Thursday, April 23, 2026

ন’বছর আগের লেখায় কেন কবি শ্রীজাতের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা!

Date:

Share post:

অশোক মজুমদার

ইয়ার্কি হচ্ছে এটা ? ঠাট্টা তামাশা চলছে ? শ্রীজাত একটা কবি। তাঁকে গ্রেফতার করবেন? তিনি কি খুন করেছে? ডাকাতি করেছে? অশান্তি বাঁধিয়েছে? নাকি তিনি ধর্ষক? এইসব প্রশ্নবাণ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করতেই নির্বাচন কমিশন না কি বলছে, কোনও ওয়ারেন্ট জারি হয়নি। এটা ভুয়ো খবর!

বাংলায় নির্বাচন কমিশনের কোনটা ভুয়ো আর কোনটা ঠিক- বোঝা দায়। কারণ তারা নিত্যই নানা রকম হুকুম জারি করছে। আবার বলছে, “না না, আমরা এমন কিছুই বলিনি।” ঘটনাচক্রে ওদের সিস্টেম বিজেপি নামক অতি পাকা দলটি ঘেঁটে ঘন্ট করে দিয়েছে। কমিশন এখন ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে যা হোক করে উতরে দিতে পারলে বাঁচে। বিজেপির কথায় তারা বাঘের পিঠে সওয়ার তো হয়ে গিয়েছে, কিন্তু এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা।

এখন প্রশ্ন হল, আমার এই চাঁদি ফাটানো গরমে কবি শ্রীজাত নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কেন হল? আসলে খবরটা শুনে মাথাটা ঠিক শ্রীজাতর জন্যই দপ করে জ্বলে উঠল এমনটা নয়। বাংলার সাংস্কৃতিক কাঠামোকে দিনের পর দিন চূড়ান্ত পর্যায়ে অপমানের পরেও বাঙালি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নামক ‘ধান্দাবাজি’ করে খাওয়া ভন্ডগুলো যেমন আশা করেছিলাম আজকেও ঠিক তেমনি মুখে কুলুপ এঁটেই বসে রইল। বোঝাই যাচ্ছে এদের গোবরপ্রাপ্তি একেবারে সম্পূর্ণ হয়েছে।

সেই SIR শুরুর সময় থেকেই কলকাতার বাবুদের মানে বুদ্ধিজীবীদের কানে তুলো আর পিঠে কুলো বাঁধা দেখেই ধিকি ধিকি পুড়ছিল। তারপর নির্বাচন বিধি লাগু হতেই গোটা প্রশাসনিক সিস্টেমে বদল, লক্ষ লক্ষ সিআরপিএফ এনে দেড় মাস আগে থেকে স্কুল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া, সম্রাট চৌধুরির বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া, রাজ্যে সাঁজোয়া গাড়ির ঘুরে বেড়ানো, মুখ্যমন্ত্রীকে হত্যা ও ধর্ষণের হুমকি অবধিও ধৈর্য ধরে ছিলাম কিন্তু আজ শ্রীজাতর খবর শুনে ভাবলাম নাহ আর তো চুপ থাকা যায় না।

খবরটি মিথ্যা হলেও তার গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। কিন্তু শ্রীজাত যে শ্রেণিতে ওঠাবসা করে তাদের নিশ্চুপতা অনেক কিছু বলে দিল আজ। বাঙালির বাবুশ্রেণিই যে বাঙালির সবথেকে বড়ো শত্রু তা আবারও চোখে আঙুল তুলে দেখার মত স্পষ্ট দেখা গেল।

আপনারা অন্যান্য রাজ্যে বাঙালি জাতি, সংস্কৃতি ও নাগরিকদের উপর আসা অত্যাচার দেখেও দিনের পর দিন চুপ? আপনারা বাঙালি মনীষীদের অপমানে চুপ। আপনারা শ্রীজাতর গ্রেফতারি পরোয়ানায় চুপ। আপনারা SIR-এর নামে বাঙালিদের পরিচয় ছিনিয়ে বেনাগরিক করে দিয়েছে তাতেও চুপ! বুলি শুধু গুলির মত ছোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমালোচনা করার সময়! তখন একমাত্র দেখা যায় প্রতিবাদ এখনও অবশিষ্ট আছে। একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এদের বলতে দিন, দেখবেন গলার স্বর গগনভেদি হয়ে যাবে। আর জি করের সময় যেমন লেজ তুলে নেচেকুঁদে রাত জেগে বিরিয়ানি খেয়ে মমতা বিরোধের সেলিব্রেশন থুড়ি আন্দোলন চলেছিল দিনের পর দিন। কিন্তু বিজেপির অন্যায় এদের কাছে গঙ্গা জলের মতো পবিত্র।

