‘ডায়মন্ড সিস্টেম’, উৎপল সিনহার কলম 

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

” পৃথিবীর এইসব গল্প
বেঁচে রবে চিরকাল … ”
অমল দত্ত বনাম পিকে,
কাতানেচিও বনাম ডায়মন্ড,

মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল। উত্তেজনায় থরথর। চায়ের কাপে তুফান। কার জয়, কার হার! বিখ্যাত দুই কোচের বাকযুদ্ধ। দৃষ্টিনন্দন শিল্পময় ফুটবল বনাম কার্যকরী ফুটবল। কে বড়ো কোচ?

প্রদীপ ব্যানার্জী নাকি অমল দত্ত ? উত্তপ্ত তর্কে একেবারে ‘ গোঁসাইপুর সরগরম ‘ । সোনালী স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর মরে‌ ?

” সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা!” অমল দত্তের মোহনবাগান তখন মাঠে ফুল ফোটাচ্ছে প্রতিটা ম্যাচে বিখ্যাত ডায়মন্ড সিস্টেমের হাত ধরে। মাঠে উপচে পড়ছে দর্শক। এ যেন ব্রাজিলের ‘ জোগো বনিতো ‘ দর্শনের এক প্রতিরূপ।

অন্যদিকে পি কে ব্যানার্জীর ইস্টবেঙ্গল পিকে-র চিরাচরিত ভোকাল টনিকের ছোঁয়ায় অপ্রতিরোধ্য। দুই ধুরন্ধর কোচের মগজের লড়াই, কৌশলের যুদ্ধ। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায় দেখ!

ফুটবল যুদ্ধের টানটান উত্তেজনার আবহে সবচেয়ে বেশি খুশি ফুটবলপ্রেমীরা। তারা তো এটাই চায়। আরো প্রাণ আসুক ফুটবলে , আরও নান্দনিক আরও শিল্পময় হয়ে উঠুক এই খেলাটি, উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছোক ফুটবল।

সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ডার্বি ম্যাচে হঠাৎই মুখ থুবড়ে পড়লো অমলের ডায়মন্ড সিস্টেম। পিকে ব্যানার্জী ওইদিন ব্যবহার করলেন ‘ কাতানেচিও ‘ সিস্টেম ডায়মন্ডের পাল্টা হিসেবে। ঠিক যেমন ১৯৭৪ বিশ্বকাপে মুখ থুবড়ে পড়েছিল নেদারল্যান্ডস প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে। ডাচ বাহিনীর কোচ রাইনাস মিশেলের দুনিয়া কাঁপানো অভিনব ‘ টোটাল ফুটবল ‘ উৎকর্ষের চূড়ায় থাকা অবস্থায় সবাইকে হতচকিত করে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয় একেবারে বিশ্বকাপের ফাইনালে। অপ্রতিরোধ্য কমলা বাহিনীর টোটাল ফুটবলের অশ্বমেধের ঘোড়া থেমে যায়, বিধ্বস্ত হয় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ছক কষা জ্যামিতিক ফুটবলের কাছে। অমল দত্তের ডায়মন্ড সিস্টেম ১ লক্ষ ৩০ হাজার দর্শকের সামনে যেন ১৯৭৪ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি করে বিধ্বস্ত হয় পিকে ব্যানার্জীর কাতানেচিওর কাছে। সেই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস হেরে যায় ২– ১ গোলে। আর ১৯৯৭ সালে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে মোহনবাগান হেরে যায় ১– ৪ গোলে।

ডাচদের ‘ কুখ্যাত ব্যর্থতা ‘ শিরোনামে অসংখ্য লেখা বেরিয়েছিল ১৯৭৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর। যদিও ডাচদের হারের পিছনে মাঠের বাইরে পশ্চিম জার্মানির নোংরা খেলা ( কুৎসা রটনা ) অনেকটাই দায়ী। কিন্তু কলকাতা ডার্বিতে ডায়মন্ড সিস্টেম সত্যিই মুখ থুবড়ে পড়েছিল।  এতে মাঠে অথবা মাঠের বাইরে কোথাও কোনো প্ররোচনা ছিল না । ফুটবলে এইসব সাপলুডো অঘটন মাঝেমাঝেই ঘটে বলেই এই খেলাটি এতো চিত্তাকর্ষক।

