বাংলায় শিল্প বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে নিরন্তর প্রয়াসী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সুফল বাংলার মানুষ কর্মসংস্থানের মধ্যে দিয়ে পেয়েছেন। সেই উদ্যোগ কতটা ইতিবাচক তা আরও একবার প্রমাণিত হল সিআইআই-এর (CII) বার্ষিক বৈঠক ও কনফারেন্সে। শিল্পপতি প্রসূন মুখোপাধ্যায় (Prasoon Mukherjee) তুলে ধরলেন গত ১৫ বছরে রাজ্য সরকারের সহযোগিতার কারণে তিনটি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ (investment) করে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন।

সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন, ইন্ডিয়া বিজনেস কমিটির চেয়ারম্যান তথা ইউনিভার্সাল সাক্সেস এন্টারপ্রাইজেসের চেয়ারম্যান প্রসূন মুখোপাধ্যায় সোমবার যোগ দেন সিআইআই-এর সম্মেলনে। সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি খানিকটা স্মৃতিচারণ করেই বক্তব্য শুরু করেন। তিনি জানান, আমি তালতলায় বড় হয়েছি। তাই কখনও বাংলায় আসা বা বাংলার জন্য কিছু করতে পারা আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে আমি স্থাপন করি ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় হাইড্রো কার্বন বাণিজ্যের মধ্যে দিয়ে। বর্তমানে আমরা বাংলার বিবিধ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছি যার মূল লক্ষ্য ডিজিটাল পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের উন্নয়ন।

আমার বিশ্বাস মুনাফার থেকেও একটি সংস্থার ঐতিহ্য, যা তাঁরা স্থাপন করে গিয়েছে, তার উপরই নির্ভর করে। সেই সংস্থা যা সমাজে অবদান রাখে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে, সমাজকে স্থায়ী উন্নয়ন দেয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাজে লাগে – এমন সংস্থা প্রস্তুত করাই ছিল ১৯৯৫ সালে আমার লক্ষ্য। আজ সেই লক্ষ্য প্রতিফলিত হচ্ছে একাধিক ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের মধ্যে দিয়ে। প্রত্যেকটিই সমাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাস্তা দেখাচ্ছে। এর মধ্যে যেমন বাসস্থানে বিনিয়োগ, পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ রয়েছে, তেমনই আইটি পার্ক, ডিজিটাল উন্নয়নও রয়েছে। আজ সেই প্রকল্পগুলি বিপুল এলাকায় স্থাপিত এবং হাজার হাজার পরিবার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাপ্লাই চেনকে পরিষেবা প্রদান করছে।

বাংলার ডিজিটাল ভবিষ্যতের উন্নয়নের জন্য আমাদের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প নিউটাউনের বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালিতে ২ হাজার কোটির ডেটা সেন্টার তৈরি। বিমানবন্দর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে। এই জায়গায় ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে যা বাংলার গুরুত্বপূর্ণ এআই ও প্রযুক্তি পরিকাঠামোকে উন্নত করে বাংলাকে দেশের অন্যতম ডেটা সেন্টার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এই সংস্থাগুলি প্রথম সারির, সজীব, চিরস্থায়ী উন্নয়নে কার্যকর যেখানে সুদক্ষ কর্মী ব্যবহার করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের সুদক্ষ, উন্নত উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তির দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। যাতে বাংলার উন্নয়নের জোয়ারে সংযোজন করা সম্ভব হয়। বাংলার বাইরেও আমাদের বৃহত্তর পদধ্বনি নীতিগত, প্রয়োজনে উপযোগী উন্নয়ন বিশ্বজুড়ে অনুপ্রাণিত করে।

আমি বিশ্বাস করি ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন ও যে মানব শক্তি রয়েছে তাকে উদঘাটনে। প্রথম দিন থেকে আমরা স্থানীয় প্রতিভার জন্য সুযোগ তৈরি করেছি। স্থানীয় প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে লাভবান করার কাজ করেছি। বাংলায় যে টাউনশিপ সেখানে হলিস্টিক কমিউনিটি তৈরির করা হয়েছে, যেখানে ক্লাব, জিম, ব্যবসায়িক কেন্দ্র, সুইমিং পুলসহ সামগ্রিক পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। যেখানে পরিবারগুলি প্রসারিত হতে পারে তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য। রাজারহাটের টাউনশিপে ২হাজারের বেশি পরিবার ইতিমধ্যেই বসবাস করছে। এবং আগামী বছরে আরও হাজার পরিবার সংযুক্তকরণের সম্ভাবনা রয়েছে।

একটি প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়িক সংস্থা ও একজন ব্যক্তি যিনি বাংলার উন্নয়নে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেই হিসাবে সাইক্লোন আয়লা পরবর্তীতে দ্রুত সহায়তা ও জীবনযাপনের ব্যবস্থা করেছিলাম। কন্যা সন্তানের শিক্ষার প্রসারে আমরা দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপে সহায়তা করেছি স্পনসরশিপের মাধ্যমে যাতে কন্যারা তাঁদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষার অঙ্গনে আসতে পারে। আমরা কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্পনসর করেছিল টানা নয় বছর ধরে। আমরা বইমেলা আয়োজনেও সহযোগিতা করেছি।

সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন হয়। আজকের দিনে তাতে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রয়োজন হয়। বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালির আমাদের ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে আমরা বাংলার যুব সম্প্রদায়কে সাম্প্রতিক দক্ষতা যেমন এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত উৎপাদনে দক্ষ করে তুলব। ৩০ হাজার কোটির এই সিলিকন ভ্যালি প্রকল্প থেকে কয়েক হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর মাধ্যমে মানুষ দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে সক্ষম হবে। মানুষের কাছে পরিষেবা তুলে দেওয়া ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বৃহত্তর সমাজের।

আমার বিশ্বাস বাংলার সঙ্গে সিঙ্গাপুরের যৌথ উদ্যোগ সম্ভব। আপনারা হয়তো জানেন না, সিঙ্গাপুরের সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বাংলায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সিঙ্গাপুরের একটি সংস্থা বাংলার ডিজিটাল পরিকাঠামোর উন্নয়নে ৪০ হাজার কোটি বিনিয়োগ করেছে। আরও একটি সংস্থা যারা কলকাতায় তাদের ঘাঁটি গাড়তে চলেছে, তাদেরও বড় অংশীদারিত্ব সিঙ্গাপুরেরই।

প্রাথমিকভাবে বাংলার উন্নয়নে এবং ডেটা সেন্টারের উন্নয়নে আমরা বিনিয়োগ করছি। এছাড়াও গ্রীন এনার্জিতেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। আমি বাংলার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অত্যন্ত আশাবাদী। বাংলা ও সিঙ্গাপুরের উন্নত যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন শিল্পে আমরা এই পথ আরও সহজ করতে পারব।

বিগত ৪০ বছরে, বিশেষত ১৫ বছরে আমরা যে বিনিয়োগ করেছি তার মধ্যে রসদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে লজিস্টিক পার্কে বিনিয়োগে ১৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব হয়েছে। যেটি রয়েছে উলুবেড়িয়ায়। কোনা লজিস্টিক পার্কে আমরা ৭০০ কোটি বিনিয়োগ করেছি। ৫০০০ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে সেখানে। এর পাশাপাশি টাউনশিপের প্রকল্পের ২০০ কোটির বিনিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও একটি টাউনশিপের প্রকল্পে ১২০০ কোটি বিনিয়োগ হয়েছে, যেখানে ২৫০০ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। ডেটা সেন্টারে দুই হাজার কোটির বিনিয়োগ করা হচ্ছে যেখানে দেড়শ কর্মসংস্থান হবে।নিউটাউন আবাসন প্রকল্পে ৩ হাজার কর্মসংস্থান হবে যেখানে আড়াই হাজার কোটি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও ইউনিটেক সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল – ইনফোস্পেস। যেখানে এখন ২৫ হাজার কর্মসংস্থান সম্ভব হয়েছে। সেই সময়ে এই প্রকল্পে আড়াই হাজার কোটি বিনিয়োগ করা হয়েছিল।

সম্মেলনের শেষে বিশ্ববাংলা সংবাদ-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, আমাদের সংস্থা ১৫ বছরে ৮২ হাজার কোটি বিনিয়োগ করেছে। তার মধ্যে একটি আইটি পার্ক। সেখানে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়াও দুটি প্রকল্পে কাজ হচ্ছে। একটি ডেটা সেন্টার। অন্যটি লজিস্টিক পার্ক। সেখানেও সাড়ে ১২ হাজার কর্মসংস্থান হবে। এভাবেই গত ১৫ বছরে আমরা প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছি।
আরও পড়ুন : কলকাতা-কল্যাণী সংযোগকারী সড়কপথ উদ্বোধন মুখ্যমন্ত্রীর, SIR আতঙ্কে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের হাতে নিয়োগপত্র
আর এই সব সম্ভব হয়েছে রাজ্য সরকারের সহযোগিতার কারণেই, স্পষ্ট জানান প্রসূন মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, রাজ্য সরকার খুবই সহযোগী। এতখানি বিনিয়োগ সম্ভব নয় যদি প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ না দেয়। এখানে রাজ্য সরকারের কোনও বাধা নেই। যতটুকু হস্তক্ষেপ সবটা ইতিবাচক। সেই জন্যই আমরা বিনিয়োগ করে যাচ্ছি। এবং আগামী দিনে আরও বিনিয়োগ করব।
শিল্পপতি প্রসূন মুখোপাধ্যায় ছাড়াও এদিনের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিআইআই ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান তথা বিজিএস গ্রুপের ডিরেক্টর দেবাশিস দত্ত (Debashis Dutta), সিআইআই ওয়েস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান তথা জুপিটর ওয়াগনস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিবেক লোহিয়া (Vivek Lohia), সিআইআই ইস্টার্ন রিজিয়নের চেয়ারম্যান তথা আরপিএসজি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান শাশ্বত গোয়েঙ্কা (Shashwat Goenka), সিআইআই ইস্টার্ন রিজিয়নের ডেপুটি চেয়ারম্যান তথা টেগা ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ সিইও মেহুল মোহাঙ্কা (Mehul Mohanka), বন্ধন গ্রুপের চেয়ারম্যান সি এস ঘোষ (C S Ghosh) প্রমুখ বিশিষ্ট শিল্পপতি। এছাড়াও উপস্থিত হন সিএবি-র সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও সিআইআই ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান তথা উডল্যান্ডস মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রূপক বড়ুয়া।