আমার এই জঘন্য হুজুগে পয়সাপিশাচ লোকদেখানো এলিট বাঙালিদের দেখলে আজকাল ঘেন্না হয়। এরা অতীতের স্বপ্নে বিপ্লববাগীশ কিন্তু বর্তমানে অন্ধ মমতা বিরোধিতায় মেরুদণ্ডটা গুঁড়িয়ে গিয়েছে তাতেও কুছ পরোয়া নেহি। আসলে কবে বাম আমলের ক্ষীর খেয়েছিল সেই মিষ্টি মুখে লেগে থাকার আবেশে এমন বিভোর হয়ে আছে যে বিজেপি নামক দানবটির দাপাদাপিতে আপন সংস্কৃতি যে গোল্লায় যাচ্ছে সেটা চোখেও দেখছে না, কানেও শুনছে না।

আপনাদের এই ক্লীবত্ব অর্জনের রূপটা সত্যি দুর্দান্ত তারিফযোগ্য। শ্রীজাতর কবিতা ধর্মীয় ভাবাবেগকে আঘাত করল বলে নাকি মামলা হয়ে আছে- এটা আপনাদের বুদ্ধিতে ভরপুর হৃষ্টপুষ্ট মাথায় দিব্য সেট করে গিয়েছে বলেই কিন্তু নীরব থাকলেন। অথচ সেই বুদ্ধিই এই প্রশ্নটা বিজেপিকে করতে আপনাদের একবারও খোঁচালো না যে, ভাবাবেগ শুধু ভারতবর্ষে বিজেপি করাদেরই আছে তাই তো? এই যে উঠতে বসতে আপনারা মুসলমানদের চুল, দাড়ি, হিজাব, নামাজ, কোরান সবকিছুকে অপমান করেন তার বেলা তাদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগে না? খোদ প্রধানমন্ত্রী অবধি পোশাক দেখেই অপরাধী চিনতে পারেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাভাষায় কথা বললেই রোহিঙ্গা দাগিয়ে দেন- এগুলো ধর্মীয় ভাবাবেগ নয়? আপনারা বিজেপিকে বলতে পারেন কি, যত আবেগের ঠেকা আপনাদের? বাকিরা বানের জলে ভেসে এদেশে এসেছে? এগুলো আমাদের মহান বুদ্ধি বেচারামরা এসব বলতে বুক ধড়ফড় করে যদি ওদেরও নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়ে যায়! ওরে বাবা রে জুজু।

ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা, নেতাজি, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথের বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি নিজের বিবেকটুকুও বাঁধা দিয়েছেন এটাকে দুর্ভাগ্যই বলব। যে বাংলা একদিন স্বাধীনতার সূর্য এনেছে দেশে সেই বাংলার মানুষ এখন পরাধীন ভাবনার দাসানুদাস হতেও লজ্জাবোধ করে না এদের!

মাঝে মাঝে মনে হয় ওনার হেরে যাওয়াই উচিত। এই ভেড়ুয়া জাতির জন্য উনি কি মরতে এই বয়সে এত পরিশ্রম করছেন? যারা নিজেদের জাতিগত অস্মিতা নিজেদের গর্ব নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষা করতে সামান্যতমও আগ্রহী নয়।

আর আমার প্রাণপ্রিয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কার্যপ্রণালী তো নোবেল (অ)শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতায় চলে গিয়েছে। কী দুর্দান্ত এদের সাংবাদিকতা যেখানে ন্যায় অন্যায় দু পক্ষকেই মই দিয়ে গাছে তুলে নীচে বসে বসে ক্যানেস্তারা বাজিয়ে টিআরপি নামক ব্যবসায় বুঁদ হয়ে ডুবে আছে।

রোজ সন্ধেবেলা এরা সংবিধানের অন্তর্জলি যাত্রা করায় গণতন্ত্রকে ঢাল করে- যখন যে খবর যেদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে লক্ষ্মী আগমন হবে সেইদিকেই পাবলিক পারসেপশন ঘুরিয়ে দেয় সুচতুর ব্যবসায়িক পলিসিতে। আইন, কানুন, নিয়ম, বিচার, তদন্ত, ব্যক্তি বিশেষের মান সম্মান, চোর ডাকাত ক্রিমিনাল যে ধরনের খবরই হোক না কেন তার লাটাই থাকে এদের হাতে। এরা সেটাকে হাওয়া বুঝে খোলে।

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত এরা হুজুগে নাচা খবরের প্যান্ডোরার বাক্স খুলে বসে থাকে। যে খবরের নেই কোনও মাথা নেই কোনও মুন্ডু। আমি অবাক হয়ে যাই কোনও ঘটনা ঘটলেই সঙ্গে সঙ্গে খবরটার পক্ষ বিপক্ষ দুই দিকেরই সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের ঘোষিত অর্থাৎ পেটেন্ট নেওয়া কিছু বিজ্ঞ তাদের জ্ঞানগর্ভ বক্তিমে দিতে বসে পড়েন। তখন ওই স্টুডিওই পুলিশ, ওই স্টুডিওই ঘটনাক্ষেত্র , ওই স্টুডিওই তদন্ত হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি আদালত, জজ সব ওরাই হয়ে যায়। মজার ব্যাপার এটাই যে সংবাদ মাধ্যমের এইসব বুজরুকি কাণ্ডের প্রতিবাদে কিছু বললেই ওদের আবার ফুলের ভারে মূর্চ্ছনা যাওয়ার অবস্থা হয়!

