বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের করা মামলায় প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাই কোর্ট। কেন স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের উপর স্থগিতাদেশ নয়- রাজ্যের কাছে জানতে চায় বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চ। রাজ্য জানায়, হলফনামা দিতে চায়।

বিধানসভা নির্বাচনে ৮০ আসন পেয়ে বিরোধীদলে বসেছে তৃণমূল। বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করে চিঠি দেয় তৃণমূল। কিন্তু সেই চিঠিতে সই জাল করা হয়েছে বলে স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেন তৃণমূলেরই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। এর পরেই তাঁদের বহিষ্কার করে তৃণমূল। তার পরে আদি গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায়। ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করে বিধানসভায় চিঠি জমা করেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে ঋতব্রতদের হাতেই বিরোধী দলনেতার ঘরের চাবি দেন স্পিকার রথীন্দ্র বসু। ৮ জুন স্পিকারে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে মামলা করেন তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।

বৃহস্পতিবার সেই মামলার শুনানিতে শোভনদেবের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিরোধী দলনেতা কে হবে- তা দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্পিকার যাঁকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা পাবলিক ডোমেনে প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে তৃণমূল যখন বিরোধীদল ছিল তখন পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করেছিল বিরোধী দলনেতা। পরে যে দল বিরোধীতে এসেছে তারা প্রত্যেকেই নিয়ম মেনে বিরোধী দলনেতা নাম প্রকাশ্যে এনেছে। এবং দল থেকে যাঁদের নাম চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে তাঁরাই আসন গ্রহণ করেছেন। যেমন এর আগে নির্বাচনের পর রাজ্যে আব্দুল মান্নান, সূর্যকান্ত মিশ্র, সুজন চক্রবর্তী, পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারী হয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা। এবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল কোনও চিঠি দিয়ে জানায়নি। স্পিকার যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে ওয়েলকাম করেছিল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। রেজেলিউশন যখন নেওয়া হয়েছিল তখন ৭০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেটাও চিঠি দিয়ে দলের পক্ষ থেকে স্পিকারকে জানানো হয়েছে।

এর পরে বিধানসভার নিয়ম তুলে ধরে বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বলেন, বিধানসভার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বিরোধী দলনেতাকে নির্বাচিত করা হয় বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে। বিরোধী দল থেকে জেতা বিধায়করা সই করে কাউকে একটা সেই পদ দিতে পারেন না।

এর পরে বিচারপতি প্রশ্ন করেন, যদি কোনও রাজনৈতিক দলের থেকে নির্দলের সংখ্যা বেশি হয় সেক্ষেত্রে কী হবে? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, জেতা বিধায়কের সংখ্যা ৩০ এর নীচে থাকলে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচকের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ৩০-এর উপর হলে সেই দল পারে। কিন্তু অবশ্যই রাজনৈতিক দল হতে হবে। একক একক ভাবে কেউ একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এখানে যেটা করা হয়ছে সেটা একটা গ্রুপ, কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দল নয়। বিধানসভার নিয়ম গ্রুপের কোনও গুরুত্ব নেই। যে ৫৯ জন সই করেছেন তাঁদের মধ্যে যাঁরা আলাদা করে স্পিকার এর কাছে আবেদন করেছেন তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দল নয়, তাঁরা গ্রুপ। কল্যাণ অভিযোগ জানান, ইতিমধ্যেই বিরোধী দলনেতার গাড়ি তিনি পেয়ে গিয়েছেন। ঘরও পেয়ে গিয়েছেন। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। স্পিকার বিধানসভার অভিভাবক। তিনি বিরোধী দলের প্রস্তাব ছাড়া, কীভাবে দলের চিঠি ছাড়া কোনও একজনকে ঘর ও গাড়ি দিয়ে দিলেন? কে মুখ্যমন্ত্রী হবে সেটা ওই জয়ী রাজনৈতিক দলটাই ঠিক করে। বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বসানোর সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করা হোক-দাবি কল্যাণের।

বিচারপতি রাজ্যের কাছে জানতে চান, কেন অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয় হবে না? যাঁকে ওই বিরোধী দলনেতা চেয়ারে বসানো হয়েছে তাঁকে তো বিরোধী রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করেছে। রাজ্যের এবিষয়ে কী বক্তব্য জানতে চায় আদালত। এ দিন মামলার এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের প্রশ্ন, “স্পিকার যদি কাউকে দায়িত্ব দিয়ে থাকেন তা হলে সেই বিজ্ঞপ্তি কেন প্রকাশ্যে আসেনি? সেটা কি পাবলিকের মধ্যে থাকার কথা নয়?“

রাজ্যে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য বলেন, স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করছেন আবেদনকারী। আমি আমার সমস্ত বক্তব্য জানিয়ে একটা হলফনামা দিতে চাই। এই মামলা আদৌ গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না সে বিষয়েও আমি কিছু বলতে চাই। ১৬ জুন মামলার পরবর্তি শুনানি।

আরও পড়ুন – নজরুল মঞ্চে সুরের আসরে ‘উস্তাদ-এ-গজল’! কলকাতায় হরিহরণের পঞ্চাশ বছর উদযাপন
_
_
_