ডায়মন্ড সিস্টেম হলো একটা দৃষ্টিনন্দন শিল্পীত আক্রমণাত্মক কৌশল, যেখানে ফুটবলাররা মাঝমাঠে একটা বৃত্ত রচনা করে , যা দেখতে অনেকটা ডায়মন্ডের মতো। এই সিস্টেম মূলত ৩-২-৩-২ বা ৪-১-২-১-২ ফর্মেশনে খেলা হয়, যা মাঝমাঠে আধিপত্য নিশ্চিত করে। এই পদ্ধতিতে উইং ব্যাকরা দ্রুত আক্রমনে ওঠেন।‌ কিন্তু এই পদ্ধতিতে রক্ষনে বেশ কিছু ফাঁক থেকে যায়। তাই ঝুঁকি থাকে।‌ কোচ আরিগো সাচি এবং পেপ গার্দিওলার হাত ধরে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের প্রথম দিকে ডায়মন্ড সিস্টেম ( diamond system )  যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

অন্যদিকে কাতানেচিও সিস্টেম ( catenaccio ) হলো একটি ইতালীয় রক্ষনাত্মক ফুটবল কৌশল, যার আক্ষরিক অর্থ ‘ শিকল’ বা দরজায় তালা।‌ একেবারে নিশ্ছিদ্র রক্ষণব্যবস্থা যা প্রতিপক্ষকে কিছুতেই গোলমুখ খুলতে দেয় না এবং হঠাৎ দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বিপক্ষ দলকে হতবুদ্ধি করে গোল করে ফেলে। এই কৌশলে একজন ‘ লিবেরো ‘ বা সুইপার ডিফেন্ডার মূল ডিফেন্স লাইনের পিছন থেকে কভার করে। এই সিস্টেমের প্রধান লক্ষ্য গোল না খাওয়া। ডিফেন্ডাররা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং ক্লোজ মার্কিংয়ে খেলে। যে জন্য প্রতিপক্ষ সহজে স্পেস পায় না।‌ জমাট রক্ষণ সহজে ভেদ করা যায় না। সংক্ষেপে, গোল না খেলে হারতে হবে না, এমন একটি মানসিকতা কাতানেচিও সিস্টেমের সারকথা , ১৯৬০- এর সময়কালে যা ইতালীয় ফুটবলের ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠে।

মোহনবাগানের ডায়মন্ড সিস্টেম একসময় দুর্ধর্ষ চার্চিল ব্রাদার্সকে ৬–০ গোলে হারিয়ে গোটা দেশে হৈচৈ ফেলে দেয়। কিন্তু ফেডারেশন কাপের ডার্বি ম্যাচে বিপর্যয় ঘটে এই সিস্টেমের এবং মোহন কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় অমল দত্তকে। অথচ অতবড়ো বিপর্যয়ের পরেও আজও ফুটবলের কৌশল নিয়ে আলোচনা হলে ডায়মন্ড সিস্টেমের কথা এসেই যায় অবধারিতভাবে , যা নান্দনিক ফুটবলের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন – সরকারি হাসপাতালে ভুয়ো ডাক্তার! আবার সেই ডবল ইঞ্জিন মধ্যপ্রদেশের ছবি

spot_img

Related articles

১৪০০ কিলোমিটার পেরিয়ে অধ্যাপিকাকে খুনের ছক, বর্ধমান থেকে গ্রেফতার দম্পতি 

ফ্ল্যাট থেকে অধ্যাপিকার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধারের কয়েক দিনের মধ্যেই তদন্তে বড় সাফল্য পেল দিল্লি পুলিশ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন...

অভিষেকেরই নজর কাড়লেন সুথার, আফগানদের চাপে ফেলল ভারত

মুল্লানপুরে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্টে দ্বিতীয় দিনও দাপট দেখাল ভারত(India), জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছে টিম ইন্ডিয়া। প্রথম ইনিংসে...

সিট ছাড়তে বললেনি নেত্রী: ভিডিও বার্তায় স্পষ্ট জানালেন ইউসুফ

লোকসভার আসন ছাড়তে বলেছিলেন খোদ তৃণমূল নেত্রী (Mamata Banerjee)। এই গুজবেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন বহরমপুরের...

দুর্গাপুরে গণধর্ষণ, শিঁকেয় উঠেছে নারী নিরাপত্তা

চরম নৈরাজ্য বাংলায়! কৃষ্ণনগরের রেশ কাটার আগেই এবার দুর্গাপুরে (Durganagar) এক কিশোরীকে গণধর্ষণের (Gang Rape) অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যেই...