
… হৃদয়ে সুখের বাসা ,
মরমে অমর আশা ,
চিরবন্দী ভালোবাসা
প্রাণপিঞ্জরে ।।

প্রেমে তালা? তালাবন্দী ভালোবাসা? তাহলে তো বন্ধনহীন প্রেম বন্দী হয়ে শেষমেশ খাঁচার পাখি! তাহলে কি ভালোবাসার স্বাধীন পাখির বিশ্বময় পারাপারের ডানায় শিকল?

তাহলে কি প্রেমে পড়া বারণ? মোটেও না। প্রণয়ীদের অযথা চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আসলে লাভ লক ব্রিজ হলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সেতু, যে ব্রিজগুলোর থামে এবং গায়ে প্রেমিক – প্রেমিকারা তাদের প্রেমের প্রতীক হিসেবে তালা লাগায়, আর সেইসঙ্গে চাবি ছুঁড়ে ফেলে নদীতে অথবা অন্য কোথাও, যাতে ভালোবাসা চিরস্থায়ী হয়। সব মিলিয়ে বলা যায় ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।

প্যারিসের Pont des Arts,ভিয়েতনামের Da Nang ব্রিজ এবং জার্মানির Cologne ব্রিজের মতো জায়গাগুলো লাভ লক সেতু হিসেবে বিখ্যাত । যদিও প্যারিসে অতিরিক্ত তালা ঝোলানোর জন্য অর্থাৎ অসংখ্য ভারী তালার ওজনের কারণে ব্রিজের কিছু অংশ ভেঙে পড়া এবং কিছু অংশে ফাটল ধরার পর ভালোবাসার অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় , কিন্তু লায়লা – মজনু, রোমিও – জুলিয়েট কিংবা হির – রাঞ্ঝারা কবেই বা কোন নিষেধাজ্ঞা মেনেছে?

প্রেমিক – প্রেমিকা যুগলে একটি তালা কেনেন, তাতে নিজেদের নাম বা নামের বানানের আদ্যাক্ষর খোদাই করেন এবং সেতুর কোনো অংশে সেই তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটি নদীতে বা দূরে অন্য কোথাও ছুঁড়ে ফেলেন। এই তালাটি ভালোবাসার চিরস্থায়ী বন্ধন ও প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে থেকে যায়।

এই প্রথা, রীতির জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত প্যারিসের Pont des Arts bridge, যা বহু বছর ধরে চলে আসছিল, কিন্তু অগণন প্রেমের তালার অতিরিক্ত ভার বইতে না পেরে সেতুর কিছু অংশ ভেঙে পড়ায় এখানে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার পর আর তালা ঝোলানোর অনুমতি দেওয়া হয় না।

ভিয়েতনামের দা নাং ( Han River Bridge )যথেষ্ট জনপ্রিয় একটি লাভ লক ব্রিজ, যেখানে হাজার হাজার প্রেমতালা লাগানো হয়েছে এবং পর্যটকদের কাছে এটি বেশ আকর্ষণীয়। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের Elserner Steg সেতুও লাভ লক ব্রিজ হিসেবে পরিচিত, যেখানে অসংখ্য তালা ঝুলছে প্রেমের চিহ্ন রূপে।

হিউস্টন, দুবাই এবং মস্কোর মতো শহরেও লাভ লক ব্রিজ আছে, যেগুলো ভালোবাসার বিশেষ স্থান হিসেবে আমাদের হিংসাদীর্ণ পৃথিবীতে প্রেমের লাইট হাউসের মর্যাদা পেয়েছে। তবে, প্যারিসের বিখ্যাত ব্রিজটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্বের বাকি লাভ লক ব্রিজগুলো প্রেমের অতিরিক্ত ভার কতটা বইতে পারবে তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। বলা হয়, পূর্ব ইউরোপের সাইবেরিয়া ( নাকি সার্বিয়া)

মোস্ট লুবাবি প্রথম লাভ লক ব্রিজ। এটি এক অনিন্দ্যসুন্দর নৈসর্গে ভার্নজ্যাকা বাঞ্ছায় অবস্থিত একটি পায়ে চলা সেতু। এ নিয়ে একটি প্রাচীন গল্পও আছে। গল্পের প্রণয়ী যুগলের নাম নাদা ও রোলজিয়া। নাদা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তিনি প্রেমে পড়েন সাইবেরিয়ান অফিসার রোলজিয়ার। তাঁদের প্রেম শুরু হওয়ার পর রোলজিয়া গ্রিসে তাঁর কর্মস্থলে ফিরে যান। গ্রিসে ফিরে কো ফ্যু নামে অন্য এক নারীর প্রেমে তিনি পড়েন এবং তাঁকে বিয়ে করেন। এই ঘটনার কথা নাদার কানে পৌঁছোতেই হৃদয় ভেঙে যায় তাঁর। বেদনার তীব্র অভিঘাতে মারা যান নাদা। এ ঘটনা ঘটে উনিশ শতকের শেষ দিকে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরেই নাকি ভার্নজ্যাকা বাঞ্ছার নারীরা এক প্রথা চালু করেন, যেখানে তালার গায়ে প্রেমিক প্রেমিকার নাম লেখা হতো এবং চাবি ছুঁড়ে ফেলা হতো নদীতে। প্রেমের জন্য শহীদ নাদার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় ও স্মরণে এই রীতি উদযাপনের মাধ্যমে নারীরা তাঁদের প্রেমকে সুরক্ষিত রাখার প্রাণপণ প্রয়াস করতেন।
প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে,চাই না বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর , ইত্যাদি গানগুলো শুনলেই লাভ লক ব্রিজগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
আরও পড়ুন – শ্রীরামপুরে ফরাসি প্রতিনিধিদল, ডেনিশ স্থাপত্যের সংরক্ষণে মুদ্ধ বিদেশি পর্যটকরা