দেখবেন এরা কখনও বিজেপির কাউকে প্রশ্ন করে না SIR-এ কেন এত নাম বাদ গেল? প্রকৃত ভোটাররা কেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? শ্রীজাতর মতো কেউ কেউ দু কলম লিখলেই FIR কেন হবে? ধর্মীয় ভাবাবেগকে ভোটে বিক্রি করা হবে কেন? এদের প্রতিদিন সান্ধ্য আসরে তর্কের ঝড় ওঠে বছরের পর বছর ফয়সালা করতে না পারা কেস সারদা, নারদা, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের নিয়ে। আরজিকরের হাজারও মিথ্যের কারখানা গড়ে তোলা হয়। তবুও এদের একটা সন্ধ্যা বরাদ্দ হয়না বিহারের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী কী করে হতে পারেন? শার্জিল ইমামদের বছরের পর বছর বেইল কেন হয় না? এই ন্যুব্জ সংবাদ মাধ্যমের এটুকু প্রশ্ন করার সাহস নেই যে, সামান্য একটা বিধানসভার ভোটের জন্য CRPF, ITBP, CISF, SSB, BSF এর কর্তারা একত্র হবে কেন? এটা বাংলার অপমান নয়?

যাইহোক পরিশেষে বিজেপি ও তাদের সমস্ত সহযোগীকে বলি, যত দিন যাচ্ছে আপনারা সুরক্ষার নামে তামাশা বানিয়ে ছাড়ছেন নির্বাচনটা। একমাস ধরে রোজ নিত্য নতুন ফতোয়ায় গোটা বাংলার প্রশাসনিক, সামাজিক ক্ষেত্রকে তালগোল পাকিয়ে নিজেরাই হাবুডুবু খাচ্ছেন তারপরও দেখছেন বাঙালিকে দমানো যাচ্ছে না এইবার সাংস্কৃতিক জগতকে খোঁচানো শুরু করে দিলেন। এইভাবে ভোট হয় না মোদিবাবু ?

সাধারণ বাঙালি পয়সায় গরিব হতে পারে কিন্তু আত্মমর্যাদায় ভীষণ সম্পদশালী। তারা দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে কাজকর্ম করে সংসার করে। তাদের জীবনকে নরক বানানোর খেলায় মেতে ওঠার ষড়যন্ত্র কিন্তু তারা বুঝে ফেলেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা একটি শীর্ণকায় সত্তরোর্ধ মেয়ের স্নেহের শাসন বাংলার মানুষকে এতটাই শক্তিশালী করে তুলেছে যে তাদের নাগারে অপমান করার সপাটে জবাব চার তারিখ সকালেই পেয়ে যাবেন।

আরও পড়ুন- নির্বাচনের মুখে ‘কবি-কণ্ঠ’ দমনে মরিয়া কমিশন ও দিল্লি! হার্ভার্ড থেকে প্রতিবাদ কবি সুবোধ সরকারের

Related articles

‘তৃণমূলের জয় এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা’, নোয়াপাড়ার জনজোয়ারে আত্মবিশ্বাসী অভিষেক

ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হতেই ময়দানে নেমে পড়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।বুধবার উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়া বিধানসভা...

আরও কিছু পাওয়ার আশায়! ভোটের আগের রাতে দলবদল প্রাক্তন বিধায়কের

তৃণমূল তাঁকে টিকিট দিয়ে বিধায়ক করেছিল। কাজের ভিত্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী পদ এবার দেওয়া হয়েছে অজিত মাহাতোকে। তাতেই...

কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের অসুস্থতা নিয়ে ভুয়ো খবর, তীব্র বিরক্ত পরিবার

বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের গুরুতর অসুস্থতার খবর ঘিরে বুধবার সকাল থেকেই হইচই! তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা যায়, প্রিয়...

নাকা চেকিংয়ের নামে হেনস্থা! বিজেপি-কমিশনের বিরুদ্ধে রাস্তায় বসে প্রতিবাদ সাংসদ মিতালী বাগের

নাকা চেকিং এর নামে হেনস্থা আরামবাগের তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে। বুধবার রাতে হরিপাল চন্দ্রকোনা থেকে ভোটের প্রচারে বাড়ি...