুরের সাধারণ এক টেম্পোচালক থেকে একটি আস্ত বিমানসংস্থার মালিক হয়ে ওঠার সেই রূপকথার নায়ক শ্রবণকুমার বিশ্বকর্মা। সম্প্রতি তাঁর সংস্থা ‘শঙ্খ এয়ার’ অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক থেকে উড়ান শুরুর সবুজ সংকেত (NOC) পেয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই ভারতের আকাশে ডানা মেলতে চলেছে তাঁর এই স্বপ্নের উদ্যোগ।

৩৫ বছর বয়সি শ্রবণকুমারের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। মাত্র সাত বছর আগেও তিনি কানপুরের রাস্তায় লোডার এবং টেম্পো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ছোটবেলা থেকেই পুঁথিগত বিদ্যায় বিশেষ আগ্রহ ছিল না তাঁর। শ্রবণের কথায়, “শূন্য থেকে শুরু করা একজন মানুষকে জীবনে সাইকেল থেকে টেম্পো— সব ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়।” একসময় জীবনযাপনের তাগিদে অটো চালিয়েছেন, এমনকি একের পর এক ছোট ব্যবসা শুরু করে ব্যর্থতার স্বাদও পেয়েছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি এই লড়াকু যুবক।

২০১৪ সালে সিমেন্ট ব্যবসার মাধ্যমে শ্রবণের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। এরপর টিএমটি রড বা লোহার ব্যবসায় বিপুল সাফল্য পান তিনি। সেই লাভের টাকা তিনি বিনিয়োগ করেন খনি ও পরিবহণ ক্ষেত্রে। একে একে প্রচুর ট্রাক কিনে নিজের ব্যবসায়িক ভিত মজবুত করেন তিনি। ধীরে ধীরে সিমেন্ট এবং লোহা শিল্পের হাত ধরে কানপুরের সেই টেম্পোচালক হয়ে ওঠেন সফল শিল্পপতি। আজ সেই সফলতার হাত ধরেই তিনি উত্তরপ্রদেশের প্রথম স্থানীয় বিমানসংস্থা হিসেবে ‘শঙ্খ এয়ার’-কে আত্মপ্রকাশ করাতে চলেছেন।
বিমান পরিবহণ ক্ষেত্রে আসার চিন্তা তাঁর মাথায় আসে চার বছর আগে। শ্রবণকুমারের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের জন্য বিমান যাত্রাকে বাসের মতো সহজ করে তোলা। তিনি মনে করেন, বিমানকে কোনো একচেটিয়া আভিজাত্যের অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লখনউকে কেন্দ্র করে দিল্লি ও মুম্বইয়ের মতো প্রধান শহরগুলোর মধ্যে শঙ্খ এয়ারের উড়ান চালু হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি এয়ারবাস বিমান নিয়ে এই যাত্রা শুরু হচ্ছে। ২০২৫-এ এনওসি পাওয়া এই সংস্থাটি এখন দ্রুত ডানা মেলার অপেক্ষায়।

শ্রবণকুমারের এই গল্প অনেককেই ‘এয়ার ডেকান’-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন জি আর গোপীনাথের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। গোপীনাথ যেমন একসময় গরুর গাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং পরে সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের বিমান পরিষেবা চালু করে ইতিহাস গড়েছিলেন, শ্রবণও ঠিক সেই পথেই হাঁটছেন। মধ্যবিত্তের নাগালে আকাশপথকে নিয়ে আসাই এখন শ্রবণের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

ইন্ডিগোর মতো বড় সংস্থাগুলোর একাধিপত্যের মাঝে শঙ্খ এয়ার, আল হিন্দ এয়ার এবং ফ্লাই এক্সপ্রেসের মতো নতুন সংস্থাগুলোর আত্মপ্রকাশ ভারতীয় বিমান পরিষেবায় নতুন সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। একসময়ের টেম্পোচালক শ্রবণকুমার আজ প্রমাণ করে দিলেন, কঠোর পরিশ্রম আর ইস্পাত কঠিন সংকল্প থাকলে মাটি থেকে আকাশে উড্ডয়ন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

আরও পড়ুন- শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার স্বীকৃতি, গ্লোবাল কানেক্ট অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত ইন্দ্রনাথ গুহ

_

_

_
_


